চরিত্রের ভেতর দিয়ে মানুষের জীবন অনুভব করতে চাই: রুনা খান
রুনা খান
বুলবুল ফাহিম
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:১৪ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:২৬
একজন অভিনেত্রীর কাছে চরিত্র শুধু কিছু সংলাপ, পোশাক আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর নাম নয়। প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জীবন; তার নিজস্ব গল্প, সংকট, আনন্দ-বেদনা আর যাপনের ধরন। সেই জীবনকে বোঝার চেষ্টা করা রুনা খানের অভিনয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ। পর্দায় নিজেকে দেখানোর চেয়ে চরিত্রের মানুষটিকে তুলে ধরতে যেন বেশি আগ্রহী তিনি। সেজন্য কখনও তিনি হয়ে ওঠেন প্রান্তিক এক নারী, কখনও উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি। কখনও খুব চেনা কোনো মানুষ, আবার কখনও সম্পূর্ণ অচেনা এক জীবন। চরিত্র বদলায়, বদলায় মানুষের গল্প; সেই গল্পের ভেতর দিয়ে নিজের অভিনয়ের নতুন পথ খুঁজে নেন রুনা খান।
২০০১ সালে পথনাটকের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়ে হাতেখড়ি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে পথনাটকের একটি প্রদর্শনীতে শোয়ের সপ্তাহখানেক আগে দলে এসেছিলেন এক কিশোরী। এরই মধ্যে দলের এক সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়ায় তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। অভিজ্ঞ সেই সদস্যের অনুপস্থিতিতে নতুন মেয়েটিকে মঞ্চে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। হাজারো দর্শকের সামনে শুরুতে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত নিজেকে প্রমাণ করেন তিনি। প্রদর্শনী শেষে দর্শকের করতালিতে ভেসে যায় মঞ্চ। সেই মঞ্চ হয়তো তাঁকে প্রথম বুঝিয়েছিল–একটি চরিত্রে ঢুকে পড়া মানে অন্য একটি জীবনকে কিছু সময়ের জন্য নিজের ভেতর ধারণ করা।
এরপর ২০০৪ সালে ‘সিসিমপুর’ দিয়ে শুরু হয় তাঁর পেশাদার অভিনয়জীবন। মঞ্চ, টেলিভিশন, সিনেমা পেরিয়ে ওটিটিতেও নিজের অভিনয়-দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। পেয়েছেন জাতীয় স্বীকৃতিও। রুনা খানের অভিনয়জীবনের শুরুর সময়টা ছিল বেশ ব্যস্ততায় ভরা। ২০০৯ সালে বিয়ের আগ পর্যন্ত নিয়মিত কাজ করেছেন। তখন তাঁর ভাবনাটা ছিল সহজ–যত বেশি কাজ করবেন, তত বেশি পর্দায় দেখা যাবে, মানুষ তাঁকে চিনবে।

একক নাটক থেকে ধারাবাহিক–সব মাধ্যমে ছিল তাঁর উপস্থিতি। এরপর মাতৃত্বের কারণে প্রায় তিন বছরের বিরতি। অভিনয়জীবনে সেই বিরতি এক ধরনের ছেদ তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে সেটি তাঁকে কাজ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবতে শেখায়। তখন নিজের সময়কে নতুনভাবে ভাগ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রুনা। পরিবার ও সন্তানকে বেশি সময় দিতে চেয়েছেন। ফলে নিয়মিত ধারাবাহিকের বদলে একক নাটক, টেলিছবি ও সিনেমার দিকে ঝুঁকতে থাকেন।
শুরুতে রুনা খানের সিনেমাযাত্রার উল্লেখযোগ্য কাজ ‘ছিটকিনি’। এরপর ‘হালদা’। ধীরে ধীরে রুনার অভিনয়জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে চরিত্র। চরিত্রের আকার কিংবা পর্দায় উপস্থিতির সময়ের চেয়ে চরিত্রটি তাঁকে কতটা নতুন কিছু করার সুযোগ দিচ্ছে, সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। মাসে চার-পাঁচ দিন, এমনকি দুই মাস পরপর শুটিং–এ ছন্দেই কাজটি করেছেন।
এরপর দেশে ওটিটি যাত্রা শুরু হলে রুনার সামনে খুলে যায় আরও ভিন্ন ধরনের চরিত্রের দরজা। ‘আন্তঃনগর’-এর রোজিনা, ‘অসময়’-এর এমিলি রহমান, ‘বোধ’-এর দীপ্তি, ‘বোহিমিয়ান ঘোড়া’সহ বিভিন্ন ওয়েব কনটেন্টে নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন রুনা খান। প্রতিটি চরিত্র দর্শকের প্রশংসা পেয়েছে। এর মধ্যে কাজল আরেফিন অমির ‘অসময়’-এ এমিলি রহমান চরিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত নারীর একটি ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন তিনি এ চরিত্রের মাধ্যমে।

রুনা খান বলেন, ‘জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমা আমি দেখতেও পছন্দ করি, নিজেও অভিনয় করতে পছন্দ করি। আমার কাছে অভিনয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হলো মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখা। একটি চরিত্রের ভেতর দিয়ে অন্য একজন মানুষের জীবনকে অনুভব করার সুযোগ পাওয়া যায়।’
রুনার এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর অভিনীত সিনেমাগুলো থেকে। যেমন কৌশিক শংকর দাসের ‘দাফন’, মাসুদ পথিকের ‘বক’, জাহিদ হোসেনের ‘লীলা মন্থন’, সন্দীপ বিশ্বাসের ‘অসীমের পানে’ এবং রাজন তালুকদারের ‘জলপবন’।
এর মধ্যে ‘জলপবন’-এর শুটিং হয়েছে হাওর অঞ্চলে। ‘বক’ নির্মিত হয়েছে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার ছায়া অবলম্বনে। তাঁর কাছে এগুলো শুধু সিনেমা নয়; দেশের সাধারণ মানুষ, প্রান্তিক মানুষ এবং নারীর জীবনের নানা গল্প। প্রতিটি চরিত্রকে তিনি বিশ্বাস করেছেন, উপভোগ করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো–চরিত্রগুলোতে ছিল বৈচিত্র্য। রুনা বলেন, ‘আমি একই স্বাদের চরিত্রে অভিনয় করতে চাই না। একজন অভিনেত্রী হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়া। কখনও এমন একজন নারীর চরিত্র করছি, যার জীবন আমার চারপাশের মানুষের জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আবার কখনও এমন কাউকে করছি, যাকে হয়তো আমরা প্রতিদিন দেখি, কিন্তু তার ভেতরের গল্পটা জানি না। সেই গল্পটা খুঁজে বের করার জায়গাটা আমার কাছে অভিনয়।’

এতসব কাজের পরও অভিনয়কে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরতার জায়গা হিসেবে দেখেন না রুনা। তার কাছে অভিনয় মূলত শখ ও ভালোবাসার জায়গা। এই ভালোবাসার জায়গা থেকে সম্ভবত চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এতটা সতর্ক তিনি। অভিনয় তাঁর কাছে কেবল পেশা নয়, মানুষের জীবনের নানা স্তরে প্রবেশের একটি সুযোগ।
তিনি বলেন, ‘অভিনয় আমার কাছে ভালোবাসার জায়গা। আমি এটিকে কখনও শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখিনি। হয়তো সে কারণে কাজ কম হলেও আমি এমন কিছু করতে চাই, যেটি করার পর মনে হবে সময়টা সার্থক হয়েছে।’
রুনা জানেন, একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজের পছন্দের সব চরিত্র সব সময় বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রযোজক বা পরিচালক না হলে একজন অভিনয়শিল্পীর হাতে গল্প বা চরিত্র নির্ধারণের ক্ষমতা সীমিত। সে কারণে তাঁর কাছে যে কাজের প্রস্তাব আসে, সেখান থেকে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি কৃতজ্ঞ তাঁর পরিচালকদের প্রতি–ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তারা তাঁকে নানা ধরনের চরিত্রে ভেবেছেন।

তাঁর ভাষ্যে, ‘একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর হাতে সব সময় চরিত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। আমাদের কাছে যে কাজ আসে, সেখান থেকে বেছে নিতে হয়। তাই যারা আমাকে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে ভেবেছেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
শহীদ মিনারের সেই মঞ্চ থেকে আজকের ওটিটির পর্দা। রুনা খানের পথচলা তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর ক্যারিয়ারের গল্প নয়। এটি চরিত্রের ভেতর দিয়ে নানা মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে দেখার গল্প। কখনও তিনি প্রান্তিক এক নারী, কখনও উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি; কখনও খুব পরিচিত কোনো মানুষ, আবার কখনও সম্পূর্ণ অচেনা এক জীবন। চরিত্র বদলায়, গল্প বদলায়, বদলে যায় মানুষের জীবনও। অভিনয়ের প্রতি রুনা খানের টানটা একই থাকে।
- বিষয় :
- রুনা খান