ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার: দালের মেহেন্দি

রুহের আওয়াজ পৌঁছে যাক রবের কাছে

রুহের আওয়াজ পৌঁছে যাক রবের কাছে
×

দালের মেহেন্দি- রাজিব পাল

রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৪:৫৮ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:১৮

"ভাংড়া গান সেই সময় গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যখন ভারতে নাচপ্রধান ইংরেজি গানের কদর বেড়ে গিয়েছিল। ভারতীয় সংগীত পরিবর্তনমুখী, এটা জানি বলেই সুফি, গজল, ক্লাসিক্যালের বাইরে গিয়ে ফোকের সঙ্গে পপের ফিউশন ও ভাংড়া গান গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করিনি। কিন্তু কোনো ঘরানার বা শিল্পীকে নকল করে গান তৈরি করিনি। আমার যা কিছু তা নিজস্ব। হয়তো এ কারণেই ১৯৯৫ সালে প্রথম অ্যালবাম 'বলো তারা রা রা' প্রকাশের পর ভারতীয় সংগীতাঙ্গনের চেহারা বদলে যায়। অ্যালবামের বাইরে সিনেমার গানগুলোর প্রতি শ্রোতার আগ্রহ বাড়তে থাকে। অন্যদিকে একের পর এক আমার গান ও অ্যালবাম সুপারহিট হতে থাকে। এরপর আর থেমে থাকার সুযোগ হয়নি। গানে গানে শ্রোতাদের হৃদয় আন্দোলিত করতে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে চষে বেড়াতে হচ্ছে।"

বললেন ভারতের খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী দালের মেহেন্দি। বৃহস্পতিবার ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত 'ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯'-এর আসরে সঙ্গীত পরিবেশন করেন তিনি। উৎসবে অংশ নেওয়ার আগে ঢাকার এক অভিজাত রেস্তোরাঁয় সমকালের সঙ্গে একান্ত আলাপে অংশ নেন দালের মেহেন্দি। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো :  প্রশ্ন :দ্বিতীয়বার বাংলাদেশ সফরে এলেন। কেমন মনে হচ্ছে এবারের ঢাকা সফর?

উত্তর :এবারের সফর নানা কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ এর আগে এসেছিলাম একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে। এবার এসেছি লাখো দর্শক-শ্রোতাকে গান শোনাতে। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্টে প্রথম অংশ নিচ্ছি; যে উৎসব নিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে আলোচনা হয়, সেই উৎসবে গাইব- এটা ভাবতেও ভালো লাগছে।

প্রশ্ন :আপনার কাছে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯-এর দর্শকের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে কি?

উত্তর :শ্রোতা কী চায়? এই প্রশ্ন নিয়ে যতটা না ভাবি, তার চেয়ে বেশি ভাবি আমি শ্রোতাদের কী শোনাচ্ছি- তা নিয়ে। শিল্পী হিসেবে যতটা শ্রোতাদের বিনোদন দিতে চাই, ঠিক ততটাই চাই আমার গানের মাধ্যমে রুহের আওয়াজ পৌঁছে যাক রবের কাছে। সতেরো পুরুষ ধরে মার্দানা বংশের আমরা যারা রাবাবি গান করছি তারা এটাই চেয়েছি সবসময়। যে জন্য আমার গান সৃষ্টি ও পরিবেশনা সবসময় ছিল পরিচ্ছন্ন। কথা ও সুরে অতিরঞ্জিত কোনো কিছু রাখিনি। আজ (বৃহস্পতিবার) সেখান থেকেই নির্বাচিত গান শোনাব। সেসঙ্গে নিজে নাচব এবং শ্রোতাদের নাচাব।

প্রশ্ন :শিল্পী দালের সিং কীভাবে দালের মেহেন্দি হয়ে গেলেন সেই ইতিহাস জানতে চাই।

উত্তর :খ্যাতিমান গজলশিল্পী মেহেদি হাসানের অনুরাগী ছিলাম আমি। তার কাছের মানুষ পারভেজ মেহেদির সংস্পর্শে আসার পর গজল গাওয়া শুরু করি। গজলের প্রতি ভালোবাসা এত প্রবল হয়ে ওঠে যে, মেহেদি হাসান ও পারভেজ মেহেদির মতো নিজের নামের সঙ্গে মেহেদি যুক্ত করে নিই। মেহেদিকে মূলত হিন্দি উচ্চারণে মেহেন্দি বলে। এভাবেই দালের সিং থেকে দালের মেহেন্দি হয়েছি।

প্রশ্ন :শিল্পী জীবনের শুরুতে গজল, কাওয়ালি, সুফি আর ভারতীয় রাগপ্রধান গান করতেন। সেখান থেকে সরে এসে ভাংড়া গান গাওয়া শুরু করলেন কেন?

উত্তর :আমি কিন্তু সুফি, গজল কিংবা ভারতীয় ক্লাসিক্যাল গান গাওয়া ছেড়ে দেইনি। এখনও চর্চা অব্যাহত আছে। ভাংড়া গান গাওয়ার পেছনে অন্য একটি কারণ ছিল। আমি ভাংড়া গান সেসময় গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যখন ভারতে নাচপ্রধান ইংরেজি গানের কদর বেড়ে গিয়েছিল। পরিবর্তনমুখী সেই প্রেক্ষাপটে ফোকের সঙ্গে পপের ফিউশন ও ভাংড়া গান গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করিনি। কিন্তু কোনো ঘরানার বা শিল্পীকে নকল করে গান তৈরি করিনি।

প্রশ্ন :প্রথম অ্যালবাম থেকে কোটি শ্রোতার মনোযোগ কাড়তে পারবেন- এটা কি ভেবেছিলেন?

উত্তর :এটা অনুমান করাও কঠিন ছিল। ১৯৯৫ সালে যখন প্রথম একক অ্যালবাম 'বলো তারা রা রা' প্রকাশ করি তখন চাওয়া ছিল, অন্তত পাঞ্জাবে এক বছরে অ্যালবামের দুই লাখ কপি বিক্রি হোক। কিন্তু অ্যালবাম প্রকাশের দুই মাসের মাথায় দক্ষিণ ভারতেই দুই লাখের বেশি অ্যালবাম বিক্রি হয়ে যায়। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তা কোটি ছাড়িয়ে যায়। এখন তো আড়াই কোটিরও বেশি কপি বিক্রির রেকর্ড গড়েছে অ্যালবামটি। পরের অ্যালবামগুলোও সব সুপারহিট।

প্রশ্ন :অতীতে যা পাননি সেই যশ-খ্যাতি সবই পেয়েছেন ভাংড়া গান শুরু করার পর। এই বিষয়টা কীভাবে দেখেন?

উত্তর :পাঞ্জাবি প্রচলিত ভাংড়ার সঙ্গে আমার গানের যথেষ্ট পার্থক্য আছে। আমি যা গাইছি তা নিজের মতো করে তৈরি করে নিচ্ছি। এমন নয় যে, আমি যা শিখেছি চর্চা করেছি, তার কোনো প্রভাব আমার গানে পড়েনি। পড়েছে। কিন্তু তা বুঝতে হলে আমার গানগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। আমার 'হায়ো রাব্বা', 'ম্যায় দরদি রব রব'- গানগুলোতে স্রষ্টার বন্দনা স্পষ্ট, যা রাবাবি ঘরানার গানগুলোয় শুনতে পাবেন। তবে হ্যাঁ, এটাও ঠিক যে, 'কিং অব ভাংড়া' খেতাব গানের জন্য কোটি মানুষের ভালোবাসা- এ সবকিছুই অর্জিত হয়েছে ভাংড়ার কারণে।

প্রশ্ন :শোনা যায় চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের বিষয়ে আপনি কিছু শর্ত জুড়ে দেন?

উত্তর :পূরণ করা যাবে না এমন কোনো শর্তে প্লেব্যাক করি না। আমার শর্ত থাকে গানের কথা, সুর ভালো লাগতে হবে এবং গায়কীতে থাকতে হবে স্বাধীনতা। এই শর্ত মেনেই এ আর রেহমানের সুরে 'রঙ দে বাসন্তী' গানটি গেয়েছিলাম। যেখানে টিং ডিং ডিং শব্দগুলো নিজে জুড়ে দিয়েছি। একই শর্ত মেনে পরে 'দঙ্গল', 'বাহুবলী'সহ সিনেমার গানগুলোর সংগীত পরিচালকরা আমাকে দিয়ে গাইয়েছেন।

প্রশ্ন :একাধিক ভাষায় গান করছেন। কখনও বাংলা গান গাওয়ার ইচ্ছা হয়নি?

উত্তর :হবে না কেন, আমি যে কোনো সময় বাংলা গান গাওয়ার জন্য প্রস্তুত। শুধু সুযোগের অপেক্ষায় আছি। এমনকি বাংলাদেশি মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতেও আপত্তি নেই।

প্রশ্ন :এ দেশের কোনো শিল্পীর গান ভালো লাগে কি?

উত্তর :রুনা লায়লার ভীষণ ভক্ত আমি। তার গাওয়া 'ও মেরা বাবু চ্যান, ছাবিলা ম্যায় তো নাচুঙ্গি' গানটি শোনার পর থেকেই আমি তার ভক্ত হয়ে গেছি। তবে তার কণ্ঠে বেশি ভালো লাগে 'দামা দাম মাস্ত ক্যালেন্দার' গানটি। এই গান অনেকের কণ্ঠে শুনেছি কিন্তু কারও গায়কী রুনা লায়লার মতো আকর্ষণীয় মনে হয়নি।

প্রশ্ন :ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৯-এর পর আবার এ দেশে আসার ইচ্ছে আছে কি?

উত্তর :ডাক পেলে যে কোনো সময় আমি বাংলাদেশে আসতে প্রস্তুত। যে দেশের মানুষ এত গানপাগল, তাদের ডাকে সাড়া না দিয়ে কি থাকা যায়? যায় না। তাই আসব, দর্শক-শ্রোতাদের গানের তালে তালে নাচাব আর শো শেষে চিকেন বিরিয়ানি, মাছের ঝোল, আলু ভাজা, চিংড়ির দোপেঁয়াজাসহ বাংলাদেশের যত মজাদার খাবার আছে তার স্বাদ নেব।

আরও পড়ুন

×