ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘কন্টিনিউয়াস লার্নিং’: প্রয়োজন কার্যকর স্বীকৃতি কাঠামো

‘কন্টিনিউয়াস লার্নিং’: প্রয়োজন কার্যকর স্বীকৃতি কাঠামো
×

কাজী হাসান রবিন

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৩৭

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পর অনেকেই মনে করেন যে তাদের শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে বাস্তবতার রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ একজন পেশাজীবীর মূল সম্পদ কেবল তাঁর অর্জিত ডিগ্রি নয়; বরং নতুন জ্ঞান অর্জনের সক্ষমতা, পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা এবং দক্ষতাকে নিয়মিত হালনাগাদ করার মানসিক অভ্যাস। প্রযুক্তি যত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রের চাহিদাও তত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে একবার অর্জিত দক্ষতার ওপর ভর করে সমগ্র কর্মজীবন পার করা অসম্ভব। যে ব্যক্তি নতুন কিছু শেখা বন্ধ করে দেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পেশাগত প্রাসঙ্গিকতা ও দক্ষতা বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।

বৈশ্বিক বাস্তবতা ও কন্টিনিউয়াস লার্নিং
এই বাস্তবতাই আজ ‘কন্টিনিউয়াস লার্নিং’ বা নিরন্তর শিক্ষাকে বৈশ্বিক পেশাগত কাঠামোর অন্যতম মূল ভিত্তিতে পরিণত করেছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সার্ভিসনাউ এবং পিয়ারসন-এর যৌথ ২০২৫ ওয়ার্কফোর্স স্কিল ফোরকাস্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে অধিকাংশ দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজন হবে, যা কেবল এআই-ভিত্তিক অটোমেশন দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। কেবল যুক্তরাষ্ট্রে এই সময়ে প্রায় ৩০ লাখ ৬০ হাজার নতুন কর্মীর প্রয়োজন হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ লাখেরও বেশি কর্মীর কাজের ধরন এজেন্টিক এআই-এর প্রভাবে পরিবর্তিত হবে। তাই রি-স্কিলিং এবং আপ-স্কিলিং এখন আর ঐচ্ছিক নয়,  বরং কর্মবাজারে টিকে থাকার প্রধান শর্ত।
গবেষণাও এই বাস্তবতাকে সমর্থন করে। ফিনল্যান্ডের ফিনিশ ইনস্টিটিউট অব অকুপেশনাল হেলথের গবেষক রহমান শিরি ও তাঁর সহকর্মীদের ২০২৩ সালের এক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মন্দা বা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্যেও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে সরাসরি সহায়তা করে। 

শিক্ষণ স্তর ও তিনটি মূলধারা
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ডেলয়েট-এর গবেষণা অনুসারে, একজন পেশাজীবীর ধারাবাহিক শিক্ষণকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়: তাৎক্ষণিক শিখন, অন্তর্বর্তী শিখন ও রূপান্তরকালীন শিখন। ভবিষ্যতে বড় দায়িত্ব নেওয়া বা সম্পূর্ণ নতুন কোনো পেশায় রূপান্তরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা।
এই নিরন্তর শিক্ষা আবার তিনটি সম্পূরক ধারার সমন্বয়ে অর্জিত হয়: ফরমাল লার্নিং– যা বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট, সার্টিফায়েড প্রোগ্রাম বা আনুষ্ঠানিক কর্মশালার মাধ্যমে অর্জন করা হয়। সোশ্যাল লার্নিং– যা সহকর্মীদের পর্যবেক্ষণ, মেন্টরশিপ ও পেশাগত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময় এবং সেলফ-ডিরেক্টেড লার্নিং– যা সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে বই, জার্নাল, গবেষণাপত্র বা অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
কন্টিনিউয়াস লার্নিং যদি হয় আজীবন শেখার একটি সামগ্রিক দর্শন, তাহলে কন্টিনিউয়াস প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট (সিপিডি) হলো তার সুনির্দিষ্ট পেশাগত ও কাঠামোগত রূপ। বিশ্বজুড়ে পেশাগত লাইসেন্স নবায়ন ও সেবার মান বজায় রাখতে সিপিডি এখন আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা, আইন ও প্রকৌশল পেশায় রাজ্যভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ সিপিডি সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। চিকিৎসকদের জন্য ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল ফর কন্টিনিউয়িং মেডিকেল এডুকেশন’ অনুমোদিত কোর্স সম্পন্ন করা লাইসেন্স ধরে রাখার পূর্বশর্ত। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ‘লিসবন রিকগনিশন কনভেনশন’ এবং ‘সিপিডি স্ট্যান্ডার্ডস অফিস’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান যাচাই ও স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে চুক্তি থাকায় এক দেশের সিএমই ক্রেডিট অন্য দেশেও সরাসরি স্বীকৃতি পায়।
একইভাবে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে চিকিৎসকদের সংস্থা ‘অস্ট্রেলিয়ান হেলথ প্র্যাকটিশনার রেগুলেশন এজেন্সি’সহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো পেশাজীবীদের শেখার রেকর্ড জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত, বিশেষ করে দুবাইয়ের দুবাই হেলথ অথরিটি এবং সৌদি আরবেও চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর জন্য নির্ধারিত সিপিডি ক্রেডিট অর্জন এখন আইনগত কাঠামোর অংশ। এ ছাড়া ইউনেস্কো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি-৪ অর্জনে ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব লার্নিং সিটিজ’ উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন শহরে আজীবন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সমস্যা
উন্নত বিশ্ব যখন নিরন্তর শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে, তখন বাংলাদেশে এখনও সনাতন ধারণাই বজায় রয়েছে। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভকেই শিক্ষার শেষ মনে করা হয়। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আপস্কিলিং বা রি-স্কিলিংয়ের জন্য সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা নেই। সরকারি চাকরিতে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ থাকলেও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোর মতো কাঠামোগত ব্যবস্থার ঘাটতি দেখা যায়। আইন, চিকিৎসা বা প্রকৌশলের মতো পেশাতেও উন্নত বিশ্বের মতো লাইসেন্স নবায়নের জন্য সিপিডি সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। উপরন্তু, ইউনেস্কোর লার্নিং সিটি নেটওয়ার্কে বিশ্বের শত শত শহর যুক্ত হলেও বাংলাদেশের একটি শহরও এতে স্থান পায়নি, যা আজীবন শিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের স্থবিরতার পরিচয় দেয়।

উত্তরণের উপায় ও রূপরেখা
বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে জ্ঞানভিত্তিক ও স্মার্ট রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে হলে কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি: প্রথমত, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে কন্টিনিউয়াস লার্নিং-কে আইনগত কাঠামোর অংশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়ালভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ করতে হবে। তৃতীয়ত, শিল্প খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব লার্নিং সিটিজ’-এ বাংলাদেশের শহরগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে এবং পঞ্চমত হলো, শেখার একটি জাতীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একজন পেশাজীবীর নিরন্তর শিক্ষাকে কেবল অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নয়, বরং একটি পরিমাপযোগ্য কাঠামোর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। এই মূল্যায়ন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে কন্টিনিউয়াস লার্নিং পয়েন্ট (সিএলপি) এবং কন্টিনিউয়াস এডুকেশন ইউনিট (সিইইউ)।
সিএলপি এবং সিইইউর বিষয়টি একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একজন চিকিৎসক যদি বছরে তিনটি অনুমোদিত প্রশিক্ষণ এবং দুটি আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে অংশ নেন, তবে তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যক সিএলপি অর্জন করবেন। পরে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী সেই সিএলপিগুলো সিইইউ-তে রূপান্তরিত হবে। লাইসেন্স নবায়নের সময় এই অর্জিত সিএলপি এবং তাঁর সিইইউ সমতুল্য মান বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মূল্যায়ন করবে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতাকে সমসাময়িক প্রযুক্তি, নীতি এবং পেশাগত মানদণ্ডের সঙ্গে কতটা হালনাগাদ রেখেছেন। অর্থাৎ এটি কেবল প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের হিসাব নয়; বরং একজন পেশাজীবীর ধারাবাহিক শেখা, আত্মোন্নয়ন এবং পেশাগত সক্ষমতার একটি পরিমাপযোগ্য সূচক হিসেবে কাজ করবে।
বাংলাদেশের জন্য এখনই সময় আজীবন শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার। যে দেশ তার নাগরিকদের নিরন্তর শেখার সুযোগ সৃষ্টি করবে, দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করবে এবং সেই শিক্ষার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও সেই দেশেরই থাকবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকর ‘ন্যাশনাল কন্টিনিউয়াস লার্নিং ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্ক’ গড়ে তোলার আলোচনা শুরু করা এখন সময়ের দাবি। 

কাজী হাসান রবিন: সহযোগী অধ্যাপক, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×