ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অভিনেতা নয়, নির্মাতাই আমার আসল পরিচয়: জীবন

অভিনেতা নয়, নির্মাতাই আমার আসল পরিচয়: জীবন
×

নির্মাতা ও অভিনেতা শরাফ আহমেদ জীবন

অনিন্দ্য মামুন

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২১ | ০৫:০০ | আপডেট: ০২ মার্চ ২০২১ | ০৭:০০

  • মূলত নাটক ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা তিনি। নির্মাণ করেছেন হাওয়াই মিঠাই, সিরিয়াস একটি কথা আছে, ছায়াবাজি, চৌধুরী সাহেবের ফ্রি অফার,  আবার তোরা সাহেব হ- এর মতো দর্শকপ্রিয় নাটক। বিজ্ঞাপনও বানিয়েছেন শতাধিক।  কিন্তু বর্তমানে তাকে সবাই চিনছেন অভিনেতা হিসেব।  ’ব্যাচেলর পয়েন্ট নাটকের সিজন থ্রিতে বোরহান চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে এ নামেই এখন পরিচিতি তার। সম্প্রতি আলোচিত হয়েছেন ’ফিমেল ’ নামে একটি নাটকে অভিনয় করে। তার আসল নাম শরাফ আহমেদ জীবন।  ক্যারিয়ারের নানা বিষয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি

একজন নির্মাতা আপনি। কিন্তু ব্যাচেলর পয়েন্ট নাটকে আপনি বোরহান চরিত্রে অভিনয় করে বেশ পরিচিত লাভ করেছেন। কেমন লাগছে ?

এটা আমার না নাটকটির নির্মাতা কাজল আরেফিন অমির ক্রেডিট। সে চরিত্রগুলো এমন ভাব দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে যে দর্শকরা সে চরিত্রগুলোকে ধারণ করছে। নাটক বিজ্ঞাপন বানানোর জন্য সীমাবদ্ধ মানুষের কাছে আমার পরিচয় ছিল। ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ নাটক করার পর দর্শক মনে করে পরিচালক অমি আমাকে নতুনভাবে নিয়ে আসছেন। রাস্তাঘাটে মানুষ আমাকে এখন ‘বোরহান ভাই’ বলে ডাকেন।  বিষয়টা পজেটিভ। খুবই পজেটিভ। বোরহান ভাই হিসেবে অনেকেই ফেসবুকে বার্তা দিচ্ছেন, ভাই আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন? ফেসবুক খুললেই ইনবক্সে ভরা থাকে। এতে করে বুঝলাম বোরহান ভাইকে মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে। তবে আমি তো অভিনেতা নই, আমি আগাগোরা একজন নির্মাতা। নির্মাতা পরিচয়টাই আমার আসল পরিচয়।  তবে অমির এমন  হিট সিরিয়ালে আমাকে নিচ্ছে তখনই তাকে বলেছিলাম, বুইঝো আমার জন্য যেন সিরিয়ালের ইমেজ নষ্ট না হয়। সে শুধু বলেছিল, তার উপর ছেড়ে দিতে। পরিচালক অমি আমার চরিত্রটা এমনভাবে পোট্রে করছে যে মানুষ আসল নামটা ভুলে বোরহান ভাই হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। 

বলছেন অভিনেতা নই, কিন্তু নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছেন?

আমার তো অভিনয় করার কখনো ইচ্ছা ছিল না। কাছের লোকজন ক্যারেক্টার সেট করে আমাকে ডাকত। বলত, তুমি ছাড়া হবেই না। তখন বাধ্য হয়ে অভিনয় করতে হয়। সরয়ার [মোস্তফা সরয়ার ফারুকী] ভাই বলেন, ‘এটা জীবন করবে।’ অমিতাভ রেজা ভাই বলেন, ‘তোর করতেই হবে।’ অনম বিশ্বাস ভাই বলেন, ‘আরে এইটা তো তোকে ভেবেই লেখা।’ তাদের না করতে পারতাম না। তখন থেকেই টুকটাক কাজ করা। সেই টুকটাক করতে  এখন তো সমানে সবাই ডাকে। এখন যারা নিয়মিত কাজ করছে তাদের প্রায়জনই আমার ছোট ভাই। তারা অনুরোধ করে বলেন জীবন ভাই অমুক চরিত্র আপনাকে ভেবে লিখেছি করেন দিবেন। আগে বড় ভাইয়ের করতেন এখন ছোট ভাইদের অনুরোধ করেন। ছোটদের অনুরোধ ফেলতে পারি না। বিগত কয়েকমাস ধরে আমি প্রচুর নাটকে অভিনয় করেছি। আমি পেশাদার অভিনেতা নই। এইযে এতো অভিনয় করেছি কারও কাছ থেকে কিন্তু আমি কখনও পেমেন্ট নেইনি। এখনো নিচ্ছি না। তবে যেভাবে চাহিদা বাড়ছে ভাবছি এখন থেকে পেমেন্ট নিতে হবে (হাসি)।

তার মানে আপনি অনুরোধ রাখতে অভিনয় করেই যাবেন?

আসলে অভিনেতা হওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই আমার। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে কেউ যদি ডাকেন, আমাকে দিয়ে যদি তারা বিন্দুমাত্র উপকৃত হন, তাহলে না করব কেন।

 আপনার কাজের শুরুটা হয়েছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে । সেই শুরুটা কিভাবে হয়েছিলো?

 ফারুকী ভাই আমাদের গুরু। তার সঙ্গে কাজের শুরু ২০০২ সালে। তারও  প্রায় একবছর আগে থেকে তার সঙ্গে ফোনে আলাপ করতাম। রীতিমত বিরক্ত করতাম। বলতাম, আমাকে আপনার সঙ্গে নিতেই হবে! সরয়ার ভাই বলতেন, তুমি তো ছোটমানুষ। গোঁফ দাঁড়ি ওঠে নাই। তুমি কীভাবে পারবে! অভিনয় নাকি ইউনিটে কাজ করতে চাও? আমি ইউনিটে কাজ করতে চাইতাম। সরয়ার ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল আজিজ সুপার মার্কেটে। তখন বলেছিলান, ভাই আমি সেই জীবন যে আপনাকে বিরক্ত করি। উনি বলেছিলেন, কেন কাজ করতে চাও? বলেছিলাম, আমি অনেক ক্রিয়েটিভ। মনে হয় আমি করতে পারবো। তাছাড়া আপনি যে কাজ করেন আমার কাছে মনে হয় কাজগুলো অনেক সহজ। তখন ফারুকী ভাইয়ের হিট কাজ হয়েছিল চ্যানেল আইয়ের ‘চড়ুইভাতি’। তখনতার ‘একান্নবর্তী’র শুটিংয়ে আমাকে যেতে বলেছিলেন ঠিকানা দিয়ে। সেখানে পৌঁছানো ছিল আরেক মজার ঘটনা। আমাকে দেয়া হয় মহাখালী ডিওএইচএস এর ঠিকানা, আমি চলে যাই ধানমন্ডি ১৭ নাম্বার রোডের ২৩৬ নাম্বার বাড়ির খোঁজে। কিন্তু সেখানে এই ঠিকানায় বাড়ি ছিল না। পরে খুঁজে খুঁজে বিকেলে মহাখালী ডিওএইচএস এর ঠিকানায় যাই। এই দিনটা ছিল ২০০২ সালের ৫ মে। সেদিন থেকে সরয়ার ভাইয়ের সংস্পর্শ পাই। 

কেবল নির্মাতা হতেই কি ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন?

নির্মাতা হতে আমার ঢাকা আসা নয়।  আমার ঢাকায় আসার উদ্দেশ্য ছিল সার্ভাইভ করা। লেখাপড়া করা এবং একটা থাকার জায়গা নিশ্চিত করা। মিডিয়াতে কাজের ইচ্ছে ছিল তবে মূল উদ্দেশ্য ছিল লেখাপড়া আর সার্ভাইভ। মফঃস্বলে বড় হয়েছি। তখনই বুঝেছিলাম ঢাকা যেহেতু কেন্দ্র তাই এখানে আসতেই হবে।

দর্শকপ্রিয় অনেক নাটকের নির্মাতা আপনি। এখন নাটক নির্মাণ করছেন না কেনো?

এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তবে বড় কারণ হচ্ছে বাজেট। নাটকে বাজেট কম পাই ফলে যেভাবে কাজ করতে চাই কিংবা গল্পের ডিমান্ড অনুযায়ী নির্ধারিত জায়গায় যখন শ্যুট করতে পারি না। বিষয়টা আমার কাছে খারাপ লাগে। তাই বিজ্ঞাপনে বেশি মনযোগী হলাম। কারন বিজ্ঞাপনে নানান ধরনের কনসেপ্ট নিয়ে কাজ করা যায় এবং যখন যেখানে যা ডিমান্ড থাকে ঠিক সেইভাবে শুটিং করতে পারি। তবে এখন একেবারেই যে নাটক নির্মাণ করছি না তা কিন্তু নয়। বিশেষ দিবস কিংবা উৎসব পার্বণে নাটক নির্মাণ করছি। তবে আমি বিজ্ঞাপনেও গল্প বলার চেষ্টা করি। আমার নির্মিত গ্রামীণফোনের ‘আমরা আমরাই তো’নাম্বার ওয়ান চা, ইউ ক্যাশ, বিকাশের ৩টা সিরিজ, ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এটুআই, মরটিন, প্রাণ আরএফএল, মিনিস্টার ফ্রিজ সহ শতাধিক বিজ্ঞাপনের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন।  

এখনকার নির্মাতারা  গল্প বলার চেয়ে কিভাবে ভিউ হবে সেদিকে মনোযেগী বেশি। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

কিভাবে ভিউ বেশি হবে ভাবনা মাথায় নিয়ে কাজ করা দোষের কিছু না। এটাকে নেতিবাচক ভাবে দেখিনা আমি। তবে পরিচালকের মাথায় যদি শুধু এটাই থাকে তাহলে খারাপ। একজন নির্মাতার প্রধান চাওয়া হতে হবে সুন্দর করে গল্প বলা। এরপর অন্যান্য বিষয়ে থাকতেই পারে। কিন্তু এখন গল্প বলার দিকেই মনোযোগ কম দেখা যায়।  এর জন্য আমি মনে করি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোই দায়ি।

কোন দিক থেকে চ্যানেলকে দায়ি করছেন?

আমি জানিনা চ্যানেলগুলো এ বিষয়ে রাগ করবে কিনা। হিসেবে করে দেখুন ভারতীয় চ্যানেলগুলোর দর্শক কি কমে গেছে? কমে নাই কিন্তু। তাহলে আমার দেশের দর্শকদের দর্শক কমছে কেনো? কেনো কমে যাচ্ছে এটা চ্যানেলকেই বের করতে হবে। বের করে সে দিকটার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তারা বিজ্ঞাপন পাচ্ছেন না বলে নাটকের বাজেট কমিয়ে দিয়েছেন। আর বিজ্ঞাপনদাতারা চ্যানেলগুলো দর্শক দেখছেন না বলে বিজ্ঞাপন দিতে চান না। তাহলে বুঝেছেন সমস্যাগুলো কোথায়। চ্যানেলের উচিত ক্ষতিপূরণ দিয়ে হলেও দর্শক পছন্দ করেন এমন নাটক ও প্রোগ্রাম বানানো। আর ভালো কন্টেন্ট যারা বানান সেই নির্মাতাদের আমি প্রমোট করবো। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে উল্টা জিনিস। ইউটিউবে যে নাটক হিট হয় সে নাটক চ্যানেলগুলো চালায়।আবার নাটক নির্মাণ করা হয় ইউটিউব চ্যানেলের জন্য সেটা অর্ধেক দামে আবার কিনে নেয় চ্যানেল। এই গুজামিলের জন্য আমি চ্যানেলকেই দায়ি করবো। বিষয়টি দেখভালের জন্য আসলে চ্যানেলের শক্ত ও মেধাবি একটা টিম থাকা দরকার।

আপনি তো সিনেমা নির্মাণ করবেন বলেছিলেন। তার খবর কি?

ধৈর্য্যই হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রার্থনা, বলেছেন গৌতম বুদ্ধ  । আমিও এটা মানি। সবসময় ধৈর্য্য ধরে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু সিনেমার ব্যাপারে আমি ভীষণ ডেসপারেট। এটা বানাতেই হবে। এই যে হল নাই, চালানোর জায়গা নাই শুনি। কিন্তু আমার বিশ্বাস, ভালো সিনেমা বানাতে পারলে মানুষ খুঁজে খুঁজে দেখবে। কে বানিয়েছে এটা দেখবে না। আমার ওস্তাদ সরয়ার ফারুকী, গাউসুল আলম শাওন ভাই, তানভীর হোসেন, আনিসুল হক এই মানুষগুলো আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। ব্যক্তিগত জায়গা থেকে সবকিছু নিয়ে আমি তাদের পরামর্শ নেই। তাদের সঙ্গেও আলাপ করেছি। দুই তিনটা গল্প নিয়ে গত দুই বছর নিয়ে কাজ করছি। এরমধ্যে সৈয়দ শামসুল হকের ‘রক্ত গোলাপ’ নামের একটি অসাধারণ উপন্যাস নিয়ে আগাচ্ছি। আরও একটা গল্পের চিত্রনাট্যের কাজ চলছে। হুমায়ূন আহমেদের পর বাংলাদেশে চিত্রনাট্য লেখায় যদি কারও নাম বলতে হয় আমি আনিসুল হকের কথা বলবো।  বিষটি নিয়েই এখন দৌড়ঝাপ চলছে। সিনেমার বিষয়টি কিন্তু অনেক বড় ক্যানভাস। তাই প্রস্তুতির পর্বও অনেক দীর্ঘ হতে হয়। প্রযোজক পাওয়ার একটা বিষয়ও থাকে। 

দেশে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সিনেমা বানিয়ে চালাবেন কোথায়?

এখন তো সিনেমা হল সবাই পকেট নিয়ে ঘুরেন। প্রতিটি মানুষের মোবাইল একটা সিনেমা হল। সিনেমা দেখানোর মাধ্যমের এখন অভাব নেই। এছাড়াও নেটফ্লিক্স, অ্যামাজান প্রাইমসহ বড় বড় ওটিটি রয়েছে। মেক্সিকান ‘রোমা’ নেটফ্লিক্সের সিনেমা। যেটি বড় বড় অ্যাওয়ার্ড পাওয়া। সিনেমা বানানো হয় মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য। যে কোনো মাধ্যম দিয়ে গেলেই হলো। সিনেমা হলের দরকার কী? সিনেমা দেখানোর মাধ্যমের অভাব নেই।

আরও পড়ুন

×