‘ইশারাই আমার মাতৃভাষা’
আফরোজা খাতুন মুক্তা
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৩ | ০৫:০০
মানুষের ভাব বিনিময়, হৃদয়ের নিগূঢ় অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হলো ভাষা অর্থাৎ কথা। কিন্তু সমাজে এমনও মানুষ আছেন, যারা কথা বলতে পারেন না; এমনকি শুনতেও পারেন না। ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের অন্যতম মাধ্যম ইশারা। আফরোজা খাতুন মুক্তার পরিবারটিও এমনই।
চট্টগ্রামের মেয়ে আফরোজা খাতুন মুক্তার পরিবারে মা-বাবা, ছোট ভাই শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী। মুক্তা ছোটবেলা থেকেই তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইশারায় যোগাযোগ করে আসছেন। সময়ের বিবর্তনে নিত্যদিনের অভিব্যক্তি প্রকাশের সেই ভাষা হয়ে গেল তাঁর রুটি-রুজি অর্থাৎ আয়ের মাধ্যম। এখন তিনি কাজ করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে সাংকেতিক ভাষায় সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে। সেখানে চার বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার ১৪ নম্বর শিকারপুর ইউনিয়নের কুয়াইশ গ্রামে জন্ম নেওয়া সেই মেয়েটির বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংবাদ উপস্থাপিকা হিসেবে কাজ করতে আসা পথটি খুব মসৃণ ছিল না। পেরোতে হয়েছে ঘাত-প্রতিঘাত। জন্ম থেকেই যিনি জ্বলছেন, তিনি কি আর প্রতিকূলতা ভয় পান? বরং নানা ঝড় পেরিয়ে তিনি খুঁজে বের করেন সাফল্যের পথ।
মুক্তা ইশারা ভাষায় সংবাদ পাঠের জন্য নেন প্রশিক্ষণ। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি বাবার সঙ্গে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় যেতাম। সেখানে দেখতাম আমার মা-বাবার মতো অনেকেই কথা বলতে পারেন না। আমি বাবার বন্ধুদের বিভিন্ন সমস্যার কথা ইশারা ভাষার দোভাষী হিসেবে তাদের পরিবারের কাছে তুলে ধরতাম। তখন আমি বুঝতে পারলাম এ ভাষার মাধ্যমে আমি এই জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করতে পারব। ছোটবেলা থেকে চট্টগ্রামের শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম সাংকেতিক বা ইশারা ভাষার মাধ্যমে অনেক দূর পর্যন্ত যাওয়ার। আমার বাবার স্বপ্ন ছিল, আমি যেন বড় হয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ইশারা ভাষার সংবাদ উপস্থাপক হতে পারি।’
মুক্তা ও তাঁর বাবার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেয়েছে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সংবাদ উপস্থাপনার পাশাপাশি সেখানকার লাইব্রেরি ও আর্কাইভ ডিপার্টমেন্টে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করছেন। ২০২১ সাল থেকে এ দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এ ছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইশারা ভাষায় উপস্থাপনা করেন তিনি। মুক্তা বলেন, ‘অনেকেই ভাবেন আমি হয়তো কথা বলতে পারি না। তবে যখন কারও সঙ্গে পরিচয় হয়, এই বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে আমি তাদের বুঝিয়ে বলি। অনেক সময় বিভিন্ন প্রোগ্রামের মঞ্চে ইশারা ভাষায় ইন্টারপ্রেট করার পর প্রোগ্রাম শেষে যখন নিচে নামি, তখন আমাকে কথা বলতে দেখে অবাক হন।’
মুক্তা ‘সোসাইটি অব দ্য ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজার্স’ নামক একটি সংগঠনে ইশারা ভাষার দোভাষী হিসেবে আছেন। সেখানে ইশারা ভাষার প্রশিক্ষণ দেন। এর বাইরেও বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে অন্যদের ইশারা ভাষার প্রশিক্ষণ দেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও, বিভিন্ন সংস্থার প্রোগ্রামে ইশারা ভাষার দোভাষী হিসেবেও কাজ করেন তিনি। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করেন মুক্তা। তিনি বলেন, ‘আমি জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা সনদ মডিউল ১, ২ এবং ৩-এ ইশারা ভাষার দোভাষী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।’
মুক্তা আরও বলেন, ‘আমার পরিবারে আমার মা-বাবা, ভাই ছাড়াও আমার বড় মামা এবং ছোট মামার দুই সন্তান কথা বলতে এবং শুনতে পান না। যেহেতু মা-বাবা কথা বলতে পারেন না, আমি বড় হয়েছি আমার নানাবাড়িতে, হাটহাজারীর শিকারপুর ইউনিয়নের কুয়াইশ গ্রামে। নানা-নানি, মামা-মামিদের কাছ থেকেই আমার বাংলা ভাষা শেখা। আমার বেড়ে ওঠার পেছনে আমার নানাবাড়ির মানুষের অবদান অনেক।’
ইশারা মুক্তার প্রথম ভাষা। তবে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে এ ভাষার ওপর প্রশিক্ষণ অর্জন করে সনদ নিতে হয়। সেই সনদ দিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করা যায়। মুক্তা বলেন, ‘আমি ইশারা ভাষার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম প্রথম ২০১৮ সালে টার্নিং পয়েন্ট ফাউন্ডেশন থেকে। এরপর আমি সোসাইটি অব দ্য ডেফ অ্যান্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজার্স (এসডিএসএল) থেকে প্রশিক্ষণ নিই। যেটি আসলে শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজ করে এবং একজন মানুষকে ইশারা ভাষার দোভাষী হিসেবে তৈরি হতে সাহায্য করে।’
মুক্তার ভাষ্যমতে, ইশারা ভাষা শেখার পেছনে তাঁর গুরু বা আইডল মা-বাবা। কেননা, এই ভাষা জন্মের পর থেকে শিখিয়েছেন তারা। মুক্তা তাঁর ছোট ভাইয়ের কাছ থেকেও প্রতিনিয়ত ইশারা ভাষায় নতুন নতুন শব্দ শেখেন। ইশারা ভাষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মুক্তা বলেন, এই ভাষার প্রয়োজনীয়তা অনেক। কারণ আমরা যারা কথা বলতে পারি, কানে শুনতে পাই আমাদের মনের ইচ্ছা, চাওয়া-পাওয়া, সমস্যার কথাগুলো সবাইকে বোঝাতে পারি। যারা ইশারায় কথা বলেন, তারা মনের কথা, ইচ্ছা, সমস্যাগুলো সহজে বলতে পারেন না। সমস্যা সমাধানের জন্য কোথাও গেলে তারা ইশারার মাধ্যমে বোঝাতে পারেন না। শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছাড়াও যারা কথা বলতে এবং শুনতে পান তাদের সবার ইশারা ভাষা জানা উচিত। যেন শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীদের ব্যথা, আনন্দ, দুঃখ, সমস্যার কথাগুলো সহজেই বুঝতে পারেন। একইসঙ্গে সেসব জনগোষ্ঠীকে সমাজের সবার সঙ্গে সমানভাবে চলার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।
বর্তমানে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন জিও, এনজিও এবং সংস্থাগুলোয় ইশারা ভাষার দোভাষী রাখা হয়। বিদেশে ইশারা ভাষার চাহিদা এবং গুরুত্ব ব্যাপক। দেশেও এ ইশারা ভাষা নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে বলে জানান মুক্তা।
- বিষয় :
- আফরোজা খাতুন মুক্তা
- ইশারা
- ভাষা
- বাকপ্রতিবন্ধী
