সাইবার সুরক্ষা আইন
সংশোধনের নামে শঙ্কা সৃষ্টি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাইবার সুরক্ষা আইনের কতিপয় সংশোধনী প্রস্তাব লইয়া জনমনে যেই উদ্বেগ সৃষ্টি হইয়াছে, উহা সংগত। সোমবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ইতোমধ্যে আইনটি সংশোধনের খসড়া প্রকাশ করিয়াছে। উহা হুবহু আইনে পরিণত হইলে কেবল নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকারই সংকুচিত হইবে না; ভিন্নমত দমনের জন্যও রাষ্ট্র নূতন হাতিয়ার পাইবে। যেমন মূল আইনে মানহানির অংশটি না থাকিলেও সংশোধনীর খসড়ায় তাহা অন্তর্ভুক্ত করিয়া পাঁচ বৎসর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হইয়াছে। তদুপরি সংশোধনীতে গুজব ও অপতথ্য সংক্রান্ত ধারা যুক্ত করিয়া সেইগুলি প্রচার করিলে ১০ বৎসর কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হইয়াছে। অধিকতর উদ্বেগের বিষয়, সংশোধনীতে ‘মানহানি’, ‘অবমাননা’, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ ধারণাগুলিও যথেষ্ট স্পষ্ট নহে। ফলে এই সকল বিষয়ে মনগড়া ব্যাখ্যা দানের ফলে প্রতিপক্ষ বা অপছন্দের ব্যক্তিকে হয়রানির সুযোগ বৃদ্ধি পাইতে পারে। বিরোধী দল এবং নাগরিক সংগঠনগুলিও খসড়া আইনটি সম্পর্কে অনুরূপ মত ব্যক্ত করিয়াছে। টিআইবি বলিয়াছে, খসড়াটি পাস হইলে সাইবার জগৎ ‘নিপীড়নের ভুবন’-এ পরিণত হইবে।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রণীত ডিএসএ বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানহানির জন্য ১০ বৎসর কারাদণ্ডের বিধান ছিল। সমালোচনার মুখে সেই সরকারই আইনটি বিলুপ্ত করিয়া সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে, যেইখানে উক্ত অপরাধের জন্য জরিমানার বিধান থাকিলেও কারাদণ্ড ছিল না। উপরন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার উক্ত মানহানি-সংক্রান্ত ধারাটিই বাদ দিয়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করে, যাহা বিএনপি ক্ষমতায় আসিয়া হুবহু আইনে পরিণত করে। কিন্তু আলোচ্য সংশোধনীতে সরকার শুধু বিতর্কিত ধারাটিই ফিরাইয়া আনে নাই; সেই দানবীয় ডিএসএরও ছায়া স্পষ্ট করিয়াছে।
পরিহাসের বিষয়, সাধারণ নাগরিক এবং বিএনপি নেতাকর্মীরাও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের শিকার হইয়াছিলেন। অসুস্থ অবস্থায়ও জামিন না পাইয়া কেহ কেহ কারাগারেই প্রাণ হারাইয়াছেন। উক্ত প্রেক্ষাপটে সেই আমলেই ঘোষিত দলটির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে বলা হইয়াছিল, মুক্ত চিন্তার পথ রুদ্ধকারী কিংবা ভিন্নমত দমনকারী সকল ধরনের দমনমূলক ও কালো আইন সংস্কার বা বাতিল করা হইবে। সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী কেবল বিএনপির ঘোষিত অবস্থানেরই বিরুদ্ধে নহে; স্বৈরতন্ত্রের বাতাবরণ সৃষ্টির শঙ্কাও জাগাইয়া তোলে।
রবিবার প্রকাশিত বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুসারে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলিয়াছেন, সংশোধনীর মূল লক্ষ্য ডিজিটাল স্পেসে ‘শালীনতা’ ফিরাইয়া আনা; নারী ও তরুণদের সাইবার বুলিং হইতে রক্ষা এবং সাংবাদিকের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা। উত্তম উদ্দেশ্য, সন্দেহ নাই। কিন্তু যেইখানে শালীনতার সংজ্ঞাই স্পষ্ট নহে, সেইখানে উক্ত উদ্দেশ্য সাধন হইবে কী প্রকারে? আর খসড়ায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যেই সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের কথা বলা হইয়াছে, উহার পক্ষে নাগরিকের প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করা কতখানি সম্ভবপর?
অভিজ্ঞতা বলে, সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার জগৎ যদ্রূপ নাগরিকের মতপ্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছে; তদ্রূপ এই সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমারও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাদী হয় সরকার বা উহারই সমর্থকরা। অন্যদিকে, প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে সরকারের পাঁচজন মন্ত্রীর সহিত বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা থাকিবেন। ইহাতে দুইজন বেসরকারি বিশেষজ্ঞ থাকিবার কথা বলা হইলেও, তাহারা সরকারেরই মনোনীত। বস্তুত উহাতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব উত্তমরূপেই বিরাজ করিবে।
আমরা মনে করি, সরকারের উচিত হইবে যথাযথভাবেই জনমত যাচাই শেষে বিতর্কিত ধারাগুলি বাদ দিয়া মতপ্রকাশের অধিকারবান্ধব সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণয়ন। সংশোধনের নামে শঙ্কা সৃষ্টি নহে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়