শ্বেতাঙ্গের শহরে কৃষ্ণাঙ্গ চেভি
বাবার সঙ্গে চেভি ওকলি-বিবিসি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২০ | ২২:৩৫
‘আমি মিশ্র বর্ণের মানুষ। আমার ভেতরেই যেন দুটি সত্ত্বা। আমার যে অংশ সাদা, তাকে আমি শেখাতে পারি। আর আমার যে কালো অংশ, তাকে আমি আরও বলিষ্ঠ হতে বলতে পারি, যাতে আমি সবার সমান হয়ে উঠি। আমি যে দুই বর্ণের মানুষকেই সাহায্য করতে পারি, সেটা আমি জানি।’
এভাবেই নিজের মূল্যায়ন করেন শতভাগ শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত শহরে বেড়ে ওঠা কৃষ্ণাঙ্গ নারী চেভি ওকলি।
চেভি ওকলির জন্ম লন্ডনে, কিন্তু বেড়ে উঠেছেন কর্নওয়ালে। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবা-মার সঙ্গে প্রায় শতভাগ শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত এক শহরে আসার আগে পর্যন্ত কখনো বর্ণবৈষম্যের শিকার হননি তিনি। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমের কর্নওয়ালের জনসংখ্যার ৯৮ দশমিক ২ ভাগই হচ্ছে জাতিগত শ্বেতাঙ্গ, জনসংখ্যার দিক থেকে এটি ইংল্যান্ডের সবচেয়ে কম বৈচিত্র্যময় কাউন্টি। মানে হলো একঘেয়ে এক শ্বেতাঙ্গে ভরা কাউন্টি।
কর্নওয়ালে আসার পর অভূতপূর্ব এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন চেভি। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, হঠাৎ শুনতে পেলেন এমন এক মন্তব্য, যা আগে আর কখনো শোনেননি। প্রথম প্রথম বুঝতে না পারলেও শিগগিরই অনুভব করলেন, তার গায়ের বাদামি রঙের কারণেই এসব মন্তব্য ছুটে আসে তার দিকে। চেভির গায়ের রঙ বাদামি হওয়ার কারণ, তার মা একজন শ্বেতাঙ্গ আর বাবা জ্যামাইকান কৃষ্ণাঙ্গ। চেভি বলেন, ‘ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাওয়ার আগে আমি কোনদিন বর্ণবাদের শিকার হইনি।’
চেভি যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে, তখন কর্নওয়ালে যায় তার পরিবার। তখনকার একটি ঘটনার কথা বললেন, স্কুলে একটা ছেলে তাকে ‘ব্রাউনি’ বলে ডাকা শুরু করল। ডাকটা শুনলে তিনি বিরক্ত বোধ করতেন। ছেলেটি তাকে আরও বেশি করে ওই নামে ডেকে খেপাত।
যতই বড় হচ্ছিলেন, ততই বিচ্ছিন্ন ও একা হয়ে পড়ছিলেন চেভি। কোনো দল বা গ্রুপের সঙ্গে মিশতে পারতেন না। কারণ তাকে সহজভাবে নিতে চাইত না শ্বেতাঙ্গ ছেলেমেয়েরা। তিনি বারবার বন্ধু পাল্টাচ্ছিলেন। আর স্কুলে যাওয়াটাও উপভোগ করতে পারছিলেন না।
মাধ্যমিক স্কুলে চেভিদের কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাস পড়ানো হতো না। বয়স যখন ১৪ বা ১৫, তখন একবার শুধু দাস ব্যবসা নিয়ে কিছু পড়ানো হয়েছিল। এটা পড়ানোর সময় শিক্ষক হঠাৎ পুরো ক্লাশের সামনে তাকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করলেন, ক্লাশে তুমিই একমাত্র কালো ছাত্রী, এটা কেমন লাগে তোমার?
চেভি বললেন, আমার ইচ্ছে হচ্ছিল লজ্জায় মাটিরভেতর ঢুকে যেতে। মনে হয়েছির, কালো হয়ে আমি বিরাট অন্যায় করে ফেলেছি। মনে হচ্ছিল আমাকে যেন ক্লাসে সবার সামনে উলঙ্গ করে ফেলা হয়েছে।
রাস্তায় চলার সময় পাশ দিয়ে ছুটে চলা গাড়ির ভেতর থেকে ছুটে আসা বর্ণবাদী গালি ‘নিগার’ শব্দটা বুলেটের মতো এসে লেগেছে তার কানে, মনে, পুরো চেতনায়। ভীষণ অপমান লাগত চেভির।
কর্নওয়াল খুব সুন্দর জায়গা। সেখানে অনেক সুন্দর মানুষও আছে যাদের মনে কারো প্রতি কোন ঘৃণা-বিদ্বেষ নেই, সব মানুষকে যারা সাদরে গ্রহণ করে। কিন্তু তারপরও মন-মানসিকতায় কর্নওয়াল এখনো বেশ পশ্চাৎপদ, এখনো আগের যুগে পড়ে আছে।
এটা যখন চলতেই থাকে, তখন ধীরে ধীরে এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেন চেভি। লোকজনের কথায় আর প্রতিবাদ করতেন না, মনঃক্ষুণ্ন হতেন না। এমনকী চরম অপমানকর ‘নিগার’ শব্দটিতেও আপত্তি করতেন না তিনি। হাসিমুখে শুনতেন। ভাবতেন, এসব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামালে তারা তাকে গ্রহণ করবে না।
কিন্তু এখন নিজের ভুল বুঝতে পারছেন ২০ বছরের চেভি। বললেন, ‘এখন যখন আমি পেছন ফিরে তাকাই, আমার মনে হয়, আমি যদি আরেকটু শক্ত হতে পারতাম! যদি আমার নিজের জায়গায় শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম! আমার মনে হয়, আমি তখন ভয় পেতাম যে আমাকে হয়তো কেউ মেনে নেবে না, কেউ আমার বন্ধু হবে না। সেজন্যেই এসব বর্ণবাদী কথাবার্তা আমি মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি যে ধরনের মানুষ, আমি যদি ছোটবেলায় সেরকমটি হতাম, কখনোই আমি আমার সঙ্গে কাউকে এরকম ব্যবহার করতে দিতাম না।’
তিনি বলেন, একটা জিনিস করার চেষ্টা করি। সেটা হলো, যখন কেউ আমার সঙ্গে বর্ণবাদী আচরণ করে, তখন রেগে না যাওয়া। কারণ এরা আসলে এই বর্ণবাদই শিখেছে। এটি তাদের জন্মগত নয়। তাদের সঠিক শিক্ষা দিয়ে এটি থেকে মুক্ত করা সম্ভব। এটা তাদের বোঝানোর ব্যাপার।
আমি যে দুই বর্ণের মানুষকেই সাহায্য করতে পারি, সেটা আমি জানি। সূত্র : বিবিসি
- বিষয় :
- চেভি ওকলি
- কৃষ্ণাঙ্গ
- বর্ণবৈষম্য