নারীর প্রতি সহিংসতা
সোহেল সরকার
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২২ | ২৩:২৫
ঢাকার এক উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবী নারী নাদিয়া (ছদ্মনাম) পাঁচ বছর আগে প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের কিছুদিন পর তাঁর সামনে ভিন্ন এক বাস্তবতা হাজির হয়। যৌতুকের জন্য শ্বশুরবাড়িতে স্বামীর হাতেই তিনি প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হতেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে বিচ্ছেদের পথ বেছে নেন। নাদিয়া বলেন, 'বিভিন্ন সময়ে আমার ও পরিবারের কাছে যৌতুক দাবি করতেন আমার সাবেক স্বামী। আমি চাকরি করতাম। বেতনের টাকাও তাঁর হাতে তুলে দিতে বলতেন। যে কোনো অজুহাতে আমাকে মেরে রক্তাক্ত করা হতো।' এমন নাদিয়াদের সহিংসতার শিকার হওয়ারা দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছেন।
জাতিসংঘের অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম ও ইউএন উইমেন জানিয়েছে, গত বছর বিশ্বজুড়ে ৮১ হাজার নারী খুন হন। এর মধ্যে সঙ্গী বা পরিবারের মানুষের হাতে খুন হন প্রায় ৪৫ হাজার; যা খুন হওয়া নারীর ৫৬ শতাংশ। এ থেকে বোঝা যায়, নারীর কাছে ঘরও নিরাপদ জায়গা নয়।
শুধু পারিবারিক সহিংসতা নয়, ধর্ষণ এবং আরও নানা ধরনের সহিংসতা হচ্ছে নারীর প্রতি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ বছরের ৯ মাসে (৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) দেশে অন্তত ৩৪ জন নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং আরও সাতজন ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে অন্তত ৭৩৪ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং আরও ১২৮ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছেন। এ সময়ে পারিবারিক সহিংসতায় অন্তত ১৫৮ জন নারী তাঁদের স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও নারীকে যৌন হয়রানি করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতায় রূপ নেয়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নীনা গোস্বামীর মতে, অনেক মামলার রায় হয় কিন্তু শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয় না। ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা থামছে না। যাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ আসে, তাদের অনেকেই ক্ষমতাবান। তারা কোনোভাবেই এসব রায় বাস্তবায়নের দিকে যেতে দেয় না। অনেক সময় নথিও গায়েব হয়ে যায়। মামলাগুলোর পরিণতি শেষ পর্যন্ত কী হচ্ছে, সেটি নিয়ে সঠিক মনিটরিংও নেই। নীনা গোস্বামী এ ধারাটিকে 'ন্যায়বিচারহীনতার সংস্কৃতি' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবাধ ক্ষমতাচর্চার ফলে আমাদের সমাজে এ ধারাটি শক্তিশালী হয়েছে। এ থেকে বের হতে হলে সব মহল থেকে অগ্রসর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই সহিংসতা বন্ধের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ যেমন দরকার, তেমনি সামাজিক সচেতনতাও প্রয়োজন। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী বলেন, সমাজের সব শ্রেণির নারী একই রকম আইনি সুবিধা ভোগ করতে পারেন না।
মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৩১৬ জন নারী নানা ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে নির্যাতনের শিকার ১ হাজার ৭৪২ জন, হত্যা করা হয়েছে ৪৮৪ জনকে এবং সহিংসতার কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১৫৩ জন। এ সময়ে মোট যৌন হয়রানির শিকার ১৯৬ জন, হত্যাকাণ্ডের শিকার সাতজন, আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১২৫ জন, নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৬০ জন, নির্যাতনের ফলে আত্মহত্যা করেছেন ১১৭ জন।
এদিকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ঢাকার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে মোট দায়ের মামলার সংখ্যা ৬০৪। এই সেন্টারে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের কারণে ৬৭৬
জনের ভর্তি হওয়াও নারীর প্রতি সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ করে।
- বিষয় :
- সহিংসতা
- পারিবারিক সহিংসতা