ভিডিও ভাইরাল
১১৫০ টাকার কাজের জন্য ৭০ হাজার টাকা দাবি তহশিলদারের
সংগৃহীত ছবি
পটুয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:০০
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আবদুস সোবাহানের বিরুদ্ধে নামজারির জন্য ১ হাজার ১৫০ টাকার সরকারি ফির পর সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে অতিরিক্ত ৭০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পৃথক চারটি জমির দলিলের বিপরীতে নামজারি বা নতুন করে একটি খতিয়ান খুলে দিতে এক সেবাগ্রহীতার কাছে ৭০ হাজার টাকা দাবি করছেন তহশিলদার সোবাহান। এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ওই সেবাগ্রহীতা জানতে চেয়ে বলেন, ‘১ হাজার ১৫০ টাকার কাজে ৭০ হাজার টাকা লাগবে কেন? এত টাকা দিতে হলে তো জমি বিক্রি করতে হবে।’ জবাবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা সোবাহান খরচের হিসাব তুলে ধরে বলেন, ‘সার্ভেয়ার-কানুনগোসহ মোট আটটি টেবিলে টাকা দিতে হবে।’ পরে দুটি দলিলের বিপরীতে একটি খতিয়ান খুলে দিতে ২০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। এরপর ওই সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা নেন তিনি। বাকি ১০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠানোর কথা বললে তাতে আপত্তি জানিয়ে হাতে হাতে নেওয়ার কথা বলেন অভিযুক্ত তহশিলদার।
ভুক্তভোগী রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজের বাসিন্দা মহিউদ্দিন খন্দকার বলেন, ‘পৃথক চারটি দলিলের জমি একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করাতে স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যাই এবং তহশিলদার আবদুস সোবাহানের সঙ্গে কথা বলি। এ সময় তিনি নির্ধারিত ১ হাজার ১৫০ টাকা ফির পরিবর্তে আমার কাছে ৭০ হাজার টাকা চান। এ নিয়ে দর-কষাকষি করে অভিযুক্ত তহশিলদারের সঙ্গে ২০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী তাকে নগদ ১০ হাজার টাকা অগ্রিম এবং বাকি ১০ হাজার টাকা কাজের পর দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কয়েক মাস ঘুরিয়ে চুক্তি ভঙ্গ করে চারটি দলিলের মধ্যে দুটি বাদ দিয়ে বাকি দুটির বিপরীতে একটি খতিয়ান করে দেন। এখানেই শেষ নয়, সরকারি ফির ১ হাজার ১৫০ টাকাও আমাকে পরিশোধ করতে চাপ দেন।’
মহিউদ্দিন খন্দকার আরও বলেন, ‘তার আচরণ সন্দেহজনক লাগলে টাকা দেওয়ার বিষয়টি আমি গোপনে মুঠোফোনে ভিডিও করে রেখেছিলাম। আমাকে হয়রানি করায় ক্ষুব্ধ হয়ে পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করি।’
নামজারির জন্য ৭০ হাজার টাকা দাবির অভিযোগের পর এবার তার বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার পুরনো আরেকটি অভিযোগ সামনে এসেছে। রাঙ্গাবালী উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের গাব্বুনিয়া গ্রামের ২৬ একর জমির বিএস রেকর্ড সংশোধন করে দেওয়ার কথা বলে ওই তহশিলদার প্রায় ২০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন আতিকুর রহমান খান ও তার চাচা মো. জাকির হোসেন খান।
আতিকুর রহমান খান বলেন, ‘পটুয়াখালী সদর উপজেলার মৌকরণ ইউনিয়নে দায়িত্ব পালনকালে আবদুস সোবাহান আমাদের ২৬ একর জমির বিএস রেকর্ড সংশোধন করে দেওয়ার কথা বলেন। এ জন্য প্রথমে ২৬ লাখ টাকা দাবি করলেও পরে ২০ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়।’
আতিকুরের চাচা মো. জাকির হোসেন খান বলেন, ‘তহশিলদার সোবাহান আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয় হওয়ায় তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। পরে ধাপে ধাপে সাত লাখ টাকা নগদ দেওয়া হয়। এরপর সোবাহানের নিজ নামে থাকা ব্যাংক হিসাবে আরও সাড়ে ১২ লাখ টাকা জমা দিই। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর সোবাহান যে কাগজপত্র তৈরি করে দিয়েছিল, পরে সেগুলো জাল বলে প্রমাণিত হয়।’
ঘুষ গ্রহণের দুটি অভিযোগই অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আবদুস সোবাহান। মহিউদ্দিন খন্দকারের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ অভিযোগকারী মহিউদ্দিন খন্দকার আমার কাছে আসেননি এবং জমিসংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রও জমা দেননি।’ অন্যদিকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওই অর্থ কোনো কাজের বিনিময়ে নেওয়া হয়নি। এটি আমার শ্বশুরবাড়ির দলিলসংক্রান্ত পারিবারিক লেনদেন।’
এ ব্যাপারে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা নাজমুল হাসান জানান, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযুক্ত তহশিলদারের বিষয়টি দেখে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং জেলা প্রশাসক মহোদয় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন। কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা গেছে, জমির নামজারি হলো বৈধ উপায়ে জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি রেকর্ড বা খতিয়ানে আগের মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত বা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। এটিকে মিউটেশনও বলা হয়। এর জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ১ হাজার ১৫০ টাকা।