ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিদায় কোকিল কণ্ঠি

লতায় বাঁধা চার প্রজন্ম

লতায় বাঁধা চার প্রজন্ম
×

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকর। ১৯৭২ সালে ঢাকায় - সংগৃহীত

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ১৪:৩৩

'ও দাদাভাই, দাদাভাই মূর্তি বানাও/ নাক মুখ চোখ সবই বানাও/ হাত বানাও পা বানাও/ বুদ্ধ যিশু সবই বানাও/ মন বানাতে পারো কি? একটা ছোট বোন বানাতে পারো কি?'

সাদাকালো যুগে আমাদের যখন বেড়ে ওঠা এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন-বিটিভি যখন পারিবারিক বিনোদনের প্রধান মাধ্যম; তখনই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তৈরি 'রক্তাক্ত বাংলা' সিনেমার 'ও দাদাভাই' গানটি মাথায় গেঁথে যায়। তা ছাড়া 'ছায়াছন্দ' নামের অনুষ্ঠানে মাঝেমধ্যেই গানটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো হতো। আমরা দেখতাম এবং বুঝে না-বুঝে আনন্দ নিয়ে গাইতাম, কখনও গুনগুন করতাম। কার লেখা বা গাওয়া কিছুই জানতাম না। বহুদিন পরে জেনেছি, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালে মমতাজ আলী নির্মাণ করেন ছবিটি, যার সংগীত পরিচালক ছিলেন সংগীতের আরেক দিকপাল সলিল চৌধুরী, আর গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর। এর আগে বা পরে বাংলাদেশের কোনো সিনেমায় বা অন্য কোনো মাধ্যমে লতা মঙ্গেশকরকে আর পাওয়া যায়নি। কিন্তু তাতে কী, সুরের তো সীমানা হয় না, সেখানে ভাষাও বড় কোনো বাধা নয়। আর লতা মঙ্গেশকর তো তার মাতৃভাষার পরই যে ভাষায় সবচেয়ে বেশি গান করেছেন, তা বাংলা। তাই তো বাংলাদেশেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম মন রাঙিয়ে গেছে লতার গান। ১৩ বছর বয়সে গান শুরু করেছিলেন তিনি। সে হিসাবে প্রায় চার প্রজন্মের মন বেঁধেছেন লতা।

শুধু মুক্তিযুদ্ধের ছবির গানই নয়; ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ সরকারের সমর্থনে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, মোহাম্মদ রফি, মান্না দে, আশা ভোঁসলে, সলিল চৌধুরী প্রমুখ ভারতীয় শিল্পীর সঙ্গে লতা মঙ্গেশকরও যুক্ত হন। বাংলাদেশের সমর্থনে তিনি গান করেন, অর্থ সংগ্রহ করেন। লতা মঙ্গেশকর সেই সময়ের কথা স্মরণ করে ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত 'বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা'র অন্যতম সংগঠক সৈয়দ হাসান ইমাম সমকালকে বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরই পিলখানায় ভারতীয় সৈন্যদের সম্মানে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই দলে লতা মঙ্গেশকরও ছিলেন এবং পিলখানা মাঠে গান করেন। সুনীল দত্ত, সঞ্জয় দত্ত, মালা সিনহাও ছিলেন সেই দলে।

হাসান ইমাম বলেন, 'আমার দায়িত্ব ছিল ভারতীয় সাংস্কৃতিক দলকে দেখাশোনা করার। আমি লতা মঙ্গেশকরকে এফডিসিতে আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি রাজি হলেন। জহির রায়হানকে ফোন করেও পেলাম না। পরে তাকে ছাড়াই লতা মঙ্গেশকরকে এফডিসিতে সংবর্ধনা দেওয়া হলো। পরে জানতে পারি, জহির রায়হান হারিয়ে গেছেন। সে আরেক প্রসঙ্গ। তবে লতা মঙ্গেশকর ভারত ফিরে গিয়ে আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন ধন্যবাদ জানিয়ে।' চিঠিটা হারিয়ে ফেললেও সেদিনের সেই বিকেল এখনও লতার গানের মতোই উজ্জ্বল সৈয়দ হাসান ইমামের স্মৃতিকোঠায়। সেই সফরে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে লতা মঙ্গেশকরের দেখা হয়। সেই ছবি আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

অনেকটা লতার মতো করে কণ্ঠে সুর তুলতে পারেন অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলছিলেন, 'আমার তো দিনই কেটে যেত লতার গানে গানে। শৈশবে তার গান শোনা শুরু করেছি, এখনও শুনছি।'

লতা মঙ্গেশকরের জনপ্রিয় অনেক হিন্দি গান থাকলেও তার পছন্দের তালিকায় 'আর নয় গুন গুন গুঞ্জন প্রেমে', 'প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে', 'ও বাঁশি কেন হায় আমারে কাঁদায়' ইত্যাদি গান। আর সবচেয়ে পছন্দের গানটি দুই লাইন গেয়ে শোনালেন, আজ- 'তবে এইটুকু থাক/ বাকি কথা পরে হবে।/ ধূসর ধূলির পথ-/ ভেঙে পড়ে আছে রথ-/ বহুদূর দূর যেতে হবে।/ আজ তবে এইটুকু থাক/ বাকি কথা পরে হবে।'

লতা মঙ্গেশকরের গানের আবেদনের কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক যতীন সরকার বলেন, 'এ দেশের কয়েক প্রজন্মের তারুণ্যের রুচি তৈরিতে লতা মঙ্গেশকরের গান ভূমিকা রেখেছে। আমরা তার গান শুনতে শুনতেই বড় হয়েছি এবং এখনও শুনছি। গুণকে যে সীমারেখায় আটকে রাখা যায় না, লতা মঙ্গেশকর তা প্রমাণ করেছেন। তিনি শুধু ভারতের শিল্পী ছিলেন না। ছড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বজুড়ে।'

যতীন সরকার বলেন, একটা সময় আমাদের দেশে তো বটেই, পুরো উপমহাদেশে সিনেমা আর রেডিও ছাড়া বিনোদনের আর কোনো মাধ্যম ছিল না। পঞ্চাশ-ষাট দশকের কথা বলছি। সেই সময় প্রধানত রেডিওর গান শুনে আমাদের ঘরে ঘরে ভোর শুরু হতো। শিল্পী তালিকায় সবার আগে আসে লতা মঙ্গেশকরের নাম। তার সেই সব গান আজও স্মৃতিতে ভাসে।

লতা মঙ্গেশকরকে নিয়ে বলতে গিয়ে নিজের পারিবারিক জীবনে ফিরে গেলেন কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন। তিনি বলেন, "আমার বাবা রাজশাহীর রেশম শিল্পে চাকরি করতেন। ১৯৫৯ সালের কথা। সে সময় তিনি প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য জাপান যান। ফিরে আসার সময় একটা ট্রানজিস্টর নিয়ে এলেন। সেই ট্রানজিস্টর আমার মা রান্নাঘরের মোড়ায় বসিয়ে সারাদিন গান শুনতেন। আজও আমার কানে বাজে, 'আকাশ প্রদীপ জ্বলে, কী লিখি তোমায়...' কিন্নরকণ্ঠি লতা মঙ্গেশকরের গান। সেই থেকে লতা আমার সঙ্গী। আমার কন্যাও তার গানের একই রকম ভক্ত। শুধু ট্রানজিস্টরের স্থানে এখন নানা ডিভাইস এসেছে, তবে লতার সেই কণ্ঠ ও সুর একই মাধুর্যে রয়ে গেছে। জানি, আমার নাতনিও আরও কিছুদিন পর লতার গান একই আনন্দ নিয়ে শুনবে। লতা ঠিক এই জায়গায় নিজেকে আলাদা করে নিয়েছেন- কয়েক প্রজন্মকে একই ভালোবাসার মোহজালে বেঁধেছেন। তার প্রতি শ্রদ্ধা আমার আরেকটি বিশেষ কারণে, তিনি ভারতের সবক'টি উল্লেখযোগ্য ভাষায় গান গেয়েছেন। ভাষার প্রতি এই শ্রদ্ধা লতা মঙ্গেশকরকে বিশিষ্ট করে তোলে।"

'মানবিক বোধ আর অনুভূতির আস্বাদ'- লতা মঙ্গেশকরের গান ব্যাপকভাবে বাঙালিসহ পুরো উপমহাদেশের ৩৬টি ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়ে বাজতে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

আরও পড়ুন

×