এলপিজি আমদানি করতে চান শিল্পমালিকরা
তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (ছবি-সংগৃহীত)
হাসনাইন ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৪ | আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্যাসের তীব্র সংকটে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প জ্বালানি হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন শিল্পমালিকরা। বাজার থেকে এলপিজি কেনার পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে সরাসরি আমদানি করতে চান অনেক উদ্যোক্তা। এরই মধ্যে কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগে আবেদন করেছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় বয়লার ও উৎপাদনযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদন বন্ধ রাখার চেয়ে বেশি ব্যয়ে এলপিজি ব্যবহার করে কারখানা সচল রাখার চেষ্টা করছেন তারা।
দেশে এলপিজির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানিও বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৮৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৫৭ টনে। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি উৎপাদন ছিল ২০ হাজার ৩৮৬ টন। সরকারি উৎপাদন ও বেসরকারি আমদানি মিলিয়ে দেশে এলপিজির সরবরাহ ছিল প্রায় ১৫ লাখ ৯৪ হাজার টন। মোট সরবরাহে আমদানির অংশ ছিল ৯৭ দশমিক ১৪ শতাংশ।
আমদানির বড় অংশ কয়েকটি কোম্পানির হাতে
দেশে এলপিজি আমদানিতে অনুমোদিত কোম্পানি ২৩টি। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭টি প্রতিষ্ঠান আমদানি করেছে। ওই বছর মোট ১৭ লাখ ৬ হাজার ২০০ টন এলপিজি আমদানি করে প্রতিষ্ঠানগুলো।
এর মধ্যে শীর্ষ ১০ কোম্পানি এনেছে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩৫০ টন, অর্থাৎ মোট আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ। এর মধ্যে শীর্ষে ছিল ওমেরা– ২ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৩ টন। এরপর মেঘনা ফ্রেশ ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪১ টন, যমুনা স্পেসটেক ২ লাখ ১৬ হাজার ৩০৯ টন এবং বিএম এনার্জি ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫২০ টন আমদানি করে।
গ্যাসের ঘাটতিই বাড়াচ্ছে এলপিজির ব্যবহার
এলপিজির ব্যবহার বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ গ্যাস সংকট। গত ২৮ আগস্ট রাত ৮টার হিসাবে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ১৬১ কোটি ৪০ লাখ এবং এলএনজি থেকে ৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ১৪২ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট।
গ্যাসের এ ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গত ২৯ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার হিসাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫৫১ মেগাওয়াট। উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ১৯ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৫৩২ মেগাওয়াট।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে শিল্প উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ উৎপাদন কমাচ্ছেন, আবার কেউ বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করছেন। বিটিএমএর পরিচালক ও লিটল গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় শিল্পকারখানাগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এ সংকট আরও বাড়বে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের পরিবর্তে ডিজেল বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করায় শুধু জ্বালানি ব্যয়ই বাড়ছে না; উৎপাদনের সামগ্রিক খরচও বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এটি দেশের শিল্পকে আরও চাপে ফেলছে।
টেক্সটাইল, ডাইং, সিরামিক, কাচ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ ও ধাতুশিল্পের বিভিন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এলপিজি ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে বয়লার, চুল্লি, ড্রায়ার ও তাপ উৎপাদনের কাজে এর ব্যবহার বাড়ছে।
পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেলেও ট্যাঙ্কে মজুত এলপিজি ব্যবহার করা যায়। এ কারণে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোর কাছে এটি একটি বিকল্প হয়ে উঠছে।
আমদানিতে শিল্পমালিকদের যুক্তি
নিজেদের জন্য আমদানিতে শিল্পমালিকদের যুক্তি, বাজারের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে এলপিজি কেনার বদলে বড় পরিমাণে সরাসরি আমদানি করতে পারলে খরচ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি মজুত রাখায় সরবরাহের অনিশ্চয়তাও কমবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মো. মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানার মালিক নিজেরা এলপিজি আমদানি করে কারখানা চালু রাখতে চান। এ জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। সরকার সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এলপিজিকে শিল্প কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনার সুযোগ দেওয়ায় সরাসরি আমদানির অর্থায়নও তুলনামূলক সহজ হয়েছে। ফলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ব্যবহারের জন্য এলপিজি আমদানির বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছে।
তবে সরাসরি আমদানির জন্য কারখানায় বড় স্টোরেজ ট্যাঙ্ক, ভ্যাপোরাইজার, পাইপলাইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য শুরুতেই বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। ওমেরা এলপিজির মালিকানা প্রতিষ্ঠান ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেই এলপিজি আমদানি করতে পারবে না। এ জন্য বিভিন্ন লাইসেন্সের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এগুলো বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। তিনি বলেন, হাইড্রোকার্বন ইউনিট থেকে এলপিজি আমদানির বিষয়ে একটি নীতিমালা করা হয়েছে। কীভাবে এবং কারা এলপিজি আমদানি করতে পারবে, সে বিষয়ে নীতিমালায় বিস্তারিত রয়েছে।
আজম জে চৌধুরী বলেন, বেসরকারি শিল্পকারখানার মালিকরা এলপিজি আমদানি করতে চাইলে সরকার তাদের এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি সরবরাহ করা সম্ভব। আলাদা করে শিল্পমালিকদের এলপিজি আমদানি না করলেও হবে।
এক আমদানিনির্ভরতা থেকে আরেক নির্ভরতা
দেশীয় উৎপাদন খুবই কম হওয়ায় এলপিজির ব্যবহার যত বাড়বে, আমদানির ওপর নির্ভরতাও তত বাড়বে। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ এলপিজি সরবরাহ হচ্ছে, তার প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আনা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়বে দেশের বাজারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সংকটে তাৎক্ষণিক বিকল্প হিসেবে এলপিজি শিল্পকে স্বস্তি দিতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটিও এলএনজির মতো আরেকটি আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে দেশকে নিয়ে যাবে।
- বিষয় :
- এলপিজি
- গ্যাস সংকট
- শিল্পকারখানা
- জ্বালানি সংকট