কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না গ্রাহক
মেসবাহুল হক
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৫
তিন বছর পূর্ণ করেছে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি। শুরু থেকেই আস্থাহীনতা, বিতর্ক ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে নানা বাধার মুখে পড়ে এ উদ্যোগ। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কর্মসূচিটি সংকটে পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া এ কর্মসূচি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পরবর্তী সরকার অব্যাহত রাখবে কিনা, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের পর বিএনপি সরকারও কর্মসূচিটি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জনপ্রিয় করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বিধিমালা পরিবর্তন করে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোসহ নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত। তারপরও কাঙ্ক্ষিত হারে গ্রাহক বাড়ছে না। তবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে কিছু মানুষ এ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন।
রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আর্থিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি ও তাঁর স্ত্রী দুজনই ‘প্রগতি’ স্কিমে নিবন্ধন করেন। মাসে দুই হাজার টাকা করে চাঁদাও জমা দিতে থাকেন। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তাঁরা আর চাঁদা দেননি। আরও কয়েকজন গ্রাহক প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। কারও কারও চাঁদা বন্ধের কারণ ব্যাংকে ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র ও ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগের তুলনায় সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির আর্থিক সুবিধা কম থাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে পুরোপুরি প্রস্তুতি না নিয়েই জনতুষ্টির উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু করে আওয়ামী লীগ সরকার। এত বড় কর্মযজ্ঞ শুরুর আগে যে ধরনের প্রস্তুতি ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহের কারণে যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়াই কর্মসূচি শুরুর বিষয়ে সম্মত হন তৎকালীন অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার।
কর্মকর্তাদের মতে, যথাযথ প্রস্তুতি ও বিশ্লেষণের অভাবে চাঁদা ও পেনশন সুবিধার কাঠামো ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশেষ করে পেনশন দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির হার যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। সেদিন থেকেই বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্য ‘প্রগতি’, স্বকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য ‘সুরক্ষা’, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘প্রবাসী’ এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ‘সমতা’— এই চার স্কিম সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কর্মসূচিতে কার্যত স্থবিরতা নেমে আসে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ৭৩ হাজারে।
অন্তর্বর্তী সরকার কর্মসূচিটি অব্যাহত রাখলেও গ্রাহক তেমন বাড়েনি। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরের বেশি সময়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার নতুন গ্রাহক যুক্ত হন। এরপর গত সাড়ে তিন মাসে অর্থাৎ গতকাল (১৬ আগস্ট) পর্যন্ত আরও প্রায় দেড় হাজারের বেশি নতুন গ্রাহক যুক্ত হয়েছেন। ফলে গতকাল পর্যন্ত চার স্কিমে মোট গ্রাহক দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৭৯ হাজার ৬০ জন। তারা মোট ২৮১ কোটি ৫০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন। এ তহবিলের ৩০৭ কোটি টাকার কিছু বেশি সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান সমকালকে বলেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কর্মসূচি নিয়ে আস্থাহীনতার কারণে বড় একটি অংশ কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বেসরকারি খাতের কর্মীদের বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘পেনশন ফান্ড’ গঠন অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। এ কারণে বর্তমান সরকার সর্বজনীন পেনশনের আওতায় থাকা বেসরকারি কর্মীদের অবসরের সময় জমাকৃত মোট অর্থের ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে দেওয়াসহ বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করেছে।
তিনি বলেন, কর্মসূচিকে আরও গতিশীল করতে এবং জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় এক হাজার ২২৭ কোটি টাকা সহজশর্তের ঋণে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। দ্রুত ডিপিপি প্রণয়ন করে অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।
এদিকে উদ্যোগ নিয়েও সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এ কর্মসূচিতে আনা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সর্বজনীন পেনশনের আদলে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন সুবিধা দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকারও একই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করবে। তবে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত সময়ে এটি কার্যকর করা হবে।
তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারের প্রতিটি থেকে অন্তত একজন সদস্যকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণে এখন পর্যন্ত যতটুকু সাড়া পাওয়া গেছে, তাতে তিনি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আশাবাদী।