সাদা কালো
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে চাপান-উতোরের রহস্য
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত মার্চ মাসের কথা। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তখন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। সেই মাসের ১৫ তারিখে সরকার একযোগে ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক পদে বসায়। এর আগে দুই দফায়– ২৩ ফেব্রুয়ারি ও ১৪ মার্চ সরকার ১১টি সিটি করপোরেশনে সরকারদলীয় নেতাদের প্রশাসক পদে বসিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই তখন এমন একটা সন্দেহ বিশেষত বিরোধী দলগুলোর মধ্যে দানা বাঁধে যে, নিকট ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হচ্ছে না।
ওই সময় বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘নানা ভুল ধারণা নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। পরবর্তী সময় আর কোনো প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে না, সবগুলোতেই নির্বাচন হবে’ (২৩ মার্চ ২০২৬)। তিনি বেশ স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘নির্বাচন ছাড়া হবে না, নির্বাচন অবশ্যই করা হবে। তবে এ মুহূর্তে করার কোনো পরিকল্পনা নাই, আমরা একটু সময় নিতে চাই। তবে, বড়জোর তিন মাস সময় নিতে পারি আমরা।’ ওই সময় তিনি এটাও জানিয়েছিলেন, ইউনিয়ন পরিষদ দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় সরকার। এর পর ধারাবাহিকভাবে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনের আয়োজন করা হবে।
সেই তিন মাসের জায়গায় ইতোমধ্যে ছয় মাস পার হয়ে গেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আর স্থানীয় সরকারমন্ত্রী নেই। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কোনো দেখা নেই। এমনকি সেই মার্চ থেকে নানা কথা শেষে সোমবার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ১২ নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট হওয়ার কথা জানালেও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিরূপ মন্তব্যের মুখে ইসি কার্যত পিছু হটল।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার কিছুই জানে না’ (সমকাল, ১৬ সেপ্টেম্বর)। যদিও দুই মাস আগে থেকেই তাঁর মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত চিঠি চালাচালি করছে নির্বাচন কমিশন। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ তো ইসির এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলে বলেছেন, স্থানীয় সরকার আইনের মধ্যে এমন কিছু নেই যে, সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়া নির্বাচন কমিশন কাজ করতে পারে (সমকাল, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
লক্ষণীয়, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর মঙ্গলবারই ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউপি নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী যেটি বলেছেন, সেটি শিরোধার্য। এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না।’ অর্থাৎ স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করাই ইসির কর্তব্য। কিন্তু এতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির সক্ষমতা নিয়েই কি প্রশ্ন ওঠে না?
নিঃসন্দেহে ইসি সাংবিধানিক সংস্থা হলেও সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই। আর নির্বাচন যেহেতু বিশাল যজ্ঞ, তার সময় নির্ধারণেও সরকারের পরামর্শ বা প্রস্তাব বাস্তব কারণেই উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কথা তো সোমবারই প্রথম ওঠেনি!

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, সংসদ নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথা উঠেছিল। বিএনপিসহ বেশির ভাগ দল এর বিরোধিতা করেছিল। অনস্বীকার্য, অন্তর্বর্তী সরকারের ওই পরিকল্পনার নেপথ্যে জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার অসদুদ্দেশ্য কাজ করেছিল। তাই বিএনপির সেই বিরোধিতাও জনগ্রাহ্যতা পেয়েছিল। তবে এটাও ঠিক, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসার পরপরই বিরোধী শিবিরসহ বিভিন্ন মহল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তাগিদ দেওয়া শুরু হয়। এর পরের সাত মাসও কি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন নিয়ে সরকার ও ইসির মধ্যে প্রয়োজনীয় আলোচনা সারার জন্য যথেষ্ট নয়?
স্থানীয় সরকারের সব কটি আইনে কিন্তু নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসিকে। তদুপরি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের স্বার্থে কোন কোন বিষয়ে ইসি বিধান বানাতে পারবে, সেটাও ওই আইনগুলোতে বলা আছে। আর আইনগুলোর কোথাও বলা নেই– নির্বাচন আয়োজনে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। অথচ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ নিয়ে ইসির ঘোষণার পর মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে, সরকারের ‘অনুমতি’ অনিবার্য আইনি বাধ্যবাধকতা। তারা এসব বক্তব্য দেওয়ার সময় সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদও মনে রাখছেন না; নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ ইসির সব কাজে সহায়তা দেওয়া সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক।
আইন অনুসারে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা– সব পরিষদেরই নির্বাচন হতে হয় পরিষদ গঠনের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে। সেই হিসাবে সব কটি ইউনিয়ন পরিষদে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নির্বাচন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করেছিল। তখন ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিদের না সরালেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র অনুসারে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে সরকার দেড় হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক বসিয়েছে (সমকাল, ১৬ সেপ্টেম্বর)।
বিভিন্ন প্রকার জনসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় সরকারের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে বর্তমানে স্থবিরতা নেমে এসেছে। সেবাপ্রত্যাশীদের দুর্ভোগও চরমে। অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক বসানো হলেও কোথাও কাঙ্ক্ষিত গতি আসেনি। ফলে আইনি তো বটেই, বাস্তব কারণেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকা জরুরি হয়ে পড়েছে।
অবশ্য, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশে বর্ণিত ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ আরও অনেক দিন জারি রাখতে চায়। সম্ভবত এ কারণেই তারা প্রায় বিনাবাক্যে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদ অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করেছে, যে আইন ব্যবহার করে তারা স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ে দলীয় লোক বসিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদকেও ছাড় দেয়নি; অন্তত এক-তৃতীয়াংশ ইউনিয়ন পরিষদের শীর্ষ পদে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসানো হয়েছে। বিশেষত তাদের, যারা বিগত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাননি বা মনোনয়ন পেলেও জিততে পারেননি। এতে ‘ক্ষমতার ভাগ’ নিয়ে দলের মধ্যে প্রায় সর্বস্তরে মাথাচাড়া দেওয়া কোন্দল কিছু মাত্রায় প্রশমিত করা গেছে।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতিও সম্ভবত সরকারকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিকে এগোনোর ভরসা জোগাচ্ছে না। একদিকে, নির্বাচনের আলোচনা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য বিএনপিদলীয় প্রার্থীদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ বাধছে; অনেক হতাহতের ঘটনাও ঘটছে; নির্বাচনের আসল ঘণ্টা বাজলে পরিস্থিতি যা দাঁড়াতে পারে তা নিয়ন্ত্রণ দুঃসাধ্য। অন্যদিকে, ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট যুক্ত হয়ে সরকার সম্পর্কে জনমনে যে হতাশার জন্ম হয়েছে, তা যে কোনো সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জেনেশুনে কে চায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে!
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন