সমকাল এক্সপ্লেইনার
বাঙালি মুসলমান ‘তাড়াতে’ বিজেপি কেন বেপরোয়া
সম্প্রতি ভারতের আহমেদাবাদে নথিবিহীন বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। ছবি: এইচআরডব্লিউ এর ওয়েবসাইট
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৫ | ১৭:৫০ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৫ | ১৯:২৯
- বাঙালি মুসলমানদের আটকের ঘটনা শুরু কাশ্মীরে হামলার পর থেকে
- ‘পুশ-ইন’ করা ব্যক্তিদের অনেকেই ভারতের নাগরিক
- বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ‘পুশ-ইন’ এর সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে
- বিতাড়নের কারণ হিসেবে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কথা উল্লেখ
বাঙালি মুসলমানদের আটক ও ‘পুশ আউট’ এর ঘটনা এরই মধ্যে ভারতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে (২০২৬) প্রচারের উপকরণ হয়েছে। এ ইস্যুকে ঘিরে আজ ২৭ জুলাই থেকে ‘ভাষা আন্দোলনের’ ডাক দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। আর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বলছে, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে ‘সার্কাস’ শুরু করেছে কংগ্রেস।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) গত ২৩ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনেও বাঙালি মুসলমানদের বিতাড়নের পেছনে ক্ষমতাসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিতাড়িত ভুক্তভোগীদের আটক করা হয়েছে বিজেপি শাসিত গুজরাট, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, ওডিশা, আসাম ও উত্তর প্রদেশ থেকে। যাদের মধ্যে শত শত বাঙালি মুসলমান বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। মূলত, পশ্চিমবঙ্গ থেকে তারা বিভিন্ন সময় কাজের জন্য বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে গিয়েছিলেন।
হঠাৎ ধরপাকড়
ভারতে বাঙালি মুসলমানদের আটকের ঘটনা শুরু হয়েছে গত এপ্রিলে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে। পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলা হয় গত ২২ এপ্রিল। জবাবে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পাল্টা অভিযান শুরু করে ৭ মে। দেশটির গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ অভিযানের আওতায় পাকিস্তানে হামলার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে শুরু হয় ‘অবৈধ অভিবাসী’দের ধরপাকড়। বাঙালি মুসলমানদের আটকের পেছনে ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি’কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট বলছে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই ভারতে মুসলমানরা নিপীড়ন, বৈষম্য ও পক্ষপাতমূলক আচরণের শিকার হয়ে আসছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মুসলমান। অভ্যন্তরীণ সংকটের সময় যাদেরকে প্রায়ই ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদরা ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে আখ্যা দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে গণগ্রেপ্তার, সম্পত্তি ধ্বংস এবং পুলিশি সহিংসতার ঘটনা শুরু হয়।
বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’
ভারত থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ‘পুশ-ইন’ বা বিতাড়িত করা মানুষের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে। যাদের বেশিরভাগই নিম্নআয়ের মুসলমান। এইচআরডব্লিউ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ জুন পর্যন্ত বিতাড়িত করা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ জনকে। যাদের মধ্যে শত শত মুসলিম ভারতেরই বাসিন্দা।
এইচআরডব্লিউ’র এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেছেন, এই ধরপাকড়ের কারণ বৈষম্য উসকে দেওয়া। বিজেপি নির্বিচারে বাঙালি মুসলিমদের, এমনকি ভারতীয় নাগরিকদেরও দেশ থেকে বিতাড়িত করে বৈষম্যকে উসকে দিচ্ছে। অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করার যে দাবি ভারতীয় কর্তৃপক্ষ করছে, তা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ তারা আইনগত প্রক্রিয়া, সংবিধানিক অধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা দেখাচ্ছে না।
আইন কী বলে
ভারতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) পাস হয় ২০১৯ সালে। ‘ইন্ডিয়ান সিটিজেনশিপ অনলাইন পোর্টাল’ এর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের অধীনে ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার একটি বিশেষ বিধান আছে। এই বিধানটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য হবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সদস্যদের ক্ষেত্রে; যারা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন। এ আইনে মুসলিমদের কথা উল্লেখ নেই। ২০১৯ সালে পাস হলেও আইনটি কার্যকর হয় গত বছর। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলত আইন পাসের সময়ই মুসলমানদের একটা বড় অংশের মাঝে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। যদিও তখন এমন শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছিল বিজেপি।
সম্প্রতি ‘পুশ আউট’ বা বিতাড়িত করার ক্ষেত্রে আইন না মানা প্রসঙ্গে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন ভারতের মানবাধিকার আইনজীবী নন্দিতা হাসকার। দেশটির সংবিধানের বরাত তিনি বলেন, অনুচ্ছেদ-২১ ‘রাইট টু লাইফ’ বা জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের কথা উল্লেখ আছে। এ ছাড়া, অনুচ্ছেদ-১৪ তে আইনের চোখে সবার সমান অধিকার পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার এ দুটি মৌলিক অধিকারই লঙ্ঘন করছে।
গত ৯ জুন মহারাষ্ট্রের থানে জেলা থেকে আটক হন দুই নির্মাণ শ্রমিক মেহবুব শেখ ও শামীম খান। তাদের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। নাগরিকের আইনি অধিকার নিয়ে কাজ করা ফাউন্ডেশন আর্টিকেল-১৪ এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটকের সময় পুলিশকে মেহবুব ও শামীম আধার কার্ড (ভারতের ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি কর্তৃক ইস্যুকৃত), প্যান কার্ড (আয়কর দপ্তর কর্তৃক জারিকৃত) এবং ভোটার আইডি কার্ড (ভারতীয় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ইস্যুকৃত) দেখান। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা এসব নথিকে ভুয়া বলে দাবি করে তাদের ধরে নিয়ে যায়।
এইচআরডব্লিউও তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, নাগরিকত্বের দাবির যথাযথ যাচাই না করেই সীমান্তরক্ষী বাহিনী আটক ব্যক্তিদের বন্দুকের মুখে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কোনো আইনগত প্রক্রিয়া মানা হচ্ছে না। সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসনের মতে, বিজেপি সরকার মূলত রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য চেষ্টা করতে গিয়ে ভারতের নিপীড়িতদের আশ্রয় দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাসকে খণ্ডন করছে।
