সমকালীন প্রসঙ্গ
সম্ভাষণ বদলালেই তোষামোদের সংস্কৃতি বদলাবে?
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
সংবাদপত্রে কর্মসূত্রে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কারও পদবির পূর্বে মহামান্য ও মাননীয় লেখা বাদ দেওয়ার বিষয়টি আত্মস্থ করেছি। লেখা সম্পাদনা করতে গিয়েও এসব বিশেষণ ছেঁটে ফেলা প্রায় রুটিনওয়ার্ক। কেউ কেউ যেভাবে মহামান্য ও মাননীয় লিখতে গিয়ে ফেনা তোলেন, তাতে লেখার উদ্দেশ্য নিয়েও সন্দেহ হয়। লেখার ক্ষেত্রেই যেখানে এই অবস্থা; বলার ক্ষেত্রে কী হবে, সহজেই অনুমেয়।
সম্প্রতি দাপ্তরিক কাজে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের নামের শুরুতে মহামান্য ও মাননীয় না লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, তাদের পদবির পূর্বে মহামান্য ও মাননীয় কিংবা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ইতোমধ্যে তাঁর বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। তারপরও সফলতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় না?
কারণ আমাদের স্বভাব। ‘মহামান্য’ কিংবা ‘মাননীয়’ শব্দগুলো আমরা ক্ষমতার চেয়ারে থাকা যে কারও ক্ষেত্রেই ব্যবহার করে থাকি। সরকারি পরিপত্রে তার কয়েকটি উল্লেখ করা আছে। এর বাইরেও অনেক পদের সঙ্গে এসবের ব্যবহার করা হয়। মাননীয় উপাচার্য, মাননীয় সচিব, মাননীয় ডিসি ইত্যাদি হিসাব করা কঠিন। একটি পত্রিকা ইতোমধ্যে প্রমাণ দিয়ে বলেছে, অমুক কর্তৃপক্ষ নিয়ম মানছে না। একজন মন্ত্রীর শুভাগমন উপলক্ষে সাঁটানো পোস্টারে লেখা হয়েছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ‘মাননীয়’ মন্ত্রী, …মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রীর দাপ্তরিক সফরেই এই অবস্থা; রাজনৈতিক সফরের কথা বলাই বাহুল্য। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, ব্যানার, পোস্টার, চিঠিপত্র এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপমন্ত্রী তো বটেই, এলাকার ছোট-বড় বা স্থানীয় স্তরের নেতাদের ক্ষেত্রেও অকাতরে ‘মাননীয়’ বসিয়ে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত সম্মানসূচক বিশেষণ যেন মজ্জায় ঢুকে গেছে। এতে ব্যক্তি বা ক্ষমতাকে তুষ্ট করে আত্মস্বার্থ হাসিলের মানসিকতাই প্রবল।
বিপরীত দিকও অবশ্য অস্বীকার করা যাবে না। পদ-পদবি পাওয়া অনেকে নিজের গুণকীর্তন উপভোগ করেন। সবসময় চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকতে পছন্দ করেন। যারা তেল মারতে পারে, তাদের দাবি-দাওয়া পূরণে তিনি সচেষ্ট থাকেন। অনেক সময় অতিরিক্ত ‘প্রত্যাশিত’ সম্মান না পেলে কেউ কেউ রেগে যান; ক্ষমতা অনুযায়ী ‘ব্যবস্থা’ নেন। এ রকম নাচুনে বুড়ি স্বভাব পেলে চাটুকাররাও ঢোলের বাড়ি দিতে ভোলেন না। এই উভয় শ্রেণির স্বভাবের কারণেই নানামুখী সংকট তৈরি হয়। অনেক অযোগ্য তদবিরে সফল হয়। নিরীহ মানুষ বিপদে পড়েন।
সরকারি নির্দেশনা লেখার ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে; বলার ক্ষেত্রে নয়। অর্থাৎ ওই সব পদবিধারীর সামনে কিংবা পেছনে কোনো অনুষ্ঠানে তাঁকে মাননীয় কিংবা মহামান্য বলার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। অথচ বলার ক্ষেত্রেই লাগাম টানা জরুরি। কারণ সাধারণত ব্যক্তিকে সামনে পেয়েই গুণকীর্তন করা হয়। সব তেল ঢেলে দেওয়া হয়। এতে পদধারীও হয়তো গদগদ হতে পারেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সরকারি কর্মকর্তারা যেভাবে স্যার বলেন, সেটাও অনেক সময় দৃষ্টিকটু। এক ভাইরাল ভিডিওতে আমরা দেখেছি, কীভাবে একজন কর্মকর্তা ২ মিনিটের বক্তব্যে ৫০ এর বেশি বার স্যার সম্বোধন করেছেন।
অতিরিক্ত সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার আমাদের প্রশাসনিক ও সামাজিক অভ্যাসেরই প্রতিফলন। পদকে সম্মান দেখাতে গিয়ে অনেক সময় ব্যক্তিকে অতিরিক্ত মর্যাদার আসনে বসানো হয়। সরকারি পরিপত্রের একটা উদ্দশ্যে হয়তো এই– গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো পদই ব্যক্তিকে জনগণের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রী যিনিই হোন না কেন; প্রত্যেকেই সংবিধান ও আইনের অধীন এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। পদমর্যাদার প্রতি সম্মান নিশ্চয়ই দেখাতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিকে তোষামোদ করার সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মহামান্য ও মাননীয় ব্যবহারের পরিপত্রে লেখার পাশাপাশি বলার বিষয়ে কিছু নির্দেশনা থাকলে সরকারের সদিচ্ছা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যেত। তারপরও সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। এখন লেখার ক্ষেত্রে তথা সরকারি দাপ্তরিক চিঠিপত্র, বিজ্ঞপ্তি, আমন্ত্রণপত্র কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভাষায় অতিরিক্ত সম্মানসূচক শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মৌখিক ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে। সে জন্য সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক পরিসরেও বিষয়টির বাস্তবায়ন দরকার।
এখানেও পদবিধারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইতোপূর্বে আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রীকে সাংবাদিকরা কীভাবে তোষামুদে প্রশ্ন করতেন। অথচ সাংবাদিকতাই আমাদের শিখিয়েছে– রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা যে মন্ত্রীই হোন; লেখার আগে মাননীয় উল্লেখ করা যাবে না। এরই মধ্যে যখন আমরা সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিলের খবর দেখি, তখন সরকারের দ্বিমুখী নীতিই স্পষ্ট হয়।
সে জন্যই সরকারের মহামান্য ও মাননীয় লেখার নির্দেশনাটি ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সব মন্ত্রী যদি চান, তবেই এটি বাস্তবায়ন হতে পারে। পরিপত্রের বাস্তবায়ন ছড়িয়ে যাক লেখা থেকে বলায়; মন্ত্রণালয় থেকে সমাজে।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক