এক হামে হাজার শিশুর মৃত্যু
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে হাম ও এ রোগের উপসর্গে মৃত্যু এক হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার দুই। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯০২ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের।
দেশের ইতিহাসে হামে এত মানুষের মৃত্যু আগে ঘটেনি। এমনকি গত প্রায় আট বছরেও হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০ ছাড়ায়নি। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য ছিল। চলতি বছর হাম নির্মূলের সনদ পাওয়ার কথা থাকলেও উল্টো এ রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ১১৯ শিশু। একই সময়ে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৬৯ জনের। এ নিয়ে চলতি বছর হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে মোট রোগী দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে রোগতত্ত্ববিদরা বলছেন, হাম যে কোনো বয়সী মানুষের হতে পারে; শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে হামে মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ বছরের পরিস্থিতির সঙ্গে আগের কয়েক বছরের চিত্রের বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২৫ সালে দেশে নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৩২ জন। ২০২৪ সালে ২৪৭, ২০২৩ সালে ২৮২ এবং ২০২২ সালে ৩১১ জন রোগী শনাক্ত হয়।
জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, অন্য দেশের তুলনায় এবার বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ বেশি। এত বিপুলসংখ্যক শিশু বিপদে পড়েছে। এখন ছয় মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকার ব্যবস্থা করতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু আক্রান্তদের চিকিৎসা নয়, ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা জরুরি। টিকার সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপরও জোর দিতে হবে।
সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে একসময় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। নিয়মিত টিকাদান ও জাতীয় পর্যায়ের বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বড় প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদানের কভারেজ কমে যাওয়াকে বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী তিন কোটি ৪২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ওই ক্যাম্পেইনে ১০০ শতাংশ কভারেজ অর্জিত হয়। ২০১০ সালের ফলোআপ ক্যাম্পেইনে ৯ মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক কোটি ৮১ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সেবারও কভারেজ ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪ সালে দেশজুড়ে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী পাঁচ কোটি ২৭ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ওই ক্যাম্পেইনে কভারেজ ১০০ শতাংশের বেশি হয়। তবে ২০২০-২১ সালের পর আর কোনো বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন হয়নি। একই সময়ে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজও কমতে থাকে। ২০২৫ সালে তা নেমে আসে মাত্র ৫৯ শতাংশে।
টিকা সংগ্রহেও জটিলতা
টিকা সংগ্রহেও গত বছর জটিলতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া গত ৫ মে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে ইউনিসেফ বারবার উদ্বেগ জানিয়েছিল। ইউনিসেফের শঙ্কা ছিল, সংগ্রহ পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে টিকা সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হতে পারে। এ কারণে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।

গণটিকাদানেও বাদ পড়েছে লাখো শিশু
চলতি বছরের শুরুতে হাম সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও মার্চ থেকে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এরপর এপ্রিল থেকে মে মাসজুড়ে বিশেষ গণটিকাদান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এই কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রেও বড়সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। হামের টিকা দেওয়ার জন্য ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে লক্ষ্যমাত্রায় রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে টিকা পেয়েছে প্রায় এক কোটি ৩৯ লাখ শিশু। অর্থাৎ প্রায় ৪০ লাখ শিশু টিকা পায়নি।
অন্যদিকে গত জুনে একই বয়সী প্রায় দুই কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। ফলে হাম টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বাস্তবে দেশে থাকা একই বয়সী শিশুর সংখ্যার মধ্যেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।
রোগতত্ত্ববিদ ও জাতীয় হাম-রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে হাম সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রায় সব বয়সী শিশুর মধ্যে সংক্রমণ রয়েছে। ছয় থেকে ৯ মাস, ৯ মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর– সব বয়সী শিশুর মধ্যে হাম পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও সংক্রমণ কিছুটা কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। একবার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। শিশুদের হাম থেকে রক্ষা করতে হাসপাতালের শয্যা, আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রতিরোধের দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কার্যকর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে টিকার বিকল্প এখনও চিকিৎসাবিজ্ঞানের জানা নেই।