ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দিবস

শিক্ষা দিবসের শিক্ষা

শিক্ষা দিবসের শিক্ষা
×

আকমল হোসেন

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবসটি সরকারিভাবে পালিত না হলেও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো তা পালন করে। শিক্ষার অধিকার আদায়ে ওই দিন ঢাকার রাজপথে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক শাসকের পুলিশ বাহিনীর বুলেটে জীবন দিতে হয়েছিল মোস্তফা, ওয়াজিল্লাহ, বাবুল প্রমুখ ছাত্রনেতার। সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান গঠিত শরীফ কমিশন একটি শিক্ষানীতি প্রস্তাব করে, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল বিশেষত উচ্চশিক্ষা সংকোচন। তা বাতিলের দাবিতে ৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল। সেই ধর্মঘট পালনকালেই পুলিশি এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর পরিণতি অবশ্য দাঁড়ায় শরীফ কমিশনের শিক্ষানীতি বাতিল। 

কার্যত ওই আন্দোলন ছিল ভাষা আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা। তার আগে ১৯৫০ সালে রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডে পুলিশি হামলায় সাতজন বামপন্থি রাজনীতিক নিহত ও ৩২ জন আহত হন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে হত্যা করে বরকত, সালাম, রফিক, শফি ও জব্বারকে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ৯২-এর ‘ক’ ধারা জারির মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

তথাকথিত স্বাধীন পাকিস্তানে ১৯৫৬ সালের আগে কোনো সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হয়নি। বরং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বার্থবিরোধী নানা কালাকানুন জারি করতে থাকে পাকিস্তানের  শাসকরা। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিচর্চার পরিবর্তে পুলিশি রাষ্ট্র কায়েমের প্রক্রিয়া হিসেবে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করা হয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের  সচেতন মানুষ এবং রাজনৈতিক মহলে প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন তীব্র হয়েছিল। 

শিক্ষা মৌলিক অধিকার হিসেবে পৃথিবীর দেশে দেশে গৃহীত হলেও বাংলাদেশে এখনও সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়নি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সংবিধানের ১৭-এর খ ধারার আলোকে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। জাতীয় বাজেটে প্রাথমিকভাবে জিডিপির ৫ শতাংশ এবং পর্যায়ক্রমে ইউনেস্কোকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৭ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তারই অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু একবারে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারীকরণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের আমলে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ হয়েছে। তবে এখনও চার হাজারের মতো বেসরকারি বিদ্যালয় রয়ে গেছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ৯০ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি। সংবিধানে একই ধারার সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের কথা থাকলেও বর্তমানে বহু ধারার শিক্ষা চলমান। শিক্ষায় অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাড়েনি। শিক্ষা প্রশাসনে দলীয়করণের ভূত এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে দলীয়করণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বাদে সবটাতে দলীয়করণের ভূত চেপে বসেছে। ফলে দলীয়ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলায় তুলনামূলক কম যোগ্যতার লোক শিক্ষা প্রশাসনে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ফলে শিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। সৃজনশীল আর এমসিকিউ পরীক্ষা পদ্ধতিতে গ্রুপ অব কোম্পানির মালিকরা শিক্ষা ব্যবসা শুরু করে শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে। শিক্ষা আজ সুপারমার্কেটের পণ্যের মতো। যার টাকা আছে, সে-ই সেটা কিনতে পারবে। 
জাপান ১৮৬০ সালে তার শিক্ষা নিয়ে ভাবনা শুরু করে ১৮৬৩ সালে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের জাতীয় বাজেটের ৪৩ ভাগ শিক্ষায় বরাদ্দ করেছিল। চার দশক পর জাপান পৃথিবীতে উন্নত দেশের মডেল হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। আর আমরা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করে ফেলি। দেশ ও জাতির উন্নয়নে সবাই মিলে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটা ঐকমত্যে আসার এখনই সময়। এর বাইরে বিকল্প কোনো পথ থাকতে পারে না।

আকমল হোসেন: অধ্যক্ষ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাকবিশিস  

আরও পড়ুন

×