আন্তর্জাতিক
সৌদি-ইরানের উত্তেজনায় মক্কা চুক্তির চ্যালেঞ্জ
জাহিদ হুসেন
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি প্রথমবারের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে বাড়তে থাকা সংঘাতই এর চ্যালেঞ্জ। হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে সৌদি বিমান ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবও ইয়েমেনে হুতিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে বিমান হামলা জোরদার করেছে। এ ছাড়া হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোতেও হামলা চালিয়েছে।
উত্তেজনার সূত্রপাত জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে, যখন ইয়েমেনি বাহিনী সানা বিমানবন্দরে ইরান থেকে আসা ফ্লাইটে হামলা চালায়। এর জবাবে হুতিরা আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবের ওপর নৌ অবরোধ ঘোষণা এবং সৌদি পতাকাবাহী জাহাজে আক্রমণ শুরু করে। ২০১৪ সাল থেকে হুতিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সহিংসতা কিছুটা কমেছিল। তবে জুলাইয়ের ওই ঘটনার পর সেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ এবং তাদের ওপর হামলা চালাতে শুরু করে। লোহিত সাগরের অংশ থেকে সৌদি আরবকে বিতাড়িত করে পুরো ভূখণ্ডের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়াই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।
পশ্চিমে চলমান এই নতুন উত্তেজনা সংঘাতের পরিধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যদিও ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ এখনও কোনো চূড়ান্ত মীমাংসা ছাড়াই এগোচ্ছে। লড়াই যখন সরাসরি সৌদি আরবকে হুমকির মুখে ফেলছে, তখন কি রিয়াদ তার আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা জোটের পারস্পরিক সাহায্য সংক্রান্ত অনুচ্ছেদটি সক্রিয় করবে? অনুচ্ছেদটির মূল কথা, কোনো এক সদস্যের ওপর আক্রমণ মানে সব সদস্যের ওপর আক্রমণ? পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
ইয়েমেনের অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা হুতিরা এবার সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে একটি কৌশলগত দ্বীপ দখল করে নিয়েছে। এর ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে গেছে– এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যা দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের ১২ শতাংশ পরিচালিত হয়। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের ৯০ শতাংশই এখন হুতিদের দখলে। যদিও হুতি নেতৃত্ব জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরে সব বাণিজ্যিক জাহাজ বন্ধ করতে চায় না, তাদের লক্ষ্য শুধু সৌদি-সংক্রান্ত জাহাজগুলো।
এই ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে অন্যান্য জাহাজও এই পথ এড়িয়ে চলবে বলে মনে করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় পুরো পরিস্থিতি এখন অগ্নিগর্ভ। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার ছয় মাসের সংঘাতে ইতোমধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজার বিপর্যস্ত, যা এখন আরও বড় ধাক্কার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীর এমন পদক্ষেপ সংঘাতের এক নতুন ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। একই সময়ে ইরাক থেকে পরিচালিত একটি ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয়। হামলাটি সম্ভবত ইরান-ঘনিষ্ঠ অপর গোষ্ঠী চালিয়েছে। সব মিলিয়ে এসব ঘটনা সৌদি তেলের রপ্তানিকে ব্যাহত করেছে। এটি সর্বজনবিদিত, ইরান হুতিদের সমর্থন দেয়, যদিও গোষ্ঠীটি তেহরানের থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনভাবেও কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান যখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে লিপ্ত, তখন সৌদি আরবে এ ধরনের হামলা নিঃসন্দেহে তেহরানের স্বার্থের অনুকূল নয়, যার নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।
যে সৌদি আরব এতদিন ইরান যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিল, তারা এখন বড় আঞ্চলিক সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। যদিও ইরান দুই মিলিশিয়া গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিচালিত সৌদি তেল অবকাঠামোতে হামলার কথা অস্বীকার করেছে, তাহলেও এসব ঘটনা রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যকার উত্তেজনাকে করেছে বহুগুণ। এই হামলার পরপরই হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার পরিকল্পিত আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়।
ওমানে অনুষ্ঠিতব্য এই আলোচনা ছিল দুই বছরের মধ্যে ইরান ও জিসিসির প্রধান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রথম যৌথ বৈঠক। এটি ছিল ওই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে অবাধ চলাচলের পথ সুগম করার আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগ। কিন্তু সাম্প্রতিক এই যুদ্ধাবস্থা সেই প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
পাকিস্তান এবং এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল; উভয়ের জন্যই পরিস্থিতি এখন আশঙ্কাজনক। ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধ সেসব দেশকেও টেনে নিতে পারে, যারা এ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছিল এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার চেষ্টা করছিল। পাকিস্তান এমন একটি যুদ্ধে নিজেকে জড়াচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই তাদের সতর্ক পথ অবলম্বন করা প্রয়োজন।
জাহিদ হুসেন: পাকিস্তানি সাংবাদিক, ডন থেকে ঈষৎ সংক্ষপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক