নাগরিক সুরক্ষা
ছোট আগুন যেন বড় দুর্ঘটনা না হয়
সাখাওয়াত স্বপন
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও অগ্নিকাণ্ডের খবর আসে। কখনও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে; কখনও শপিং মল, বাজার বা বাণিজ্যিক ভবনে; আবার কখনও হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকায়। এসব অগ্নিকাণ্ড শুধু সম্পদেরই ক্ষতি করে না; অনেক সময় কেড়ে নেয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
রাজধানী ঢাকার বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সরু সড়ক, ভবনের ঘনত্ব এবং নানা ধরনের ঝুঁকির কারণে এখানে একটি অগ্নিকাণ্ড খুব দ্রুত বড় ধরনের বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। আগুন যখন শুরু হয় তার প্রথম কয়েক মিনিটই নির্ধারণ করে দেয়– ঘটনাটি ছোট দুর্ঘটনা হিসেবে নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি বড় ধরনের বিপর্যয়ে পরিণত হবে।
যে কোনো অগ্নিদুর্ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রথম প্রত্যাশা থাকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রতি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ, আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার এবং প্রয়োজনীয় জরুরি সাড়াদান কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু ঘটনাস্থলের অবস্থান, যানজট ও রাস্তার অবস্থার কারণে তাদের পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগতেই পারে। আর এই সময়টিই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাস্থলে থাকা প্রশিক্ষিত মানুষ সঠিকভাবে কাজ করতে পারলে আগুনের প্রাথমিক বিস্তার সীমিত করা, মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সেফটি কমিটি গঠনের বিধান
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ৯০ক অনুযায়ী, ৫০ বা ততোধিক শ্রমিক নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানে সেফটি কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধনের পর কমিটিকে কার্যকর রাখার বিষয় আরও স্পষ্ট করা হয়েছে। চিহ্নিত ঝুঁকি, দুর্ঘটনা, বিপজ্জনক ঘটনা ও রোগের বিষয়ে মালিক বা তাঁর প্রতিনিধিকে অবহিত করাও কমিটির দায়িত্ব।
বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এর বিধি ৮১ ও ৮৫ এবং তপশিল-৪-এ সেফটি কমিটির গঠন ও কার্যক্রম বিষয়ে বিধান রয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নির্দেশিকাতেও কমিটি গঠন ও সদস্যদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতটি প্রতিষ্ঠানে এই কমিটি বাস্তবে সক্রিয়? শুধু একটি কমিটি গঠন করে তালিকা টানিয়ে রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
থাকতে হবে প্রশিক্ষিত দল
একটি প্রতিষ্ঠানে সেফটি কমিটি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় সেটিই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এর বিধি ৫৫(১০)-এ সম্ভব হলে সব শ্রমিককে অথবা প্রতিটি বিভাগে নিয়োজিত শ্রমিকের অন্তত ১৮ শতাংশকে অগ্নিনির্বাপণ, জরুরি উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রশিক্ষিত শ্রমিকদের অগ্নিনির্বাপক, উদ্ধারকারী ও প্রাথমিক চিকিৎসা দলে ভাগ করার কথাও রয়েছে।
অর্থাৎ দেয়ালে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ঝুলিয়ে রাখলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। সেটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে; কোন আগুনে কোন যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে; কখন আগুন নেভানোর চেষ্টা নিরাপদ এবং কখন দ্রুত ভবন ত্যাগ করতে হবে– এসব বিষয়ে বাস্তব প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। জরুরি পরিস্থিতিতে কে মানুষকে বের করে আনবে; কে নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করবে এবং কে ফায়ার সার্ভিসকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেবে– এসব দায়িত্বও আগে থেকে নির্ধারিত থাকা উচিত।
ফায়ার সার্ভিস আসার আগের সময়কে কাজে লাগাতে হবে
আগুন লাগার পর প্রথম কয়েক মিনিট কোনোভাবেই অবহেলার সময় নয়। একটি ছোট আগুন দ্রুত বড় আগুনে পরিণত হতে পারে। আবার প্রশিক্ষিত দল থাকলে পরিস্থিতি নিরাপদ থাকা সাপেক্ষে প্রাথমিকভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং আহতদের সহায়তা করা সম্ভব হতে পারে।
তবে প্রশিক্ষিত দলকে কখনোই অযথা ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। আগুনের আকার, ধোঁয়ার মাত্রা, ভবনের কাঠামোগত ঝুঁকি কিংবা রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি বিবেচনা করে কখন আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হবে এবং কখন দ্রুত সরে যেতে হবে– সেই সিদ্ধান্তের প্রশিক্ষণও জরুরি।
ফায়ার সার্ভিসের সহযোগী শক্তি
প্রশিক্ষিত অগ্নিনির্বাপক বা উদ্ধারকারী দল গঠনের অর্থ ফায়ার সার্ভিসের বিকল্প তৈরি করা নয়। বরং এটি তাদের কাজকে আরও কার্যকর করার একটি উপায়। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর যদি প্রশিক্ষিত স্থানীয় দল দ্রুত জানাতে পারে– কোথায় আগুনের শুরু; কোথায় দাহ্য বা রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে; কতজন মানুষ আটকে থাকতে পারেন; কোন পথে প্রবেশ তুলনামূলক নিরাপদ, তাহলে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে। আমাদের প্রয়োজন তাই ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বিত স্থানীয় সক্ষমতা।
প্রাথমিক চিকিৎসাও অগ্নি নিরাপত্তার অংশ
শুধু আগুনে পোড়া নয়; ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট, পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া, কাটাছেঁড়া কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। তাই প্রাথমিক চিকিৎসা অগ্নি নিরাপত্তারই অংশ।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ৮৯ অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মঘণ্টায় সহজে পাওয়া যায় এমন প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স বা আলমারি রাখার বিধান রয়েছে। সাধারণভাবে প্রতি ১৫০ শ্রমিকের জন্য অন্তত একটি বাক্স বা আলমারি এবং দায়িত্বে প্রশিক্ষিত ব্যক্তির ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। ৩০০ বা ততোধিক শ্রমিক নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের জন্য রোগী কক্ষ বা সিক রুম ও চিকিৎসা সুবিধার কথাও আইনে রয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসাকে তাই একই জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

আবাসিক ভবনেও প্রশিক্ষণ
শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, আবাসিক ভবনেও অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে প্রস্তুতি প্রয়োজন। আগুন লাগলে আতঙ্কিত হয়ে লিফটে ওঠা; ধোঁয়ায় ভরা সিঁড়িতে ছুটে যাওয়া কিংবা পরিস্থিতি না বুঝে আগুন নেভানোর চেষ্টা বিপদ আরও বাড়াতে পারে।
প্রতিটি আবাসিক ভবনের প্রতি ইউনিটের অন্ততপক্ষে একজন বাসিন্দাকে মৌলিক অগ্নি নিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি যোগাযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত ভবন খালি করার মহড়ার আয়োজন এবং জরুরি বহির্গমন পথ ও সিঁড়ি ব্যবহারযোগ্য রাখা প্রয়োজন। শিশু, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য আলাদা উদ্ধার পরিকল্পনাও থাকা উচিত।
ছোট আগুন যেন বড় দুর্ঘটনা না হয়
আমাদের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি প্রয়োজন মানসিকতায়। দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে দুর্ঘটনার আগেই প্রস্তুত হতে হবে। সেফটি কমিটি সক্রিয় থাকবে; প্রশিক্ষিত অগ্নিনির্বাপক, উদ্ধারকারী ও প্রাথমিক চিকিৎসা দল থাকবে; নিয়মিত মহড়া এবং সরঞ্জাম পরীক্ষা করা হবে।
অগ্নি নিরাপত্তা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। এটি আইন, দায়িত্ব ও মানবিকতার প্রশ্ন। আমাদের এমন ‘প্রথম সাড়াদানকারী’ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ফায়ার সার্ভিস আসার আগের সময়টিতেও দায়িত্বশীল ও প্রশিক্ষিত মানুষ প্রস্তুত থাকবে।
তাই এখন সময় এসেছে– শুধু অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে; শুধু সেফটি কমিটি গঠন করে দায়িত্ব শেষ না করে; কিংবা শুধু নিয়মিত মহড়া আয়োজনের মধ্যেই নিরাপত্তাকে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশিক্ষিত মানুষ, কার্যকর জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার। কারণ অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথম কয়েক মিনিটই অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে একটি প্রশিক্ষিত হাত, একটি সঠিক সিদ্ধান্ত এবং একটি কার্যকর জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থা অনেক মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
শেষ পর্যন্ত একটি জীবন বাঁচানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই।
সাখাওয়াত স্বপন: প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, সেফটি ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশন
[email protected]
- বিষয় :
- নাগরিক