সঙ্গীতে ভালো-মন্দের এক বছর
×
আল নাহিয়ান
প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০১:১১
২০১৯ সালে জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি তরুণ শিল্পীদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। অ্যালবাম প্রকাশনা থমকে গেলেও ছিল একক গানের জোয়ার। নানা ধরনের গল্পের সঙ্গে বেশিরভাগ গান প্রকাশ পেয়েছে ভিডিও আকারে। কিন্তু শ্রোতাদের মনে বারবার অনুরণন তুলেছে এমন গানের সংখ্যা বেশি নয়। সংগীতের সারাবছরের হিসাবনিকাশ নিয়ে এ আয়োজন-
অন্যদিকে, কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবর ভক্তদের চমকে দিয়েছেন চলচ্চিত্রে অভিনয় করে। 'গহীনের গান' নামে মিউজিক্যাল ছবিটিও নির্মিত হয়েছে তার গাওয়া ৯টি গান নিয়ে। এ ছাড়া সারাবছর অসংখ্য গান প্রকাশ করে আলোচনায় ছিলেন আসিফ আকবর। তার সঙ্গে দ্বৈত গান গেয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন কণ্ঠশিল্পী কর্নিয়া। তাদের গাওয়া 'তোমার হাসি' গানটি প্রশংসা কুড়িয়েছে অনেকের। কণ্ঠশিল্পী হাবিব তার এইচডব্লিউ চ্যানেলে একাধিক গান প্রকাশ করে আলোচনায় ছিলেন। তার একক 'মন তুই' এবং ফেরদৌস ওয়াহিদের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া 'পাঞ্জা' অনেকের মনোযোগ কেড়েছে। এ ছাড়া তৌসিফের 'আমার প্রিয়জন', দলছুটের 'মন দাবাড়ূ', ইমরান-বৃষ্টির দ্বৈত গান 'কিছু কথা', আরমান আলিফের 'ধোঁকা', ঐশীর 'ইস্টিশন-২', এফএ সুমনের 'পরাণ কান্দে' এবং বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে আরেফিন রুমীর 'বিশ্ব জয়ের পথে বাংলাদেশ'সহ গানগুলো নিয়ে অনেক আলোচনা শোনা গেছে। এর বাইরে দর্শকের মনোযোগ কেড়েছে ইমরানের একক 'ভুলে যেতে শিখিনি', 'আমার কাছে তুমি অন্যরকম' এবং লাবিবার সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া 'কেন এত চাই তোকে', শুভমিতার সঙ্গে গাওয়া দ্বৈত গান 'পাওয়া'সহ বেশ কিছু গান। তরুণ শিল্পী শেখ সাদীর 'নেই হয়ে আছো' ও 'ললনা-২' শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে। শরিফুলের 'ভাবতে ঘেন্না লাগে'ও ছিল আলোচিত গানের তালিকায়। কণ্ঠশিল্পী লিজার 'এক যমুনা' ও পড়শির 'আবাহন'সহ আরও বেশ কিছু গানের মধ্য দিয়ে নিজেদের গায়কি ভাঙার চেষ্টা করেছেন তারা।
প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর অপ্রকাশিত দুটি গান 'ভাবসূত্র' ও 'রাতের এ পিঠে' অনেক ভক্তকে অশ্রুসিক্ত করেছে। আইয়ুব বাচ্চুর নতুন কোনো গান শুনতে পাওয়া ভক্তদের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত এক উপহার। নবীন শিল্পী পলিনের গাওয়া 'রঙ' গানের ভিডিও নিয়ে দর্শকের মাঝে ছিল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারও কাছে গানের অভিনেত্রী নিপুণের নাচের আয়োজন ছিল ভালো লাগার কেন্দ্রবিন্দুতে। ইবরার টিপুর সংগীতে টিনার 'তুমি কাছে থেকেও' গানটি নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে আলোচনা শোনা গেছে। কাজী শুভ প্রতিবছরের মতো এবারও আলোচনায় ছিলেন। 'ভুলিয়া না যাইও', 'মন ভাঙা', 'কত ভালোবাসি তোরে'সহ বেশ কিছু গান প্রকাশ করে শ্রোতার প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করেছেন তিনি। নন্দিত লোকশিল্পী কাঙালিনী সুফিয়ার একটি মিউজিক্যাল ফিল্ম প্রকাশ পায় এ বছর। একই সঙ্গে প্রকাশ পায় 'প্রেমিক বাঙাল' শিরোনামের একটি গান। যেখানে কাঙালিনীর সহশিল্পী হিসেবে ছিলেন কনা ও মার্সেল।
অভিনয় ও ব্যান্ড অ্যালবামের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তাহসান বিগত বছরগুলোর তুলনায় গান প্রকাশ করেছেন হাতেগোনা কয়েকটি। এর মধ্যে 'ডানা নেই'সহ অন্য গানগুলো তার ভক্তদের অনেকটাই প্রত্যাশা পূরণ করেছে। ব্যান্ড ভাইকিংসকে এ বছর বেশ সক্রিয় দেখা গেছে। 'ক্রোধ' এবং আইয়ুব বাচ্চুর স্মরণে প্রকাশিত 'ঈশ্বর' গানটি সংগীতপ্রেমীদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অন্যদিকে বিরতি ভেঙে পান্থ কানাই প্রকাশ করেছেন একক গান 'সোনা যাদু'। যারা দীর্ঘদিন তার গানের প্রতীক্ষায় ছিলেন, তাদের অনেকেই খুশি হয়েছেন নতুন গানের প্রকাশনা নিয়ে। একইভাবে কণ্ঠশিল্পী ডলি সায়ন্তনীও এ বছর নতুন সব আয়োজন নিয়ে ছিলেন ভীষণ ব্যস্ত। ফোক-ফিউশন, মেলোডিসহ বেশ কয়েকটি ঘরানার গান নিয়ে আলোচনায় এসেছেন। হৃদয় খানের 'রূপসী' এবং হাবিবের 'যে ছিল আড়ালে', 'আনমনা মন' গানগুলোর ভিডিওতে দর্শক নতুন গল্পের স্বাদ খুঁজে পেয়েছেন। যদিও তাদের আগের গানগুলোর মতো এ বছরের আয়োজন সেভাবে আলোড়ন তোলেনি। তারপরও অনেকেই তাদের নতুন গানের পরিবেশনায় ভিন্নতার ছাপ খুঁজে পেয়েছেন।
প্লেব্যাকের বাইরে কনাকে এ বছর সেভাবে একক গান প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। এরপরও তার যে ক'টি গান প্রকাশ পেয়েছে, তার মধ্যে ইমরানের সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গাওয়া 'তোমাকে ছুঁয়ে দেব' অনেকের ভালো লেগেছে। এ ছাড়া ডি-রকস্টার শুভর 'আগে জানলে', কিশোর পলাশের 'উড়ে আয়', ইমন খানের 'মন নিয়ে খেলা' গানগুলোয় কিছুটা হলেও ভিন্নতা আনার চেষ্টা ছিল। সালমা এ বছর হাতেগোনা কয়েকটি গান প্রকাশ করেছেন। তার মধ্যে 'কে যে কখন' গানটি অনেকের মনোযোগ কেড়েছে। প্রীতম হাসান গান গাওয়া ও সংগীতায়োজনের পাশাপাশি অভিনয় ও বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবে দর্শকের নজর কেড়েছেন। বছরের শেষ প্রান্তে প্রকাশ পেয়েছে ন্যান্সির 'কী করে তোমায়' শিরোনামের একটি গান। এ ছাড়া প্রকাশ পেয়েছে এসআই টুটুলের 'হৃদয়ের লেনাদেনা', তানযীব সারোয়ারের 'তোরে ছাড়া'সহ আরও বেশ কিছু গান। যেগুলো শ্রোতার মধ্যে সাড়া জাগাবে কিনা, তার জন্য আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। ন্যান্সি এবং এসআই টুটুল এ বছর গান প্রকাশ করেছেন অন্যান্য বছরের তুলনায় সবচেয়ে কম। অন্যদিকে, বছরের বিভিন্ন সময় গান প্রকাশ করতে দেখা গেছে তানযীব সারোয়ারকে। যদিও গানের সংখ্যা অনুযায়ী সাড়া-জাগানোর মতো গান কমই ছিল। ফাহমিদা নবীর 'প্রিয় বাংলাদেশ', বাপ্পা মজুমদারের 'মন পবনের নাইয়া', তাহসানের 'আদর' এবং মিনারের 'আয়না' গানগুলো নিয়ে শ্রোতার আগ্রহ দেখা গেছে। তবে ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এ গানগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কিনা, তা অনুমান করা কঠিন। সংগীতবোদ্ধাদের মতে, অনেক গান শ্রোতার কান পর্যন্ত পৌঁছাতে সময় লাগে। কিন্তু একপর্যায়ে দেখা যায়, ধীরে ধীরে সেই গানগুলো অনেকের মন আন্দোলিত করেছে। ভালো-মন্দ মিলিয়েই এ বছরে প্রকাশিত গানের সংখ্যা একেবারে কম নয়। কিন্তু কেন গানগুলো দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতার মনে অনুরণন তুলতে পারছে না- তার সঠিক উত্তর দিতে পারেননি অনেকে।
কারও কথায়, এখনকার গানে প্রাণের ছোঁয়া নেই। আবার অনেকে বলেন, তারকা খ্যাতির মোহে গান করেন বলেই এখনকার শিল্পীদের গান শোনার চেয়ে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বাইরেও একপক্ষ বলে, 'গান যদি ভালো না-ই হবে, তাহলে কোটি ভিউ হচ্ছে কীভাবে? গান ভালো হচ্ছে, কিন্তু এটা অনেকে স্বীকার করতে চান না।' এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। তারপরও এটা সত্যি, ২০১৯ সালে প্রকাশিত গান ও অ্যালবামগুলো শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেকটা কম। অ্যালবাম বলতে গেলে বিলুপ্তের পথে। যদিও অনেকে অ্যালবাম প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু সেই অ্যালবামের গানগুলো শুরুতে একক গান হিসেবে প্রকাশ পেয়ে আসছে। আবার গানের ক্ষেত্রে ফোক ঘরানা ও মেলেডিপ্রধান অধুনিক গান প্রাধান্য পেয়েছে। রক, মেটাল শুধু কনসার্টগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ব্যান্ডের অ্যালবাম যেমন ছিল না, তেমনি ব্যান্ডগুলো একক গান প্রকাশে আগ্রহী বলে মনে হয়নি। এ বছর ফিডব্যাক তাদের চার দশক পূর্তি নিয়ে কনসার্ট করেছে। মাইলসও ৪০ বছর পূর্তিতে দেশ-বিদেশে কনসার্টসহ নানা আয়োজন করেছে। ২০ বছর পূর্তির উৎসবও করেছে আর্টসেল। কিন্তু এমন মাহেন্দ্রক্ষণে কোনো অ্যালবাম বা নতুন গানের প্রকাশনায় তাদের দেখা যায়নি। বছরজুড়ে শুধু একক শিল্পীদের নানা আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। এতে করে গানের আয়োজনেও রকমারিতার কিছু অভাব ছিল বলে মত সংগীতপ্রেমীদের।
