ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

বিষে বিষক্ষয় ২০২০

বিষে বিষক্ষয় ২০২০
×

অনিমেষ আইচ

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০০:৫৫ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০১:০০

টেলিভিশন/ওয়েব/ইউটিউব ইত্যাদি মাধ্যমে অসংখ্য মানুষ নাটক দেখে, অন্য কিছুও দেখে। এসব মানুষের সঙ্গে খুব আগ্রহ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করি। জানতে চাই মানুষের আগ্রহের শীর্ষে কী? এ রকম কয়েকজনের সাক্ষাৎকার তুলে ধরলাম। এক ধরনের টিআরপি রিপোর্ট টাইপ।

সাক্ষাৎকার-১

মাঝে কক্সবাজারে ছিলাম কিছু দিন। প্রত্যেক দিন একটি রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে লক্ষ্য করতাম, ২০-২২ বছরের এক তরুণ কাজের ফাঁকে হেডফোন লাগিয়ে তার মোবাইল ফোনে কী যেন দেখে। একদিন বিনয় সহকারে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই কী দেখেন?

ছেলেটি সরল হাসি দিয়ে জানাল, ওয়াজ দেখি ভাই। আযহারী আর তাহেরীর ওয়াজ ভালো লাগে।

নাটক দেখেন না?

- আগে দেখতাম। মোশাররফ করিমের নাটক। হেয় ইসলাম নিয়া বাজে কথা বলার পর নাটক দেখাই ছাড়ান দিছি। আর কথা বাড়ালাম না। দেখলাম ওয়েটার ছেলেটা গভীর মনোযোগে মোবাইলে ওয়াজ দেখছে আর হাসছে। বুঝলাম ওয়াজের মধ্যে ভাইটামিন আছে।

সাক্ষাৎকার-২

গভীর রাত, ড্রাইভ করে একাকী ফিরছি। বিজয় সরণির কাছাকাছি এসে গাড়ি আর স্টার্ট নিচ্ছে না। বিরাট বিপদ! অতি কষ্টে দু'জন রাতজাগা পথচারীকে পাওয়া গেল। তারা কিছুদূর ঠেলে সাহায্য করল। তারপর একজন উবার ড্রাইভারের সহযোগিতায় গাড়ি স্টার্ট নিল। কৃতজ্ঞতাবশত উপকারী ভাইদের নিয়ে রাস্তার পাশের টি স্টলে চা খাচ্ছি। কথায় কথায় জানতে চাইলাম-

- ভাই টিভি নাটক দেখেন?

-ফানি নাটকগুলো দেখি, সারাদিন নানান দুঃখ-কষ্টে থাকি। ওইগুলো দেখলে ভালো লাগে।

- প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী কারা।

- মোশাররফ ভাই আর চঞ্চল ভাইরে ভালো লাগে।

ভদ্রলোকদের মধ্যে অন্যজন বেশ কিছু জনপ্রিয় ডায়ালগ আওড়ায়। বুঝতে চেষ্টা করি, কতটা প্রিয় তাদের টিভি অভিনেতারা।

সাক্ষাৎকার-৩

দু'জন আমআদমির সাক্ষাৎকারের পর এবার আমি একজন সুশীল ভদ্রলোকের সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরছি। এই ভদ্রলোক পেশায় ডাক্তার। প্রচণ্ড জনপ্রিয় এবং এক্সপেনসিভ। একটা ক্লিনিকে শুটিং করছি, শুটিংয়ের ফাঁকে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ।

- ভাই, নাটক দেখা হয়? মানে টেলিভিশনের নাটক?

প্রশ্ন করে মনে হয়, বিরাট অপরাধ করে ফেলেছি। তিনি চশমার ফাঁক দিয়ে কটমট করে তাকালেন।

- এগুলো কি নাটক? ছ্যাবলামি!

- সরি। মানে শেষ নাটক কবে দেখেছেন?

- দিনক্ষণ মনে নেই। সুবর্ণা মুস্তাফা আর আফজাল হোসেনের একটা নাটক : বছর বিশেক আগে।

ডাক্তার ভদ্রলোকের সঙ্গে বিশেষ কথা বাড়াতে ইচ্ছা হলো না। নাটক, নিয়ে তার বৈরী আচরণ দেখে যারপরনাই মর্মাহত হলাম।

সাক্ষাৎকার-৪

ধামরাই আমার প্রিয় একটি শহর। এ শহরে কারণে-অকারণে শুটিং করতে যাই। শুটিংয়ের লোকেশন দেখতে গেছি। এক বাড়িতে বিকেলের চা-নাশতা খাচ্ছি। হঠাৎ একযোগে আশপাশের সব বাড়ির টিভি সেট থেকে একই সংগীত ভেসে আসতে লাগল 'দাদাগিরি'। বুঝতে পারলাম কলকাতার সেই বিখ্যাত অনুষ্ঠান যেটার সঞ্চালনা করেন ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলি।

চা-নাশতার পর্ব শেষ হতেই রওনা দেওয়ার আগ মুহূর্তে বাড়ির ভাবিকে বললাম- ভাবি বাংলাদেশের কোনো অনুষ্ঠানই দেখেন না, তাই না?

- দেখব না কেন? ক'দিন আগে বনানীর একটা বিল্ডিংয়ে আগুন লাগল, সারাক্ষণ লাইভ দেখেছি।

- নাটক, সিনেমা, গানের অনুষ্ঠান?

- ওগুলো পোষায় না।

মনের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো। দীর্ঘশ্বাস চাপা দিয়ে রাস্তায় বের হয়ে এলাম। সরু গলির পথের দু'পাশের সব বাড়ি থেকে ভেসে আসছে কলকাতার চ্যানেলের নদীয়া শান্তিপুরী ভাষার শব্দমালা।

শেষ সাক্ষাৎকার

ময়মনসিংহ থেকে বাসে করে ঢাকায় ফিরছি। টঙ্গীর কাছাকাছি আসতেই শুনলাম, ইজতেমাকে কেন্দ্র করে দু'দল লোকের মধ্যে মারামারি শুরু হয়েছে। বাস-গাড়ি ভাঙচুর আরম্ভ হয়েছে। এক লাফে বাস থেকে নেমে গলিপথে ছুটতে শুরু করলাম। পথে দেখা হলো এক যুবকের সঙ্গে। আমি যুবককে চিনতে না পারলেও সে আমাকে চিনেছে। টেলিভিশন নাটকের ডিরেক্টরদেরও মানুষ চেনে? কথায় কথায় জানতে পারলাম, আমার অভিনীত কোনো নাটক বা সিনেমা সে দেখেছে। ভুল ভাঙাল। তারপর তার জোরাজুরিতে এক কাপ চা খাওয়ার জন্য তাদের বাসায় যেতে হলো। বাসার ড্রইংরুমে মাফলার, কম্বল, শীত টুপি, হ্যান্ডগ্লাভস পরে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বসে আছেন। বসে বসে টিভিতে টকশো দেখছেন। যদিও তেমন কোনো ঠান্ডা নয়, তবুও কেন তিনি এত শীতের কাপড় পরে আছেন বুঝলাম না। চা আর জিলাপি খেতে খেতে বৃদ্ধ চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম-

- চাচা নিয়মিত টক শো দেখেন?

- ভালো লাগে না, সব কয়টা চোর।

- তাইলে দেখেন কেন?

-দেশের রাজনীতির খবরাখবর তো রাখতে হবে।

এ কথা বলেই কাশতে শুরু করেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় কাশতে কাশতেই বোধহয় মারা যাবেন। কিছুক্ষণ পর কাশি থামিয়ে লাল রঙের আদা চায়ে চুমুক দেন তিনি। আমি গলা খুব মোলায়েম করে জানতে চাই, নাটক দেখেন না?

- দেশের রাজনীতিকরা যেই নাটক করে, আর কোনো নাটক দেখার প্রয়োজন আছে কি?

গভীর দর্শন মাথায় নিয়ে টঙ্গীর সেই বাসা থেকে বের হয়ে আসি। কে বড় অভিনেতা জাহিদ হাসান নাকি যুবলীগের সাবেক সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী? নেতা আর অভিনেতার মধ্যে যে সুদক্ষ দেয়াল তা কতটা সূক্ষ্ণ তা জানতে জাতি ব্যর্থ হয়। আমি কোনো টেলিভিশন এক্সপার্ট না। টেলিভিশনের একাল সেকাল নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতে আমার সাজে না। তাই আমি আমার কয়েকটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরলাম। স্টকে আরও শ'খানেক সাক্ষাৎকার আছে। যার কোনো কোনোটা প্রকাশের অযোগ্য। মানুষের মনোজগতে কখন কী নাড়া দেবে, তা বোঝা ভারি মুশকিল। তবে দেশের রাজনীতি এবং সমাজনীতি খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবিত করবে টেলিভিশন শিল্পকে, এটাই স্বাভাবিক। মানুষের দ্রুত বড়লোক হওয়ার যে প্রবণতা সমগ্র বাংলাদেশে চলমান নাটক শিল্পের মানুষজনও নিশ্চয়ই তার ঊর্ধ্বে নয়। দ্রুত নাটক নির্মাণ করতে গিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই নাটকে প্রচুর ফাঁকফোকর থেকে যাচ্ছে। এই ফুটা সহসাই যে সারাই হবে তার কোনো লক্ষণ দেখি না। তবে এ কথাও সত্য, এত স্বল্প সময়ে, স্বল্প আয়োজনে এর ভেতরেও অসংখ্য জীবনঘনিষ্ঠ নাটক নির্মাণ হচ্ছে। ২০২০ আসছে। বিষে বিষক্ষয় হবে সেই প্রত্যাশা রাখি। শুভ নববর্ষ ২০২০।

   

আরও পড়ুন

×