বিক্ষোভে উত্তাল শ্রীলঙ্কা
অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগ দাবিতে শুক্রবার রাজধানী কলম্বোর পার্লামেন্ট ভবনের সামনে বিক্ষোভের পর অবস্থান নেন প্রতিবাদকারীরা : এএফপি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ মে ২০২২ | ২২:৫২
কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্য শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ও সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ধর্মঘট শুরু করেছেন দেশটির সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীরা। এ কারণে গতকাল শুক্রবার দেশটির দোকানপাট, স্কুল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। এদিন শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে সংসদ ভবনের বাইরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস এবং জলকামান ব্যবহার করছে। দেশের অর্থনৈতিক সংকটে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে প্রায় পাঁচ হাজার প্রতিবাদকারী সংসদ ভবনের সামনে জড়ো হয়েছিলেন। শহরের অন্যত্রও হাজার হাজার মানুষ এই বিক্ষোভে অংশ নেন। খবর বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্সের।
কলম্বো থেকে বিবিসি সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন, ধর্মঘটের কারণে দোকানপাট বন্ধ রয়েছে ও আন্দোলনকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখান। দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে ও তার ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের পদত্যাগ দাবি করে আসছেন। রাজাপাকসের পরিবার বেশ কয়েক বছর ধরে এই দ্বীপরাষ্ট্রটি শাসন করে আসছে।
ভারত মহাসাগরের এ দ্বীপরাষ্ট্রটি করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বাড়তে থাকা তেলের মূল্য ও প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের সরকারের কর হ্রাসের সিদ্ধান্তে মারাত্মক অর্থ সংকটে পড়ে। চলতি সপ্তাহে দেশটির অর্থমন্ত্রী আলি সাবরি জানিয়েছেন, ব্যবহার করার মতো মাত্র পাঁচ কোটি ডলার রিজার্ভ আছে শ্রীলঙ্কার।
ব্যাপক মুদ্রানীতি ও আমদানিকৃত খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের সংকটের কারণে দ্বীপটিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে, যা কখনও কখনও সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। শুক্রবার দেশজুড়ে প্রধান শহরগুলোর দোকানপাট বন্ধ ছিল। বাস, ট্রেনের চালক ও শ্রমিকরা ধর্মঘটে যোগ দেওয়ায় গণপরিবহন বন্ধ আছে। এতে যাত্রীরা বিভিন্ন জায়গায় আটকা পড়ে আছেন। শুক্রবার সকালে বাণিজ্যিক রাজধানী কলম্বোর প্রধান রেলস্টেশন বন্ধ ছিল। নিকটবর্তী টার্মিনাল থেকে শুধু কিছু সরকারি বাস চলাচল করেছে।
দেশটির স্বাস্থ্যকর্মীরাও ধর্মঘটে যোগ দিয়েছেন। তবে হাসপাতালগুলোতে জরুরি পরিষেবা অব্যাহত ছিল। দেশটির পার্লামেন্টের দিকে যাওয়া প্রধান সড়কের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী ও অন্যান্য বিক্ষোভকারী বৃহস্পতিবার থেকে অবস্থান নিয়ে আছেন। এক প্রতিবাদকারী পুর্নিমা মুহানদিরাম বলেন, আমরা রাজনৈতিক মিথ্যাচারে অসুস্থ ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, তাই এখানে অবস্থান নিয়েছি। আমরা প্রেসিডেন্ট ও তার সরকারকে বাড়ি পাঠাতে চাই।
বিরোধীদলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা শুক্রবার পার্লামেন্টে বলেছেন, বিরোধী দল আগামী সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে চায়। তবে রাজাপাকসে পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন, পরিবর্তে তার নেতৃত্বে ঐক্য সরকার গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এদিকে, সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের ছেলে নামাল রাজাপাকসে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের আরও প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। বিবিসির সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে নমাল বলেন, করোনা মহামারি শ্রীলঙ্কার সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে, যার ফলে খাদ্য, জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে।
বর্তমান সংকট সামাল দিতে দেশটির প্রয়োজন বৈদেশিক মুদ্রা। সেজন্য অনেকের দ্বারস্থ হচ্ছে দেশটি। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে আর্থিক সহায়তা হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে ৬০ কোটি ডলার দিতে রাজি হয়েছে বিশ্ব ব্যাংক। এই সহায়তার ৪০ কোটি ডলার বিশ্বব্যাংক 'দ্রুতই' ছাড় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের দপ্তর। সেখানে বলা হয়, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও বলেছে বিশ্বব্যাংক। এ মাসের শুরুতে আর্থিক সহায়তা পেতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে শ্রীলঙ্কা। এ ছাড়া তারা আরও কয়েকটি দেশ ও বহুজাতিক সংস্থার কাছেও আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে দেশটি। ভারত এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কাকে ১৯০ কোটি ডলার দিয়েছে। জ্বালানিসহ নিত্যপণ্য আমদানির জন্য আরও ১৫০ কোটি ডলারের তহবিল পেতে দিল্লির সঙ্গে কথা বলছে কলম্বো।
চীনের কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলারের একটি সিন্ডিকেটেড ঋণ পাওয়ার জন্যও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি। শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রী বলেন, কলম্বো এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছেও সহায়তা চাইতে পারে। অর্থনৈতিক সংকট ও বিদেশি মুদ্রার মজুত তলানিতে থাকায় এ মাসের শুরুতে কিছু বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত ঘোষণা করে দেশটি। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জ্বালানি, রান্নার গ্যাস ও ওষুধ আমদানির মতো অপরিহার্য নিত্যপণ্য আমদানির ব্যয় মেটাতে ঋণের কিস্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
