সমকালীন প্রসঙ্গ
রাষ্ট্র পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
অনেক দেশে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং আন্তঃসরকারি সংস্থাগুলোও এআইয়ের ব্যবহার শুরু করেছে।
মো. সুমন জিহাদী
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৪৫ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:০৪
যুগে যুগে মানুষের জীবন সহজ করতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে যন্ত্র; সেটি হোক চাকা, বাষ্পচালিত ইঞ্জিন বা কম্পিউটার। পৃথিবীতে রাষ্ট্রগুলো এখন আর কেবল মনুষ্য সরকার দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে না বরং এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সুপারকম্পিউটার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতিমানবীয় অস্তিত্বের ব্যাপক প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার অপরিহার্য। তবে সেটি হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)-এর দক্ষ ও নৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে।
কেন্দ্রীয় থেকে স্থানীয় সরকার, ব্যক্তি থেকে সংগঠন, প্রতিটি স্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রয়োগ এখন প্রতিযোগিতামূলক। অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা থেকে শুরু করে, বিশ্বযোগাযোগ, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান সবকিছু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পর্যালোচনা করা সম্ভব এবং সে অনুযায়ী সরকার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক অপরাধ, নাগরিক সুবিধা, পেশাগত উন্নয়ন, চিকিৎসাসেবা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিসেবা, বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমনভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব যে তা বর্তমান ও ভবিষ্যতের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের পরিমাণ কমায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো অগণিত কম্পিউটারে রক্ষিত অগণিত তথ্যের সম্ভার; যেগুলো যাচাই করে সে মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো করে আলোচনায় অংশ নিতে পারে, যুক্তি দিতে পারে, তর্ক করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অনেক দেশে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং আন্তঃসরকারি সংস্থাগুলোও এর ব্যবহার শুরু করেছে। সুতরাং সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গেলে বাংলাদেশকেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে, উদ্ভাবনে এবং ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হতে হবে। এর সঙ্গে নির্ভর করছে আগামী দিনের নাগরিকদের সেবা, রাষ্ট্রের উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং সুশাসন। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের সম্ভাবনা ও ঝুঁকিগুলোর প্রশিক্ষণ হতে পারে সরকারি ও বেসরকারি সকল কর্তৃপক্ষের একটি জরুরি বিষয়।
বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগে প্রথমে প্রয়োজন সকল তথ্য ইন্টারনেটে সংরক্ষণ করা। তথ্য যেহেতু লম্বা সময় নানা কাজে ব্যবহার করা হবে এ কারণে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের তাগিদ এখান থেকে বাড়বে বলে আশা করা যায়। এসব ডেটাবেজ তথা তথ্যসম্ভারের মধ্যে আন্তঃসংস্থা সমন্বয় বা ডেটা ইন্টিগ্রেশন আরও একটি জরুরি পদক্ষেপ। ধীরে ধীরে ডেটাবেজ শক্তিশালী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্ত অনেক বেশি নিখুঁত ও কার্যকর হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর খাত হলো ডিজিটাল অর্থনীতি এবং রাজস্বব্যবস্থাপনা।
বাজার পর্যবেক্ষণ, পণ্যের দামস্তর পর্যালোচনা, নতুন পণ্যের সম্ভাবনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। শ্রমব্যবস্থাপনা, বেকারত্ব এবং বিনিয়োগ ঝুঁকি যাচাই করতে এখন পৃথিবীর অনেক দেশে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এই প্রযুক্তি। একই সঙ্গে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর, আমদানি-রপ্তানি এবং ব্যবসায়িক লেনদেনের তথ্যের মধ্যে অস্বাভাবিক বিন্যাস শনাক্ত করা যায়। যেমন কোনো প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত বিক্রয়, আমদানি এবং কর প্রদানের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলে সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। ফলে সবাইকে হয়রানি না করে ঝুঁকিনির্ভর অডিট করা সম্ভব। সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে এক অনন্য ও কার্যকর উপকরণ হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু এর নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, ব্যবহার বিধি আছে, আছে অতি নির্ভরতার ঝুঁকি। সেগুলো অতিক্রম করা ও নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থাও মানুষের হাতে রয়েছে।
বাংলাদেশের মতো দেশের প্রথম চ্যালেঞ্জ এই প্রযুক্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা এখনেও পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নয়। মানসিক এবং দাপ্তরিক জড়তা রয়ে গেছে। একই সঙ্গে শক্ত একটি কম্পিউটার ইকোসিস্টেম এখনও প্রতিষ্ঠা করা যায়নি যে বিভিন্ন দপ্তরের তথ্যসম্ভার দ্রুত হালনাগাদ করা বা সংযুক্ত করা যাবে। এর বাইরে রয়েছে অতি নির্ভরশীলতার ঝুঁকি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অনেকে মানুষ অপেক্ষা বেশি নিখুঁত মনে করেছিলেন প্রাথমিকভাবে। বিষয়টি সেরকম নয়। বরং মানুষের প্রদত্ত তথ্য দিয়ে মানুষকে দুর্দান্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দিতে পারে এআই। এ কারণে এটি আমাদের সিদ্ধান্ত দেবে বিষয়টি সেরকম নয়, বরং এটি আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করবে। মুশকিল হলো, এআই আসলে তথ্যের বিশ্লেষণটি কীভাবে করছে বা তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সে প্রক্রিয়া, প্রায়োরিটি, পরিচালন কার্যকারণগুলো অজানাই থেকে যায়। একে বলা হচ্ছে ‘ব্ল্যাক বক্স সিনারিও’। এলগরিদমের অস্পষ্টতাকে বলা হচ্ছে ‘এলগরিদম অ্যাকাউন্টিবিলিটি’।
জবাবদিহিতার আরও জায়গা রয়েছে; কেননা নৈতিক ও পক্ষপাতমূলক ঝুঁকির বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারকালে নাগরিকের ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর তথ্যও ব্যবহার করা হয়। এ কারণে সেটির অনুমোদন গ্রহণ করা প্রয়োজন আগে। এছাড়া প্যাটার্ন বা বিন্যাসনির্ভর সিদ্ধান্ত তৈরির কারণে দরিদ্রকে ও তার পরিবারকে দরিদ্র ধরে নেওয়া, অশিক্ষিত পরিবারের সকল সদস্যকে অশিক্ষিত ধরে নেওয়া, লিঙ্গ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষকে চূড়ান্ত লৈঙ্গিক পরিচয় মনে করা ইত্যাদি পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়; যা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে সিভিল সার্ভেন্ট বা সরকারি কর্মচারীদের দক্ষ এবং সাবধানী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জাতিসংঘ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষজ্ঞ দল। ইউনেস্কো সরকারি কর্মচারীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে।
সেটি ‘আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স অ্যান্ড ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন কম্পিটেন্সিস ফর সিভিল সার্ভেন্ট’ নামে পরিচিত এবং পৃথিবীর অনেক দেশ ইতোমধ্যে নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফিনল্যান্ড এক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে। একটি দেশ তার সরকারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে প্রস্তুত কিনা সেটিও একটি প্রশ্ন। এ কারণে ইউনেস্কো ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রস্তুতি পর্যালোচনা রিপোর্ট’ প্রকাশ করে। ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ ডিজিটাল গভর্ন্যান্সে ভালো করলেও ডেটা সিস্টেম দুর্বল। আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের আন্তরিক অবস্থান থাকলেও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা দুর্বল। সবচেয়ে বেশি দুর্বলতা দেখা গিয়েছে পাবলিক সেক্টরের সক্ষমতা নিয়ে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে। প্রতিবেদনের সারকথা ছিল আমরা চাই বা না চাই, পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুশাসনের পথে হাঁটতে এই প্রযুক্তি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়বে। আগামী দিনের কল্যাণ রাষ্ট্রের সরকার মনুষ্য ও যন্ত্র উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত হবে এমনটি ভবিষ্যদ্বাণী করছেন বিশেষজ্ঞগণ। যত দ্রুত আমরা আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অবকাঠামো ও দক্ষতা বাড়াব ততোই মঙ্গল।
মো. সুমন জিহাদী: পিএইচডি ফেলো, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, থাইল্যান্ড
- বিষয় :
- এআই
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা