সমকালীন প্রসঙ্গ
ব্রিকস সম্মেলন: বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা কতটা এগোল?
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৪৪
১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন ১৪০ দফার নয়াদিল্লি ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। সারারাত ধরে আলোচনার পর ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে সদস্যদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য সত্ত্বেও ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ ১১টি সদস্ দেশ সর্বসম্মতভাবে এই ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য, কারণ চলতি বছরের মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল।
ঘোষণাপত্রে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে, তবে সেখানে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও ফিলিস্তিনি জনগণের বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা করা হয়েছে, পাহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কারের প্রশ্নে চীন-রাশিয়ার স্থায়ী সদস্যপদের পাশাপাশি ব্রাজিল-ভারতের বৃহত্তর ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে। একতরফা শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মবহির্ভূত সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও বিষয়টি স্পষ্ট।
ব্রিকস আজ বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তথা এনডিবি হলো এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য। ২০২৫ সাল নাগাদ প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১৪০টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, যার প্রায় সাড়ে ৪৩ শতাংশ অর্থায়ন হয়েছে সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায়। এই অর্থে ব্রিকস নিছক আলোচনার মঞ্চ নয়; বরং একটি সমান্তরাল অবকাঠামো অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বাস্তব প্রচেষ্টা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীনের নেতৃত্বাধীন সীমান্ত-পারাপার পেমেন্ট নেটওয়ার্কের দ্রুত সম্প্রসারণ, যা বিকল্প লেনদেন অবকাঠামোর ভিত্তি তৈরি করছে।
মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়ার যুক্ত হওয়া এবং গ্লোবাল সাউথের বিস্তৃত প্রতিনিধিত্ব একে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিন্তু সম্প্রসারণ মানেই সংহতি বৃদ্ধি নয়। বাস্তববাদী তত্ত্বের ভাষায়, কেনেথ ওয়ালৎজের ব্যালান্স অব পাওয়ার ধারণা দিয়ে ব্রিকসকে ব্যাখ্যা করা যায়। এর সদস্যরা বৈশ্বিক একক আধিপত্যবাদী শক্তির বিপরীতে সম্মিলিত ভারসাম্য গড়তে চায়, কিন্তু নিজেদের মধ্যে অভিন্ন আদর্শ বা নিরাপত্তা-স্বার্থ বিলীন করে না। জেমস ফিয়ারনের রেশনালিস্ট দ্বন্দ্ব-তত্ত্ব অনুযায়ী, অসম তথ্য ও ভিন্ন অগ্রাধিকারের কারণে বহুপক্ষীয় জোটে অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয়। ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ কিংবা ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর টানাপোড়েন তারই বাস্তব প্রতিফলন।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জিও-ইকোনমিকস সেন্টারের পর্যবেক্ষণ বলছে, ডলারের রিজার্ভ-মুদ্রা আধিপত্য এখনও সুরক্ষিত এবং ব্রিকসের ডি-ডলারাইজেশন উদ্যোগ বাস্তবে তেমন অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের নেতৃত্বাধীন এমব্রিজ প্রকল্প এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। বাণিজ্যিক পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য পূর্ণাঙ্গ বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা এখনও তৈরি হয়নি। শিকাগো পলিসি রিভিউয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রিকসের লক্ষ্য ডলারকে উৎখাত করা নয়, বরং তার ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা কমিয়ে রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক স্বাধীনতা বাড়ানো। আইএনজির অর্থনীতিবিদ দিমিত্রি দলগিনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়লেও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারকে প্রতিস্থাপনের মতো বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি।
হেনরি কিসিঞ্জারের ধ্রুপদি দৃষ্টিভঙ্গি এখানে প্রাসঙ্গিক। কোনো একক আধিপত্যবাদী ব্যবস্থা চিরস্থায়ী হয় না, ধীরে ধীরে বহুমেরু বা বহুকেন্দ্রিক ভারসাম্যমূলক কাঠামোর জন্ম হয়। সেই রূপান্তর ঘটে বহু দশকের প্রক্রিয়ায় কোনো এক সম্মেলনের ঘোষণায় নয়। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা, এনডিবির মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে ঠিকই কিন্তু একক ব্রিকস মুদ্রা বা ডলারের পূর্ণাঙ্গ প্রতিস্থাপন নিকট ভবিষ্যতেও হয়তো বাস্তবিক নয়। এমনকি রাশিয়াও এখন ডি-ডলারাইজেশন শব্দের বদলে বিকল্প পেমেন্ট পদ্ধতির কথা বলছে, যা বিদ্যমান বাস্তবতা মেনে নেওয়ারই ইঙ্গিত।
রবার্ট পুতনামের টু-লেভেল গেম তত্ত্ব দিয়ে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করা যায়। নয়াদিল্লিকে একদিকে গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলতে হয়েছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে ব্রিকসকে স্পষ্টভাবে পশ্চিমবিরোধী জোটে পরিণত হতে দেয়নি। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক নিবন্ধে, সি রাজা মোহন বলেন, ‘ব্রিকসকে একটি নমনীয় সহযোগিতার মঞ্চ হিসেবে রাখা, কঠোর ভূরাজনৈতিক ব্লক নয়। আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত সব সদস্যের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ঘোষণাপত্র পাস করাতে সক্ষম হয়েছে, যদিও চূড়ান্ত ফল প্রত্যাশার তুলনায় সামান্যই ছিল।
বাংলাদেশের জন্য ব্রিকস অর্থনৈতিক সুযোগ হতে পারত। অবকাঠামো অর্থায়ন, বিকল্প বাজার, জ্বালানি সহযোগিতা ও এলডিসি-উত্তর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন উৎস হতে পারত। কিন্তু কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখে এবারের সম্মেলনে অনুপস্থিত থেকে বাংলাদেশ একটি বিস্তৃত সংযোগের সুযোগ হাতছাড়া করেছে। টমাস শেলিংয়ের কৌশলগত দর-কষাকষি তত্ত্ব অনুযায়ী, আলোচনার টেবিলে অনুপস্থিতি নিজেই এক ধরনের সংকেত, যা প্রতিপক্ষকে অনুকূল ব্যাখ্যা তৈরির সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশের জন্য বিচক্ষণ পথ হলো ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী কোনো শিবির হিসেবে না দেখে, বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। কোনো একক শক্তি-শিবিরের ওপর নির্ভর না করে সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে জাতীয় স্বার্থ সর্বাধিক করা। কূটনীতিতে শূন্য চেয়ারও কথা বলে। কিছু না বলতে পারলেও অন্যরা নিজের মতো করে তার অর্থ তৈরি করে নেয়।
ব্রিকসের ১৮তম সম্মেলন প্রমাণ করেছে যে জোটটি সদস্যদের মতপার্থক্য দূর না করেই সহযোগিতার একটি কার্যকর কাঠামো ধরে রাখতে পেরেছে। এটি পশ্চিমা ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন নয়, বরং তার পাশে ধীরে বিকশিত হওয়া একটি বিকল্প কাঠামো, যার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। প্ল্যাটফর্মটি ডলারকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার মতো শক্তি অর্জন করেনি ঠিকই কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই প্রশ্নটি তাই আদর্শিক নয়, কৌশলগত। কীভাবে ক্রমেই বিকশিত বহুমেরু বাস্তবতাকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা যায়, তার দূরদর্শিতার পরিচয় দেওয়া।
ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক