রাইট টার্ন
আসিফের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের রাজনৈতিক ফলাফল
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর ‘দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘মানুষ আপনাকে নিয়ে কথা বলার চেয়েও খারাপ একটি মাত্র ব্যাপার আছে, আপনাকে নিয়ে কিছুই না বলা!’
রাজনীতিতে কথাটি সম্ভবত আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। রাজনীতিকদের জন্য মানুষের মনোযোগ অত্যন্ত মূল্যবান। তারা চায় মানুষ তাদের নাম জানুক, চেহারা চিনুক এবং তাদের নিয়ে আলোচনা করুক। নির্বাচনে এর প্রয়োজন আরও বাড়ে। তখন তারা নিজেদের পরিচিতি তৈরির জন্য বিপুল সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে এনসিপি মনোনীত প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে অস্কার ওয়াইল্ডের কথাটি মনে পড়ে গেল।
১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টি আসিফ মাহমুদকে ঢাকা উত্তরের এবং নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কাকতালীয়ভাবে ঠিক এই সময়েই আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ সংবাদমাধ্যমের বড় খবর হয়ে উঠেছে। অর্থ পাচার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, পদায়ন, প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
সমকালের খবর– ‘আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাঁর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার করে বিলাসবহুল সম্পদ কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগ পেয়েছে দুদক’ (১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
অভিযোগগুলোর সত্য-মিথ্যা তদন্তের বিষয়; এই নিবন্ধের দুদকের অনুসন্ধান ঘিরে যে বিপুল জনমনোযোগ আকর্ষিত হচ্ছে, সেটি সদ্য ঘোষিত মেয়র প্রার্থীর রাজনৈতিক যোগাযোগে কী প্রভাব ফেলছে?
‘১১ হাজার কোটি’ টাকার অঙ্ক সহজেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যমসহ জনপরিসরে আসিফকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেই আলোচনায় উত্থাপিত অভিযোগ যেমন থাকছে, তেমনি আসিফের জবাবও জায়গা করে নিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এর রাজনৈতিক ফলাফল কী?
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বিশাল নির্বাচনী এলাকা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান যারা নিবিড়ভাবে অনুসরণ করেছেন, তাদের কাছে আসিফ পরিচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত হওয়া আর ঢাকা উত্তরের সাধারণ ভোটারের কাছে নিজেকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে পরিচিত করে তোলা এক বিষয় নয়। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় বিনামূল্যে সেই পরিচিতি তিনি পাচ্ছেন কিনা?
কেউ আসিফ মাহমুদের সমালোচনা করছেন; কেউ পক্ষে কথা বলছেন। নেট রেজাল্ট, উভয় পক্ষই আসিফ মাহমুদকে নিয়ে কথা বলছে। একদিকে এনসিপি তাঁকে ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে প্রায় প্রতিদিন তাঁর নাম মানুষের সামনে আসার নির্বাচনী তাৎপর্য নিশ্চয়ই আছে।
এখানে দুদকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো কারণ দেখি না। দুদক তার দায়িত্ব অনুযায়ী অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। সংবাদমাধ্যমও ১১ হাজার কোটি টাকার মতো গুরুতর অভিযোগকে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। কিন্তু রাজনীতিতে শুধু উদ্দেশ্য দিয়ে ফল নির্ধারিত হয় না। অনিচ্ছাকৃত ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ।
সুশাসনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রচারে নয়; বরং নিজের কাজ দক্ষতা, যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে করে যাওয়ার মধ্যে। একটি প্রতিষ্ঠান কত বড় অভিযোগ সামনে আনল বা তা নিয়ে কত আলোচনা হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেই অভিযোগের অনুসন্ধান কতটা দক্ষতার সঙ্গে শেষ করতে পারল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা শেষ পর্যন্ত সংবাদে তার উপস্থিতি দিয়ে নয়, কাজের ফল দিয়েই তৈরি হয়। দুদকের ক্ষেত্রেও সেটি হওয়া উচিত। অভিযোগ অনুসন্ধান করা তার দায়িত্ব। সেই কাজ তথ্যনির্ভর, দক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করাই তার প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি। কারণ সুশাসনের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দরকার; আলোচিত প্রতিষ্ঠান নয়।
এখানেই বর্তমান ঘটনাটির রাজনৈতিক পরিহাস স্পষ্ট। দুদক তার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করছে। অথচ সেই প্রক্রিয়া ঘিরে তৈরি হওয়া বিপুল জনমনোযোগের একটি অংশ চলে যাচ্ছে ঢাকা উত্তরের একজন মেয়র প্রার্থীর দিকে। পরিচিতি অবশ্যই ভোটে জেতার কোনো নিশ্চয়তা নয়। বরং অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে এই পরিচিতিই আসিফের বিরুদ্ধে যেতে পারে। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতির প্রথম লড়াই অনেক সময় ভোট চাওয়ার আগেই মানুষের মনোযোগের মধ্যে জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয় দিয়ে শুরু হয়। অস্কার ওয়াইল্ডের কথা অনুযায়ী মানুষ আপনাকে নিয়ে কথা বলছে কিনা, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- মোহাম্মদ গোলাম নবী