ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

শুল্ক কমাতে ভারত ব্যর্থ হলো কেন, বিকল্প যা করছে

শুল্ক কমাতে ভারত ব্যর্থ হলো কেন, বিকল্প যা করছে
×

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৫ | ২০:৩২ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৫ | ১২:৩৮

২০২৫ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্র আসলে ভারতের কাছে থেকে কী চাইছে? কয়েক মাস আগেও এ প্রশ্নের উত্তর বেশ স্পষ্ট ছিল। চীনা প্রভাব কমাতে এশিয়ায় ভারতকে ঘনিষ্ঠ অংশীদার বানাতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রযুক্তি সরঞ্জাম বিনিময়ের মাধ্যমে সেটি বানিয়েছিলও। কিন্তু গত কয়েক মাসে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। 

সম্প্রতি একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সেটি হলো ‘পারপ্লেক্সড’। এ শব্দের বাংলা অর্থ দাঁড়ায় হতবুদ্ধি, কিংকর্তব্যবিমূঢ় বা হতভম্ব। এনডিটিভির ২১ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে বৈঠকের সময় এই শব্দ ব্যবহার করেন জয়শঙ্কর। বলেন, রাশিয়ার কাছে থেকে তেল কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে যুক্তি দিচ্ছে তাতে ভারত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছে।

কিন্তু ভারত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়ার পর্যায়ে কেন এলো? এমন পরিস্থিতি এড়াতে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, এবং কেন তা কাজ করলো না? 

নিউ ইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো প্রধান মুজিব মাশাল বলছেন, ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কারণ বুঝতে তিনি কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলাপ করেছেন। কিন্তু কেউই সুনির্দিষ্ট কারণ বলতে পারছেন না।

ভারতের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন তিনি দেশটির কৃষি বাজারে প্রবেশ করতে চান। কিন্তু কৃষির মতো খাতে ভারত সুরক্ষামূলক নীতি অবলম্বন করে। এ কারণে কিছুটা টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে বলে আগে থেকেই শঙ্কা ছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এক জনসভায় ঘোষণা দেন, তিনি ভারতের কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় পিছপা হবেন না। তবে ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য মোদি প্রশাসন একটি সমাধান বের করেছিল। সেটি হলো আরও বেশি আমেরিকান জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানি শুরু করা। যাতে বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা মেটে। কিন্তু পরে দেখা গেল ট্রাম্পের কাছে এটি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি।

ভারতের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক (২৫ শতাংশ) আরোপের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, এটি এড়াতে চাইলে নয়াদিল্লিকে মস্কোর কাছে থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন, তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে চান। ভারত তেল কেনায় রাশিয়া বিপুল অর্থ পাচ্ছে। রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতেই তিনি তেল কেনা বন্ধ চাচ্ছেন।  

বর্তমানে ভারত যে পরিমাণ তেল আমদানি করে সেটির এক তৃতীয়াংশই আসে রাশিয়া থেকে। যুদ্ধ শুরুর সময় এর পরিমাণ ছিল এক শতাংশেরও কম। মুজিব মাশাল লিখেছেন, এক্ষেত্রে ভারত তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারেনি। ট্রাম্প প্রশাসন যদি রুশ তেলের ক্রেতা দেশগুলোর ওপর মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি বাস্তবায়ন করত, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন রকম হতো। কিন্তু ওয়াশিংটন শুধু ভারতের ওপর মনোযোগ দিয়েছে। আর এ কারণেই বিভ্রান্তিকর নীতি তৈরি হয়েছে। ফলাফল- রাশিয়ার সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক চীন এখনও ছাড়মূল্যে তেল কিনছে। ভারত শুল্কের শাস্তি পেলেও তেল কেনার জন্য চীনের কিছু হয়নি।

হতভম্ব হওয়ার পর
শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার পর ভারত রাশিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়া সফর করেছেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বৈঠক করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। কয়েকদিনের মধ্যেই একটি সম্মেলনে যোগ দিতে নরেন্দ্র মোদি চীনে যাবেন। সেখানে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথাও আছে।

এরমধ্যেই গত মঙ্গলবার একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। এতে বলা হয়েছে, গত সোমবার ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে ভার্চুয়ালি বৈঠক হয়েছে। সেখানে কর্মকর্তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেছেন। একাধিক যৌথ কৌশলগত অগ্রাধিকারের বিষয়ে মতবিনিময় করেছেন। তারা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা (বেসামরিক পরমাণু নিরাপত্তা জোরদার), গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অনুসন্ধান, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন। উভয়পক্ষ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির আশা ব্যক্ত করেছেন। এর মধ্যে আছে, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা কমপ্যাক্ট (ক্যাটালাইজিং অপারচুনিটিস ফর মিলিটারি পার্টনারশিপ, এক্সেলেরেটেড কমার্স অ্যান্ড টেকনোলজি) এর আওতায় অর্জিত অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে কাজ চালিয়ে যাবেন। তারা কোয়াডের মাধ্যমে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিস্তৃতি ও গভীরতা বাড়ানোর বিষয়েও অঙ্গীকার হয়েছে। 

বিকল্প বাজারের খোঁজ
বুধবার থেকে ভারতের পণ্যের ওপর মোট ৫০ শতাংশ (পারস্পরিক ২৫ ও শাস্তিমূলক ২৫) শুল্ক কার্যকর হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে বলছে, এর জবাবে বিকল্প উদ্যোগ নিয়েছে মোদি প্রশাসন। সেটি হলো, যুক্তরাজ্য, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে টেক্সটাইল রপ্তানি বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রচার কর্মসূচি চালানো হবে।

৪০টি দেশের মধ্যে আরও আছে, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, কানাডা, মেক্সিকো, রাশিয়া, বেলজিয়াম, তুর্কিয়ে (তুরস্ক), সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়া।

সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দেশগুলো একসঙ্গে বছরে ৫৯০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের টেক্সটাইল ও পোশাক আমদানি করে। এখানেই ভারত তাদের বাজার অংশীদারত্ব বাড়ানোর সুযোগ দেখছে। বর্তমানে এসব দেশের সঙ্গে ভারতের অংশীদারত্ব মাত্র ৫-৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চলতি সপ্তাহেই ক্ষতিগ্রস্ত খাতের রপ্তানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করবে। এর মধ্যে আছে কেমিকেল ও গয়নার খাত। বৈঠকে শুল্কজনিত ধাক্কা কমানোর উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া, রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়েও কাজ হচ্ছে। আগামী ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ নিয়ে মন্ত্রণালয় ও অংশীদারদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা আছে।

আরও পড়ুন

×