ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস

সভ্যতার নথি

সভ্যতার নথি
×

অলংকরণ: বোরহান আজাদ

জাহ্‌রা জাহান পার্লিয়া

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৩ | ১১:৫৪

১৮৩৭ সালে ফরাসি উদ্ভাবক জোসেফ নিসফোর নিপস ও লুই জ্যাক মান্দে দাগেরে আবিষ্কার করেন দাগেরেটাইপ ফটোগ্রাফিক সিস্টেম। ১৮৩৯ সালের ১৯ আগস্ট ফরাসি সরকার এটিকে স্বীকৃতি দেয়। ১৮৪ বছর আগের এই দিনটিকে স্মরণ করার জন্য প্রতি বছর ১৯ আগস্ট ‘বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস’ উদযাপন করা হয়।

গ্যা  লারি কায়াতে শিল্পী কামরুজ্জামান সাগরের লিথোগ্রাফির ওপর প্রদর্শনী চলছে। খবরটা চোখে পড়তেই আগ্রহী হয়ে উঠলাম। সেই লিথোগ্রাফি, যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সফলতা না পাওয়ায় জোসেফ নিসফোর নিপসের হাতে জন্ম হয়েছিল ফটোগ্রাফি বা আলোকচিত্রশিল্পের।

ফটোগ্রাফি একটি বিজ্ঞাননির্ভর শিল্পমাধ্যম। এর জন্মের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ফটোগ্রাফির সূচনা কবে হয়েছিল, সেই প্রশ্নে একটু পেছাতে হয় আমাদের। আনুমানিক ৪০০ খ্রিষ্টপূর্বে চীনা দার্শনিক মোজি ও ৩৩০ খ্রিষ্টপূর্বে এরিস্টটলের লেখায় ক্যামেরা অবস্কিউরার ধারণা পাওয়া যায়। ১০২১ সালে বিজ্ঞানী ইবনে আল হাইতাম আলোক বিজ্ঞানের ওপর ‘কিতাব আল মানাজির’ নামে সাত খণ্ডের বই লেখেন এবং তাঁর লেখায়ও তিনি ক্যামেরার ধারণা দেন। ক্যামেরা অবস্কিউরার (যা পিনহোল ক্যামেরা নামেও পরিচিত) মাধ্যমেই প্রথম ফটোগ্রাফির সূচনা।

১৫০০ শতাব্দীতে শিল্পীরা যে ছবি আঁকতেন, সেগুলোর একাধিক প্রতিলিপি তৈরির ইচ্ছা থেকে সে সময়ে ক্যামেরা আবিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৫৫০ সালে জার্মান বিজ্ঞানী জিরোলামো কারদানো সর্বপ্রথম ক্যামেরায় লেন্স সংযোজন করেন। যদিও এ ক্যামেরা দিয়ে হাতে আঁকা ছবির প্রতিলিপি করা হতো। কোনো ছবি তোলা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

প্রথম স্থায়ী ফটোগ্রাফি হিসেবে স্বীকৃত যাঁর ছবি, তাঁর নাম জোসেফ নিসফোর নিপস। ফরাসি এ বিজ্ঞানী ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক। একইসঙ্গে ছিলেন লিথোগ্রাফির প্রতি আগ্রহী। কিন্তু ছবি আঁকার ক্ষমতা না থাকায় তিনি কাজ শুরু করেন অপটিক্যাল ইমেজ নিয়ে। ১৮১৩ সালের দিকে নিপস চিত্রকর্মের প্রতিলিপি তৈরির অন্য পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। নিপস এমন এক প্রলেপ আবিষ্কার করলেন, যা ছাপচিত্রের ওপর প্রয়োগ করলে সেখানে স্বচ্ছ ছবি ফুটে উঠত। তিনি ১৮২২ সাল থেকে ক্যামেরা অবস্কিউরার মাধ্যমে ছবি তোলার চেষ্টা করে যেতে থাকেন এবং ১৮২৬ সালে একটি ছবি (ভিউ ফ্রম দ্য উইন্ডো অ্যাট লা গ্রাস) তোলেন, যা প্রথম স্থায়ী ফটোগ্রাফি হিসেবে স্বীকৃত। ছবি তোলার এ পদ্ধতির নাম তিনি দেন হেলিওগ্রাফি (of the sun)। এ পদ্ধতিতে ক্যামেরা অবস্কিউরায় নকশা করা বিটুমিন আবৃত ধাতব প্লেট রাখলে নির্দিষ্ট বস্তু থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে প্লেটের যে অংশে পড়বে, সে অংশে বিক্রিয়া হবে। বাকি অংশ অন্ধকার থাকবে। প্লেটটি রাসায়নিক দ্রবণে ধুয়ে নিলে সাদাকালো ছবি পাওয়া যেত। হেলিওগ্রাফির কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল।

এক, এ পদ্ধতিতে ছবি তুলতে প্রায় আট ঘণ্টা সময় লাগত। দুই, ছবি খুব দ্রুত মুছে যেত। মূলত তাঁর এ আবিষ্কার একটি আঁকা ছবির মুদ্রণ তৈরি করতে পারত কিন্তু কোনো বস্তুর ছবি তুলতে সক্ষম ছিল না। যদিও নিসফর নিপস তাঁর উদ্ভাবনে সন্তুষ্ট ছিলেন এবং তা প্রচারের চেষ্টায় ১৮২৭ সালে ইংল্যান্ডে রয়্যাল সোসাইটির দ্বারস্থ হন। তিনি তাঁর আবিষ্কৃত রহস্য বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচনে একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। রয়্যাল সোসাইটির নিয়ম অনুযায়ী কোনো উদ্ভাবনের রহস্য উন্মোচন না করলে সে আবিষ্কারের কোনো প্রচারণা তারা করবে না। সুতরাং কিছুটা আশাহত হয়েই নিপস ফ্রান্সে ফিরে যান। ইংল্যান্ডে যাওয়ার পথে প্যারিসে নিপসের সঙ্গে পরিচয় হয় লুই জ্যাক মান্দে দাগেরের। দাগেরে ছিলেন একই সঙ্গে চিত্রশিল্পী এবং থিয়েটার সজ্জাশিল্পী। আলো নিয়ে কাজ করার দারুণ প্রতিভা ছিল তাঁর। আলোর নানা সজ্জার মাধ্যমে একই দৃশ্যে রাত ও দিনের আবহ তৈরি করতে পারতেন তিনি। চার্লস ম্যারি বাওটনের সঙ্গে একত্র হয়ে ‘ডায়োরামা’ নামে এক প্রদর্শনী চালু করেন, যেখানে জীবন্তসদৃশ (Animated) নানা উপকরণ আলোর নানারকম সজ্জায় প্রদর্শিত হয়। আলো দিয়ে বিভ্রম তৈরি অসামান্য ক্ষমতা ডায়োরামাকে বিশাল সাফল্য এনে দেয়। দু’জন একই সঙ্গে ইংল্যান্ড ভ্রমণ করেন। নিপস ডায়োরামার প্রতি তাঁর মুগ্ধতা প্রকাশ করেন দাগেরের কাছে। দাগেরেও নিপসের কাছ থেকে ক্যামেরা অবস্কিউরার সাহায্যে ছবি দেখানোর বুদ্ধি পেয়ে যান।

ক্যামেরার পেছনে ফসফরেসেন্ট পাউডার রেখে তার ওপর ছবি রাখেন। কয়েক ঘণ্টার জন্য তা অভিক্ষিপ্ত হবে। আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাবে। ১৮২৮-এর ফেব্রুয়ারিতে ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পথে তাদের আবার দেখা হয়। তারা নিজেদের পরিকল্পনা বিনিময় করেন। ১৮২৯ সালে নিপস দাগেরেকে হেলিওগ্রাফি নিয়ে একত্রে কাজ করার প্রস্তাব দেন। সে বছর ডিসেম্বরে তাদের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৮৩২ সালে তারা ফিসোটোটাইপ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। ১৮৩৩ সালে নিপস মৃত্যুবরণ করলে দাগেরে একা গবেষণা চালিয়ে যান। ১৮৩৭ সালে অল্প সময়ে ছবি তোলার অসাধারণ এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এ ছবির স্থায়িত্বও ছিল বেশি। তিনি নিজের নামে এ পদ্ধতির নাম দেন ‘দাগেরেটাইপ’। এ পদ্ধতিতে সিলভারের প্রলেপ যুক্ত কপার পাতের ওপর আয়োডিনের প্রলেপ দিয়ে একটি আলোকসংবেদী প্লেট তৈরি করা হয়। তা ক্যামেরায় স্থাপন করে অল্প সময় এক্সপোজ করে সিলভার ক্লোরাইডের দ্রবণে ধুয়ে নিলে ছবি তৈরি হয়ে যেত। ১৮৩৯ সালের ৯ জানুয়ারি ফ্রেঞ্চ আকাদেমি অব সায়েন্স দাগেরে পদ্ধতির কথা ঘোষণা করেন। একই বছর ১৯ আগস্ট ফরাসি সরকার এ পদ্ধতির স্বত্ব কিনে নেয় এবং এ আবিষ্কার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। নিপস ও দাগেরে যখন ফটোগ্রাফি নিয়ে গবেষণা করছেন, সে সময়ে ১৮৩০-এর দিকে একই বিষয়ে কাজ করছিলেন উইলিয়াম হেনরি ফক্স ট্যালবট। ট্যালবট ছিলেন একজন ইংরেজ বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক এবং আলোকচিত্রের একজন পথিকৃৎ। দাগেরের পদ্ধতির সমস্যা ছিল এর থেকে মূল ছবির কোনো কপি তৈরি করা যেত না। এর সমাধান ছিল ট্যালবটের পদ্ধতিতে। তিনি সর্বপ্রথম সল্ট প্রিন্টিং আবিষ্কার করেন। লবণযুক্ত দ্রবণে সিলভার নাইট্রেট মিশিয়ে সাধারণ কাগজকে এমনভাবে সংবেদনশীল করে তৈরি করেন, যা সূর্যের আলোতে গাঢ় হয়ে যাবে।

এভাবে ট্যালবট আবিষ্কার করেন পৃথিবীর প্রথম নেগেটিভ। এর থেকে কনট্যাক্ট প্রিন্টের মাধ্যমে ছবির কপি করা যেত। এ পদ্ধতিকেই ক্যালোটাইপ বলা হয়। এর আগে নেগেটিভ বলে কোনো ব্যাপার ছিল না। সরাসরি পজিটিভই তৈরি হতো। ট্যালবট এ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন ১৮৪০ সালে এবং পেটেন্ট লাভ করেন ১৮৪১ সালে। লাগাতার গবেষণার ফলে আধুনিক ক্যামেরার জন্ম। প্রায় ২০০ বছরে ক্যামেরার যে উন্নয়ন তা আমাদের বিস্মিত করে। মানুষ এখন মুহূর্তেই ছবি তুলতে পারে। বর্তমানে আলোকচিত্রে এসেছে নানারকম ধারা। কেউ ছবি তুলছেন সুন্দর মুহূর্ত ধরে রাখতে, কেউ শিল্প হিসেবে ফুটিয়ে তুলতে, কেউ করছেন ডকুমেন্টেশন। ছবি তোলা হয়েছিল বলে আমরা সে সময়ের সমাজ, মানুষ, সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাই। এখন যেই সেলফি ভীষণ জনপ্রিয় একটি ধারা, জানতে পারি এই সেলফি প্রথম তোলা হয়েছিল ১৮৩৯ সালে। তুলেছিলেন ফিলাডেলফিয়ার রবার্ট কর্নেলিয়াস। জানতে পারি ১৮৪৭ সালে গল্পের বইয়ের ইলাস্ট্রেশনে ব্যবহৃত হয়েছিল ফটোগ্রাফি। ওয়াল্টার স্কটের ‘দ্য অ্যান্টিকুয়ারি’ গল্পের জন্য হিল ও অ্যাডামসন সে ছবি তুলেছিলেন। ১৯০৫ সালে হেমেন্দ্রমোহন বসুর তোলা বঙ্গভঙ্গ রদের ছবি পাই আমরা। পাই ক্রিকেটের প্রথম ছবি। তাই শুধু নান্দনিকতার শর্তেই নয়, সভ্যতার নথি হিসেবেও আলোকচিত্র গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৪ বছর আগে দাগেরেটাইপ ফটোগ্রাফির মুক্তির কথা স্মরণ করে ১৯ আগস্টকে বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। অস্ট্রেলীয় আলোকচিত্রী কোরসকে সারাবিশ্বের আলোকচিত্রীদের একত্র করতে আয়োজন করেন ‘ওয়ার্ল্ড ফটো ডে’। এ উপলক্ষে ২০১০ সালের ১৯ আগস্ট সর্বপ্রথম অনলাইন গ্যালারি খোলা হয়, যেখানে ১০০টি দেশের ২৭০ জন আলোকচিত্রী তাদের ছবি গ্যালারিতে উপস্থাপন করেন এবং এ অনুষ্ঠানেই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব আলোকচিত্র দিবস উদযাপিত হয়। মানুষের অসামান্য আগ্রহের কারণে ২০২২ সালে দুই সপ্তাহব্যাপী ‘বিশ্ব আলোকচিত্র সপ্তাহ’ উদযাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। আলোকচিত্র দিবসকে মাঝে রেখে এর আগের ও পরের সপ্তাহ দুটি এর অন্তর্গত।

প্রতি বছর আলোকচিত্র দিবসে বিভিন্ন দেশ, দেশের নানা প্রতিষ্ঠান একটি প্রসঙ্গ বা বিষয় নির্বাচন করে। আলোকচিত্রীরা সে বিষয়ের ওপর ছবি তোলেন কিংবা বক্তব্য রাখেন। একেক দেশ একেকভাবে এ দিনটি উদযাপন করে। এ বছর বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি আয়োজন করেছে র‍্যালি ও ফটো আউটিং, চট্টগ্রামের দৃশ্যকলা ফটো আড্ডা, নারায়ণগঞ্জ ফটোগ্রাফিক ক্লাব ফটো সাফারি, ভয়েস অব হিউম্যানিটি অ্যান্ড হোপে থাকছে মুক্ত আলোচনা। বেগার্ট ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি, পাঠশালা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আলোকচিত্রচক্রে থাকছে বিশেষ আয়োজন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন ফটোগ্রাফিক সোসাইটির রয়েছে নানা কর্মসূচি।

আরও পড়ুন

×