ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘মানুষের আস্থাই এসএমসির সাফল্যের মূল কারণ’

খাওয়ার স্যালাইন উৎপাদনে বিশ্বসেরা

‘মানুষের আস্থাই এসএমসির সাফল্যের মূল কারণ’
×

এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েফ নাসির

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:৩৭ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:৫৭

এক সময় ডায়রিয়া ও পানিস্বল্পতায় বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার ছিল উদ্বেগজনক। সেই পরিস্থিতি বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে প্যাকেটজাত ওরস্যালাইন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে উৎপাদন ও সরবরাহের ধারাবাহিকতায় এখন এসএমসি (সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি) বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওআরএস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বছরে প্রায় ১২০ কোটি প্যাকেট উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশের বাজারের ৯০ শতাংশের বেশি চাহিদা পূরণ করছে। তবে কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও নকল পণ্যের বিস্তার এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েফ নাসির। সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন এসএমসির সাফল্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তবিবুর রহমান।

সমকাল: বাংলাদেশে ওরস্যালাইনের গুরুত্ব কীভাবে দেখেন?
সায়েফ নাসির: আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে ডায়রিয়া ও পানিস্বল্পতায় শিশু মৃত্যুর হার ছিল অত্যন্ত বেশি। তখন ‘এক মুঠো গুড়, এক চিমটি লবণ’ দিয়ে ঘরে স্যালাইন তৈরির প্রচারণা চালানো হলেও সেটির কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। বিশুদ্ধ পানি ও সঠিক অনুপাত নিশ্চিত করা কঠিন ছিল, আবার প্রয়োজনীয় উপকরণও সব সময় সবার কাছে থাকত না। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে আইসিডিডিআর,বি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও এসএমসি যৌথভাবে প্যাকেটজাত ওরস্যালাইন বাজারে আনে। এটি সহজে ব্যবহার করা যায় এবং তিন বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।

সমকাল: শুরুতে সাধারণ মানুষের কাছে এটি কীভাবে পৌঁছেছে?
সায়েফ নাসির: প্রথম দিকে সচেতনতা কম ছিল, বাজারেও সহজলভ্য ছিল না। সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ওরস্যালাইন পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিই। শুরুতে টোল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন হতো। পরে চাহিদা বাড়ায় এবং মান বজায় রাখতে ২০০৪ সালে নিজস্ব কারখানা স্থাপন করি। আজ ওরস্যালাইনের যাত্রা ৪০ বছরের বেশি। বর্তমানে এসএমসি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওআরএস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান।

সমকাল: উৎপাদন সক্ষমতা ও বাজারে অবস্থান এখন কোথায়?
সায়েফ নাসির: ডব্লিউএইচওর নির্ধারিত মান অনুসরণ করে আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওআরএস প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। আমাদের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২০ কোটি প্যাকেট। দেশীয় বাজারে আমাদের অংশীদারিত্ব ৯০ শতাংশেরও বেশি।

সমকাল: স্যালাইনের ব্যবহার কি এখন বদলে গেছে?
সায়েফ নাসির: অবশ্যই। আগে ডায়রিয়া ও কলেরা মোকাবিলাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। এখন বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের উন্নতির ফলে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে স্যালাইন মূলত শরীরের পানিশূন্যতা ও খনিজের ঘাটতি পূরণে ব্যবহৃত হয়। কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা প্রচণ্ড গরমে কাজ করা মানুষ এবং খেলোয়াড়দের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

সমকাল: আগামী কয়েক বছরের পরিকল্পনা কী?
সায়েফ নাসির: আমাদের লক্ষ্য, গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে পণ্যটিকে আরও ব্যবহারবান্ধব করা। আগে হাতে গুলে স্যালাইন তৈরি করতে হতো, এখন সহজেই পানিতে মিশে যায়। নতুন প্রজন্মের চাহিদা মাথায় রেখে আরও সহজ ও দ্রুত ব্যবহারযোগ্য সংস্করণ নিয়ে গবেষণা চলছে।

সমকাল: নকল ও ভেজাল পণ্য ঠেকাতে কী করছেন?
সায়েফ নাসির: মানুষের আস্থাই এসএমসির ৫০ বছরের সাফল্যের ভিত্তি। উৎপাদনে আমরা আধুনিক অটোমেশন ও উচ্চগতির প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। বাজারে একই ধরনের নামে কিছু ভেজাল পণ্য পাওয়া যায়। আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নিয়মিত তদারকি করেন। ভেজাল পণ্যের তথ্য পেলে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ভবিষ্যতে আরও নিরাপদ ও নকল-প্রতিরোধী প্যাকেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

সমকাল: এসএমসির আয় কীভাবে ব্যয় করা হয়?
সায়েফ নাসির: এসএমসি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। স্যালাইন, কনডম, পিল, স্যানিটারি ন্যাপকিন বা ডায়াপার বিক্রি থেকে যে আয় হয়, তা কোনো ব্যক্তি বা শেয়ারহোল্ডারের কাছে যায় না। পুরো অর্থ জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন বিনিয়োগে ব্যয় করা হয়। তাই এসএমসির পণ্য কেনা মানে পরোক্ষভাবে দেশের মানুষের কল্যাণে অবদান রাখা।

সমকাল: এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
সায়েফ নাসির: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ওরস্যালাইনের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক মানের ফয়েল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও কর। আমাদের উচ্চগতির উৎপাদন লাইনের জন্য এই ফয়েল আমদানি ছাড়া বিকল্প নেই। অন্যদিকে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ বিল এবং কাঁচামালের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ হওয়ায় ওরস্যালাইনের দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। এতে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। শুল্ক কমানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আবেদন করেছি। সরকারের নীতিগত সহায়তা পেলে পণ্যের মান ও সরবরাহ আরও ভালোভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
 

আরও পড়ুন

×