টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কাজ করছি
ড. মো. শাহজাহান কবীর, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২২ | ০০:০৭
টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, ক্রম হ্রাসমান প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন- কৃষিজমি, পানি, কৃষি শ্রমিক এবং মাটির উর্বরতা) এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তন। দেশে ধানের জমির পরিমাণ প্রতিবছর ০.৪০ শতাংশ হারে কমে যাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিবছর হেক্টরপ্রতি ৪৪ কেজি হারে জেনেটিক গেইন বাড়ানো, কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ১ শতাংশ হারে ফলন পার্থক্য হ্রাস ও নব উদ্ভাবিত জাতগুলোর সম্প্রসারণে দীর্ঘসূত্রতা কমানো, আউশ ধান চাষের এলাকা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও তা সংরক্ষণ এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নদীর পানি ব্যবহারের মাধ্যমে ধান আবাদের এলাকা বৃদ্ধি করা।
সম্প্রতি সমকালকে দেওয়া এসব কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর। তিনি বলেন, 'এক ইঞ্চি জমিও পতিত রাখা যাবে না'- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ ঘোষণা অনুযায়ী পতিত জমি আধুনিক উফশী ফসলের আওতায় এনে উন্নততর উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা পূরণ করে ২০৫০ সাল নাগাদ ৪৮ লাখ টন উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব।
তিনি জানান, নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন ও টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের জাতীয় লক্ষ্য সামনে রেখে ব্রি বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে বিশ্বের সর্বপ্রথম জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত ব্রি ৬২-সহ এই ধরনের ছয়টি জাত এবং পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি গুণাগুণ যেমন- প্রোটিন, আয়রন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, গাবা ও প্রো-ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এবং লো-জিআই এবং ঔষধি গুণাগুণ সংবলিত ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এ ছাড়া মানবদেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে যাতে চালে সংযোজন করা যায়- এমন ধানের জাতও ব্রি উদ্ভাবন করেছে। এই নতুন ধরনের জাতগুলোর অবমুক্তকরণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ড. মো. শাহজাহান কবীরের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- প্রয়োজন মাফিক পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার শুধু উৎপাদিত হলেই হবে না, তা সাধারণ জনগণের খাবারের পাতে নিয়মিত পৌঁছাতেও হবে। গত এক দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য নিরসনে বিস্তর সাফল্য অর্জন করলেও দেশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশের জন্য নিয়মিতভাবে পুষ্টিকর খাদ্য যেমন- মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ফল গ্রহণ সাধ্যের অতীত রয়ে গেছে এখনও। তাদের দৈনন্দিন পুষ্টির অধিকাংশ ক্যালরি, প্রোটিন ও মিনারেল আসে ভাত থেকে। ভাত তাদের কাছে সহজলভ্য, যা তারা নিয়মিত ও যথেষ্ট পরিমাণে খেতে পারছেন। তাই বাংলাদেশের জনগণের জন্য ভাতের মাধ্যমে আবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করার লক্ষ্যে কাজ করছেন ব্রি বিজ্ঞানীরা। ছেঁটে চিকন করলে চালের পুষ্টিমান উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এটি নিরুৎসাহিত করতে ব্রি ইতোমধ্যে প্রিমিয়াম কোয়ালিটি সম্পন্ন বেশকিছু জাত উদ্ভাবন করেছে।
তিনি বলেন, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও নিরাপদ ধানের জাত উদ্ভাবনের জন্য ব্রি বিজ্ঞানীরা বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধুনিক বায়োফর্টিফিকেশন ও জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮-এ কৃষি উন্নয়নে ন্যানোপ্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ধানের উৎপাদন ও রোগবালাই দমনে ন্যানো ফার্টিলাইজার ও ন্যানো পেস্টিসাইডের প্রভাব নিয়ে ব্রিতে গবেষণা শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, এতে দ্রুত সাফল্য অর্জিত হবে। ধানের জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই দমন, সার ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে 'উৎকৃষ্ট কৃষি' নিয়েও ব্রিতে গবেষণা চলছে।
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এবং বর্তমান সরকারের ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্রি ইতোমধ্যে রাইস ভিশন-২০৫০ প্রণয়ন করেছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক। তিনি বলেন, বর্তমান বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যা সাড়ে ২১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। তাই রাইস ভিশন বাস্তবায়নের পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে ব্রি একটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান তৈরি করেছে। যেখানে বলা হয়েছে, উৎপাদনের গতিশীলতা অব্যাহত থাকলে চালের উৎপাদন ২০৩০ সালে ৪৬.৯, ২০৪০ সালে ৫৪.১ এবং ২০৫০ সালে ৬০.৯ মিলিয়ন টনে উন্নীত হবে। ফলে আমরা চালে ২০৩০ সালে ৪.২, ২০৪০ সালে ৫.৩ এবং ২০৫০ সালে ৬.৫ মিলিয়ন টন উদ্বৃত্ত থাকব।
- বিষয় :
- ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট
- কৃষিজমি
- খাদ্য উৎপাদন
