ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সুদিনের অপেক্ষায় বিএসসি

সুদিনের অপেক্ষায় বিএসসি
×

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০

সময়ের হাত ধরে বাড়ছে নৌবাণিজ্য। চট্টগ্রাম বন্দরই এক দশকের ব্যবধানে হ্যান্ডল করছে দ্বিগুণ পণ্য। সমুদ্রপথে বেড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। কিন্তু এই স্রোতে তাল মেলাতে পারেনি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। একসময় যাদের বহরে ছিল ৩৮টি জাহাজ; এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে আটের ঘরে। পরিসংখ্যানের এ চিত্র পাল্টাতে চায় বিএসসি। সমুদ্রপথে আবার দিতে চায় তারা নেতৃত্ব। এ জন্য ঠিক করা হয়েছে নতুন কর্মপরিকল্পনা। আসবে নতুন জাহাজও। দুটি ক্রুড অয়েল ও দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ নতুন করে যুক্ত করতে যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ করেছে তারা। শিগগির যা অনুমোদনের জন্য উঠবে একনেকে। চারটি জাহাজ নতুন করে যুক্ত হলে বিএসসির আয় বাড়বে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজের ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া অর্থও তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘নানা কারণে গত কয়েক দশক পেছনের দিকে হেঁটেছে বিএসসি। এখন আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছি আমরা। সর্বশেষ অর্থবছরে আমরা প্রায় ২২৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছি। লোকসানের বৃত্ত ভেঙে লাভের এ চিত্র আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত। চারটি নতুন জাহাজ বহরে যুক্ত হলে আমাদের আয় ও ব্যস্ততা দুটোই বাড়বে।’

জাহাজের ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া ২৩৭ কোটি টাকা বিএসসির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আশরাফুল আমিন। তিনি বলেন, ‘নতুন চারটি জাহাজের দুটি হবে অয়েল ট্যাঙ্কার। আর দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার। চীন সরকারের সঙ্গে জিটুজি পদ্ধতিতে এই চারটি জাহাজ কিনবে বাংলাদেশ।’

জানা গেছে, বহরে কনটেইনার, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী ও অপরিশোধিত তেল পরিবহনে জাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিএসসি। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিএসসির সক্ষমতা বাড়ানো গেলে লাভের চিত্র ধারাবাহিক থাকবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। বিএসসির নির্বাহী পরিচালক পীযুষ দত্ত জানান, বাংলাদেশে আমদানির ৯০ শতাংশ পণ্যই আসে জলপথে। দেশের প্রায় ৭২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র জলসীমা আছে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা তাই একের পর এক জাহাজ নামিয়েছে সমুদ্রপথে। কিন্তু বিএসসি পারেনি। ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরুর সময় বিএসসির নিজস্ব কোনো জাহাজ ছিল না। প্রতিষ্ঠার চার মাস পর ‘বাংলার দূত’ নামে প্রথম জাহাজ যুক্ত হয়। ১৯৭৪ সাল নাগাদ বিএসসির বহরে ১৪টি জাহাজ যুক্ত হয়। এরপর ১৯৮২ সালে ২৭টি এবং পরের আট বছরে বিএসসির বহরে মোট জাহাজের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮। তবে লাইফটাইম শেষ হয়ে যাওয়ায় ২৫টি জাহাজ পরিত্যক্ত হয়। কমতে কমতে সেটি নেমে আসে দুটিতে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তিনটি করে মোট ছয়টি জাহাজ কেনা হয়। এরপর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আটে। সর্বশেষ যুক্ত হওয়া ছয়টি জাহাজের তিনটি ‘অয়েল কেমিক্যাল ট্যাঙ্কার’ ও তিনটি ‘বাল্ক ক্যারিয়ার’। বহরে সর্বশেষ যুক্ত হওয়া জাহাজটির নাম এমটি ‘বাংলার অগ্রগতি’।

যেভাবে লাভে ফিরেছে বিএসসি
এক যুগ আগেও বিএসসি ছিল লোকসানি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ লোকসান গুনে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে। ওই সময় লোকসান হয় ১০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তবে এক যুগ ধরে লাভে আছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন জাহাজ যুক্ত হওয়ার পরও করোনাভাইরাসের কারণে ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে লাভ প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে লাভ ছিল ৪১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে ৭২ কোটি ২ লাখ টাকা লাভ হয়। গত অর্থবছরেই লাভ ২২৫ কোটি টাকা ছাড়ায়। তবে গত ১৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম লাভ হয়েছিল ২০১২-১৩ অর্থবছরে। ওই বছর মোট ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা লাভ করে তারা। আগামী অর্থবছর মুনাফা আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কেন পিছিয়ে ছিল
সময়ের হাত ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পাল্টে যায়। পরিবর্তন আসে কাঠামোতেও। কিন্তু বিএসসি এ ক্ষেত্রে ছিল ব্যতিক্রম। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও আগে এর ওপর ছিল না নজর। ছিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দূরদর্শিতার অভাব। নৌবাণিজ্য ক্রমে বাড়বে– চরম এ সত্যটিও উপলব্ধি করতে পারেননি দায়িত্বশীলরা। তাই দীর্ঘ সময় লোকসান গুনেছে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এ সংস্থাটি। এখন সেই চিত্র কিছুটা পাল্টেছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত আসছে। পরিকল্পনায়ও এসেছে নতুনত্ব। করোনাকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনলেও বিএসসি ছিল ব্যতিক্রম। তাদের রিজার্ভেও আছে পর্যাপ্ত অর্থ। আছে নিয়মিত আয়ও। তাই জাহাজ তুলনামূলক কম থাকলেও লাভের ঘরে আছে বিএসসি। নতুন চারটি জাহাজ যুক্ত হলে প্রতিষ্ঠানটি হারানো জৌলুস ফিরে পাবে বলে মনে করছেন অনেকে।

এসেছে ক্ষতিপূরণের ২৩৭ কোটি টাকা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধির ক্ষতিপূরণ নিয়ে শঙ্কা ছিল বিএসসির কর্মকর্তাদের মনে। অতীতে এমন ঘটনা মোকাবিলার কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় ক্ষতিপূরণ দাবি করা সব টাকা পাবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে বিএসসি। ক্ষতিপূরণের অর্থ এরই মধ্যে জমা হয়েছে তাদের অ্যাকাউন্টে। বিদেশি বীমা কোম্পানির  কাছ থেকে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৩৭ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেছে। সাধারণ বীমা করপোরেশন হয়ে বিএসসির হিসাবে জমা হওয়া টাকার কিছু অংশ নিজেদের নতুন ও পুরোনো জাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যয় করবে তারা। আর কিছু অংশ ব্যয় করবে আয় বাড়ানোর খাতে। খুলনা ও চট্টগ্রামে বিএসসির কেনা নিজস্ব কিছু জায়গা রয়েছে। এসব জায়গায় বাণিজ্যিক স্থাপনা করলে বছর শেষে নিয়মিত ভালো আয় জমা হবে বিএসসির অ্যাকাউন্টে। টাকা খরচের আগে তাই অগ্রাধিকার খাত ঠিক করছে বিএসসি।

পরিকল্পনায় আছে নতুন চার জাহাজ
বিএসসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আছে নতুন চারটি জাহাজ। এসব জাহাজ জিটুজি পদ্ধতিতে সংগ্রহ করবে বিএসসি। চীন সরকারের ঋণ সহায়তায় এ চারটি জাহাজ কেনা হবে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) গত ২৮ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বিএসসি। গত ১৩ মার্চ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুটি ক্রুড অয়েলের মাদার ট্যাঙ্কার কেনা হবে, যার প্রতিটি ১ লাখ ১৪ হাজার ডিডব্লিউসম্পন্ন। আর দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার সংগ্রহ করা হবে, যার প্রতিটি ৮০ হাজার ডিডব্লিউসম্পন্ন। এ জন্য মোট ২৪ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার ব্যয় হবে। দুটি ক্রুড অয়েল মাদার ট্যাঙ্কার কিনতে ব্যয় হবে ১৫ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। আর দুটি মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার কেনায় ব্যয় হবে ৮ কোটি ৯৯ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার।

আরও পড়ুন

×