বাজার
চালের সরবরাহ ও দাম স্বস্তিকর রাখতে হবে
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ধান-চাল উৎপাদনে আমরা কত এগিয়েছি, সেটা বিশ্ব সম্প্রদায়েরও জানা। গত ৫০ বছরে দেশে এর উৎপাদন হয়েছে প্রায় চার গুণ; বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। এ ক্ষেত্রে আমরা ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ হলেও কখনও কখনও কিছু চাল অবশ্য আমদানি করতে হয়; প্রধান এই খাদ্যশস্যের বাজার শান্ত রাখতেই। অতি সতর্কতায় অতিরিক্ত আমদানির প্রবণতাও রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে এটা করা হয়েছিল বলে অনেকের মত। এতে চালের বাজার অবশ্য শান্ত রয়েছে।
চালের দাম কমানোর জনপ্রিয় দাবি থাকলেও কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় এর বিরোধিতাও করা হয়। বিশেষত উত্তোলন মৌসুমে এর দাম যাতে বেশি কমে না যায়, সে জন্য সংগ্রহ অভিযানও পরিচালিত হয়। আউশ উত্তোলন এখন শেষ পর্যায়ে। একেক অঞ্চল থেকে এর উৎপাদন ও দাম সম্পর্কে একেক রকম খবর মিলছে। কোথাও কোথাও কৃষকরা ধান বেচে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না। সামগ্রিকভাবে এর উৎপাদন ৩ শতাংশ কমেছে বলেও প্রতিবেদন বেরিয়েছে।
এর মধ্যে আমন আবাদে চলে গেছে সিংহভাগ কৃষক। এটা আমাদের দ্বিতীয় প্রধান ধান-চাল উৎপাদন মৌসুম। অতিবৃষ্টিতে আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর মিলেছিল। সেই সংকট কাটিয়ে ওঠা গেছে বলেই আশা। তবে সার সংকটের যেসব খবর মিলছে, সেটা উদ্বেগজনক। সার ‘লুট’ এবং সারের দাবিতে সড়ক অবরোধের ঘটনাও রয়েছে। সারের মজুতে ঘাটতি নেই বলে এসব খবর উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। গ্যাস সংকটে সিংহভাগ সার কারখানা চালু রাখা না গেলেও সরকার আমদানি করে পরিস্থিতি সামলাতে চাইছে। কিন্তু কৃষক সময়মতো সার না পেলে এর কোনো দাম নেই। ধানের বদলে যারা বিকল্প ফসল ফলান, তাদেরও সার প্রয়োজন।
আউশ মৌসুম থেকে ধান-চাল মেলে খুবই কম। তাই কোনো কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চালের বাজারে এর প্রভাব কমই। বিগত বোরো মৌসুমে প্রত্যাশিত উৎপাদন হওয়ায় এবং সঙ্গে আমদানি অব্যাহত থাকায় চালের বাজার এখন স্থিতিশীল। চালের দাম কিছুটা কমতির দিকে বলেও দাবি করা হচ্ছে। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে চালের দাম কিছুটা কমলে সেটা অবশ্য সুসংবাদ। গত দুই মাসে মূল্যস্ফীতি কমার খবর দিয়েছে বিবিএস। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে দাবি– চালের দাম কমে আসাটা এতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালের বাজার স্থিতিশীল থাকাও বড় খবর।
নিম্ন আয়ের মানুষ চাল, আটা ইত্যাদি কিনতেই আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করে ফেলে। আর শুধু চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেই ঘটে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি। সরকার সেটা হতে দিতে স্বভাবতই রাজি নয়। সরকারি গুদামে তাই চালের মজুত বাড়ানোর প্রবণতা লক্ষণীয়। হালে এটাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে বলেই দাবি। খাদ্যশস্য মজুতের অবকাঠামো সম্প্রসারণের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ বলছে, বাংলাদেশে চালের উৎপাদন সাড়ে সাত লাখ টন কমে যেতে পারে। আউশ, আমন, বোরো– তিন মৌসুমেই চলতি অর্থবছরে উৎপাদন কমবে বলে তাদের প্রক্ষেপণ কেউ হালকাভাবে নেবে না। ইতোমধ্যে আউশের উৎপাদন হ্রাসের খবর রয়েছে। এর আবাদ ও একরপ্রতি উৎপাদনও কমেছে বলে খবর দুশ্চিন্তার। সরকার বছরের পর বছর প্রণোদনা জুগিয়েও আউশের আবাদ বাড়াতে পারছে না কেন– সেটা গুরুতর প্রশ্ন। বৃষ্টিনির্ভর এ ফসলে উৎপাদন খরচ অনেক কম। দ্রুত ফসল তোলার অবকাশও রয়েছে। তারপরও আউশের আবাদ না বাড়ার বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আমনে কৃষকের আগ্রহ অবশ্য অটুট। আবহাওয়া প্রতিকূল না হলে এর ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ নেই। ইউরিয়াসহ যেসব সারের সরবরাহ এ সময়ে জরুরি, সেটা নিশ্চিত করা গেলেই ইউএসডিএর প্রক্ষেপণ হয়তো বদলে দেওয়া যাবে। শীতের আগ দিয়ে রবিশস্য ও সবজির চাষ বাড়বে। সেসব ক্ষেত্রেও সার একান্ত প্রয়োজন।
চালের উৎপাদন কমার ধারা অব্যাহত থাকলে এর আমদানি বাড়াতে হবে, এটা জানা কথা। এ মুহূর্তে অপরিহার্য জ্বালানি আমদানি বাবদ ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। চাল বাদে অন্য অনেক খাদ্যপণ্যও আমাদের নিয়মিত আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে গমের সিংহভাগই করতে হয় আমদানি। এ অবস্থায় চালের আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে। তার চেয়ে বড় কথা, চালের আন্তর্জাতিক বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও সামনে এর দাম বাড়ার প্রক্ষেপণ রয়েছে।

চালসহ খাদ্যশস্য উৎপাদন পরিস্থিতি অনুকূলে নেই বলেই খবর। একে তো আবহাওয়া গোলমেলে; সঙ্গে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সারের দাম বাড়ছে এবং এর সরবরাহ জটিলতায় নিক্ষিপ্ত। হরমুজের পর বাব-আল মান্দেব দিয়ে কেবল জ্বালানি নয়; সার সরবরাহও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাতে বাংলাদেশসহ ধান-চাল উৎপাদনকারী এশিয়ার দেশগুলো সংকটে। বিশ্ববাজারে সারের দাম বছর শেষে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। তাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে চালের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে কত মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়বে, সেই উদ্বেগজনক চিত্রও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। আমরা নিশ্চয় এ পরিস্থিতি এড়াতে চাইব। বোরো মৌসুমের আলাপ তো পরে; আমনেও আমরা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইব। প্রকৃতির ওপর কারও হাত নেই। তবে বৃষ্টিনির্ভর বলে আমনে কেবল সার সংকট এড়ানো গেলেই চাল নিয়ে উদ্বেগ অনেকখানি কাটবে।
বিএনপি সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করেছে। প্রণোদনার অর্থসহ সব ধরনের সহায়তা সহজে পৌঁছে দিতে ‘কৃষক কার্ড’ও চালু করা হচ্ছে সহসাই। এর সঙ্গে সার বিতরণ ঘিরে আসতে থাকা খবরগুলো নিতান্ত বেমানান। সরকার যেমন নজিরবিহীন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় মনোযোগী; তেমনি সার সংকট সামলাতেও তাদের যত্নশীল হতে হবে। অতিরিক্ত দামে কেনা সার মাদকের বিনিময়ে পাচার হচ্ছে বলে খবরও বেদনাদায়ক। এসব প্রবণতা নতুন নয়; তবে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ কঠোরতায় এগুলো রোধ করতে হবে।
চালে আমরা যাতে ফের উদ্বৃত্ত হতে পারি; যেন সতর্কতার চাপেও আমদানি করতে না হয়, সেটা নিশ্চিত করাই এখন জরুরি। চলমান আমন ও পরবর্তী বোরো মৌসুমকে এ লক্ষ্যে কাজে লাগাতে হবে। খাদ্যশস্য সংগ্রহের সময় কৃষককে ভালো দাম দিতে দ্বিধা রাখারও সুযোগ নেই। সময়মতো সব ধরনের উপকরণ সহায়তা জোগানোয় কারও ব্যর্থতা যেন বরদাশত করা না হয়।
ভারতসহ প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হলে আমরা চাইলেও হয়তো সহজে আমদানি করতে পারব না। দূরবর্তী দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে আবার খরচ বাড়ে। এক জ্বালানি আমদানি নিয়ে যে জটিলতায় আমরা পড়েছি, সেটা সামাল দেওয়াই কঠিন। এর মধ্যে প্রধান খাদ্যশস্য আমদানির জটিলতা এড়ানো হয়ে উঠেছে কর্তব্য। চালও ‘কৌশলগত পণ্য’ বটে। এর উৎপাদন, সরবরাহ ও দাম স্বস্তিকর জায়গায় রাখা না গেলে সেটা থেকে রাজনৈতিক সংকট জন্ম নেওয়াটাও বিচিত্র নয়।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
- চাল
- বাজার