আন্তর্জাতিক
মুসলমানদের 'শত্রু' ভাবছেন, অথচ আমেরিকার জন্য তারাই লড়ছে
নাইন ইলেভেনে নিউইয়র্কে সংঘটিত হামলার ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠান শেষে জোহরান মামদানি, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নাসরিন মালিক
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:২৭
৯/১১-এর ২৫ বছর পর দুটি প্রতিবেদন সমসাময়িক নিউইয়র্কের দুটি ভিন্ন সামাজিক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন দুটি আমাদের এই শহর এবং মূলত দুটি যুগের মাঝে আটকে থাকা এক বিশ্ব সম্পর্কে অনেক কিছু জানিয়ে দেয়। একটি প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক ম্যাগাজিন নজর দিয়েছে ‘হাবিবি সিটির’ ওপর। সেখানে এমন এক নিউইয়র্কের কথা বলা হয়েছে, যেখানে ‘একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটছে, যার নেতৃত্বে রয়েছে ধীরে ধীরে নিজেদের ভিত্তি শক্ত করা নিউইয়র্কারদের এক নতুন প্রজন্ম’। এই নতুন প্রজন্মটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘এসডব্লিউএএনএ’ বা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা অঞ্চল থেকে উঠে আসা হিসেবে– যেটি ‘ফিলিস্তিন থেকে ইরান হয়ে সুদান পর্যন্ত দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে’।
অন্যদিকে ভ্যানিটি ফেয়ার জোহরান মামদানি ৯/১১-এর স্মারক অনুষ্ঠানে না যাওয়ার নেপথ্যে কিছু ‘অস্পষ্ট ও আবেগীয়’ তাড়না কাজ করেছে বলে উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনটি “শহরের প্রথম মুসলিম মেয়রকে ১৯ জন মুসলিম বিমান ছিনতাইকারীর স্থলাভিষিক্ত মনে করে, যারা চারটি বিমানকে ভয়াবহ অস্ত্রে পরিণত করেছিল– এবং তাকে মনে করে ‘তাদের’ অংশ, যারা ‘আমাদের’ ওপর হামলা চালিয়েছিল।”
এই দুটি ঘটনা একসঙ্গে তুলে ধরে এক প্রজন্মে কী কী বদলে গেছে, আর কোন জায়গাগুলো এখনও জেদের সঙ্গে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। মুসলিম পটভূমি থেকে আসা ডায়াসপোরা বা প্রবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যরা সত্যিই অগ্রসর হচ্ছেন এবং নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের ভাষায় ‘প্রভাব’ তৈরি করছেন। তারা এখন আর কেবল মুদি দোকান বা হালাল খাবারের গাড়িতেই সীমাবদ্ধ নন, বরং ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’, অভিজাত রেস্তোরাঁ, বিনোদন জগৎ এবং রাজনীতিতেও জায়গা করে নিচ্ছেন। মামদানি এই পুরো দলের প্রতিনিধি এবং একই সঙ্গে একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে তাদের স্বীকৃতির নিয়ামক। তারা যেমন তাদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য গভীরভাবে ভাবেন, তেমনি তাদের নজর গাজা ও তার বাইরের মানুষের প্রতিও।
আমি ‘মুসলিম’-এর বদলে ‘মুসলিম পটভূমির’ কথাটি ব্যবহার করছি, কারণ এই প্রবাসী পরিচয়টি খুবই বৈচিত্র্যময়। এটি একটি ধর্মের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও তা চর্চাকারী মুসলিম থেকে শুরু করে, যাদের কাছে ইসলাম কেবল একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক– সবাইকেই অন্তর্ভুক্ত করে। কোনো আপস না করে মূলধারার আমেরিকান সমাজে তাদের একীভূত হওয়ার মধ্যেই এই ঐতিহ্যের সর্বজনীনতা প্রকাশ পায়। মামদানি এবং মিশিগানের ডেমোক্রেটিক সিনেট মনোনীত প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদ আমেরিকার অন্ধ জাতীয়তাবাদের চর্চা থেকে নিজেদের দূরে রেখেছেন। তারা ইসরায়েলে মার্কিন সমর্থন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর বিধ্বংসী ফলের দিকে আঙুল তোলার সাহস দেখাচ্ছেন।
অভিবাসী পটভূমি থেকে আসা আমেরিকানদের এই নতুন প্রজন্মের ফলে এমনটা হয়েছে, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে একটি কম সংকীর্ণমনা ও আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে অনিবার্য কিছু একটা আছে। যেসব দেশ ও পটভূমির বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও আদর্শগত যুদ্ধ চালিয়েছে, সেখান থেকে অভিবাসন শেষ পর্যন্ত দমবন্ধ করা আত্তীকরণের জন্ম দেয় না, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক বিশ্বজনীনতার জন্ম দেয়– যা আমেরিকান ব্যতিক্রমবাদের জন্য ক্রিপ্টোনাইটের মতো।
ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষের ছায়ায় বড় হওয়া এমন আরেকটি অভিজ্ঞতা, যা খেয়ালবশত অনেককেই জাতি বা জাতীয় পরিচয়ের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয়ে নিজেদের চিহ্নিত করতে বাধ্য করেছে। এক বিখ্যাত স্ট্যান্ডআপ কমেডি পর্বে আমেরিকান কমেডিয়ান রামি ইউসেফ বলেছিলেন, ‘একদিক থেকে ৯/১১ আমাকে আরও বেশি মুসলিম বানিয়েছে। কারণ আমাকে বলা হয়েছিল যে এটা আমারই দোষ।’ এটি অনেকের জন্যই একটি গভীরভাবে পরিচিত গল্প, যার মধ্যে আমি নিজেও আছি। আমাদের মধ্যে যাদের কাছে ধর্মীয় পরিচয়টি ছিল খুব সাধারণ এক বিষয়, ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর বছরগুলোতে তা একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ নেয়।
একদিকে যখন এই নতুন প্রজন্ম তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি খুঁজে পাচ্ছিল, অন্যদিকে ২০০১ সালে শুরু হওয়া ইসলামবিদ্বেষ আমেরিকান সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আরও গভীরে গেঁথে যাচ্ছিল। পিউ রিসার্চের গবেষণায় দেখা গেছে, ৯/১১-এর এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী পরও ঘটনার ঠিক পরের সময়ের তুলনায় ‘আরও নেতিবাচক এবং আরও রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত’ হয়ে পড়েছে। ২০০২ সালের মার্চ মাসে, মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কদের ২৫ শতাংশ বিশ্বাস করতেন যে ইসলাম ‘অন্যান্য ধর্মের তুলনায় সহিংসতাকে বেশি উৎসাহিত করে।’ আজ সেই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৫১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ কারণেই ৯/১১-এর সময় মাত্র ৯ বছর বয়স হওয়া সত্ত্বেও মামদানিকে ছিনতাইকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানো হতে পারে, আর এল-সায়েদকে সিনেটর টমি টিউবারভিল ‘সন্ত্রাসী’ বলতে পারেন। কংগ্রেসওম্যান ন্যান্সি মেস বলেছিলেন, ‘আমেরিকায় সরকারি পদে থাকা প্রতিটি মুসলিমই জাতীয় নিরাপত্তা এবং আমাদের প্রজাতন্ত্রের জন্য হুমকি।’ অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘সব জায়গায় জিহাদিরা নির্বাচিত হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার ইতিহাস নিয়ে লেখা সিজনস অব ফিউরি বইয়ের লেখক রোজিনা আলী আমাকে বলেন, সমসাময়িক ইসলামোফোবিয়াকে দেশ-বিদেশের মার্কিন রাজনীতির সামগ্রিক ব্যর্থতা থেকে আলাদা করা যাবে না। বিদেশে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এক জটিল চোরাবালিতে পরিণত হয়েছিল, আর দেশে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে লাখ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও সঞ্চয় হারিয়েছে। ডানপন্থিরা ইসলামবিদ্বেষকে ব্যবহার করার অন্যতম কারণ হলো ‘এসব ব্যর্থতাকে সহজেই বিদেশি বা ইসলামের মতো কোনো বিদেশি সংস্কৃতির তথাকথিত আগ্রাসনের ওপর চাপিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।’ তিনি বলেন, ডানপন্থিদের কাছে আসলে ‘এমন কোনো কার্যকর পরিকল্পনা বা রূপরেখা নেই, যা দেশের এতসব সমস্যার সত্যি সমাধান করতে পারে।’
কিন্তু এই কৌশলের জন্য বড় সমস্যা হলো মুসলিমরা এখন আর মুখ বুজে মেনে নেওয়ার পাত্র নয়, বরং তারা এক বিস্তৃত প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করছে। রাজনৈতিক প্রার্থী থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা ভোটারদের এক বিশাল গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করছেন। কারণ তাদের জীবনদর্শন গড়ে উঠেছে চরম প্রান্তিকতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তারা তাদের রাজনীতিকে যেমন মানুষের জীবনযাত্রার মানের মতো বাস্তব সমস্যার ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করাচ্ছেন, তেমনি অজনপ্রিয় পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন। পাশাপাশি মুসলিমদের ওপর নেমে আসা রাজনৈতিক আক্রমণের আঘাতকে তারা আমেরিকান ইতিহাসেরই অংশ হিসেবে তুলে ধরে মানবিক রূপ দিচ্ছেন। তারা এক বিশাল জোট তৈরি করতে পারছেন। কারণ সাধারণ মানুষের মতো তারাও রাজনৈতিক পরাশক্তির কাছে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন।
ডানপন্থিদের এত বিষোদ্গার সত্ত্বেও এই সাঁড়াশি মুসলিমবিরোধী প্রচারণাও কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের মেলবন্ধন আটকে রাখতে পারেনি। গত সপ্তাহের ৯/১১-এর স্মারক অনুষ্ঠানে মামদানি অত্যন্ত সংযত ও মার্জিতভাবে রুডি জিউলিয়ানির সঙ্গে করমর্দন করেন– যিনি ৯/১১-এর সময় নিউইয়র্কের মেয়র ছিলেন এবং যিনি মামদানিকে এই অনুষ্ঠানে না আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের একজনের অবস্থান ছিল অতীতে, আর অন্যজন দাঁড়িয়ে ছিলেন ভবিষ্যতে।
নাসরিন মালিক: গার্ডিয়ানের কলাম লেখক; দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- মুসলিম