ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

ভারতের চীনমুখিতার উত্তর আছে ডাস ক্যাপিটালে

ভারতের চীনমুখিতার উত্তর আছে ডাস ক্যাপিটালে
×

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: সংগৃহীত

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৫:১৩ | আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২২:০২

‘হৃদয়ের গভীর থেকে আমার বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন’— ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর দুপুর ২টা ১৬ মিনিটে নরেন্দ্র মোদির এই পোস্ট এখনো আছে তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে। তবে গঙ্গা ও মিশৌরির জল অনেক গড়িয়ে এই সম্পর্ক বৈরি হয়েছে। বরং গত কয়েকদিন ধরে বেশি আলোচনা হচ্ছে শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির বন্ধুত্ব নিয়ে।

ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চাপে আছে। অপরদিকে সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে। এ অবস্থায়ও ভারত চীনমুখি হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো- এই পরিবর্তনের পেছনে আসলে কী কাজ করছে। রাজনৈতিক কৌশল, ভূরাজনৈতিক চাপ, নাকি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। উত্তর খুঁজতে হলে ফিরতে হবে এক দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদের কাছে। নাম- কার্ল মার্ক্স। তাঁর লেখা বই ‘ডাস ক্যাপিটাল’ আমাদের দেখায়, বিশ্ব নেতাদের হাজারো ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছাপিয়ে কীভাবে পুঁজির যুক্তি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নীতিকেও নির্ধারণ করে দেয়।

মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে অর্থনীতি কতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেটি বুঝতে একটি বইয়ের আশ্রয় নেওয়া যাক। ‘কার্ল মার্ক্সের ডাস ক্যাপিটাল, পাঠ প্রবেশিকা’ শিরোনামের বইটির অনুবাদক জাভেদ হুসেন। এই বইয়ের মুখবন্ধে লেখা হয়েছে, অর্থনীতি বলতে যে আলাদা বিষয় পড়ানো হয়, মার্ক্স সে রকম কোনো কিছু মানতেন না। তিনি একে বলতেন ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’। মানুষ যা কিছু করে সবকিছুই এখানে উৎপাদন। এমনকি চিন্তাটাও উৎপাদনের অংশ। এর মধ্যে একজনের সঙ্গে আরেকজনের সম্পর্ক, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও পড়ে। সে হিসেবে পলিটিক্যাল ইকোনমিকে বলা যায় ‘সম্পর্ক শাস্ত্র’। 

কয়েক মাস আগেও সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নরেন্দ্র মোদির। ছবি: সংগৃহীত
 
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে এই সম্পর্ক উন্নয়নের একটি চিত্র দেখা গেল চীনে হওয়া সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে। এতে অংশ নেন ২০টির বেশি দেশের সরকার প্রধান, যাদের বেশিরভাগই মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার। সেখানে গ্লোবাল সাউথ (অপশ্চিমা উন্নয়নশীল দেশগুলো) নিয়ে নতুন ভূরাজনীতি উত্থানের আলাপও উঠেছে। মোদির সঙ্গে বৈঠকে শি বলেন, ‘বিশ্বের জনবহুল ও সভ্য দেশ হিসেবে চীন-ভারতের বন্ধু হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।’   

যুক্তরাষ্ট্র- চীন, মাঝে ভারত
স্নায়ু যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হয়। কোয়াড জোট, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা— সবকিছুই দুই দেশের মিত্রতার প্রমাণ। একইসঙ্গে কিছু সমস্যাও আছে। ওয়াশিংটন চায় ভারত যেন চীনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেয়। তবে দিল্লি সবসময় এটা মানতে চায়নি। এই টানাপোড়েনে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কারোপ। 

অন্যদিকে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও জটিল। সীমান্ত সংঘর্ষ, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সবই আছে। তবুও অর্থনীতির খাতিরে দুই দেশকে একে অপরের সঙ্গে লেনদেন করতে হচ্ছে। ভারত বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক উপাদান চীন থেকে আমদানি করে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা দুই দেশকে আলাদা হতে দিচ্ছে না।

এখানেই আসে মার্ক্সের ‘ডাস ক্যাপিটাল’। মার্ক্স বলেছেন, পুঁজিবাদে রাষ্ট্র বা ব্যক্তি যেই হোক, সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি হলো পুঁজি ও মুনাফা, যেখানে উৎপাদন সস্তা ও বাজার বড়, পুঁজি সেদিকেই যায়।

রাজনৈতিক আদর্শ যতই শক্তিশালী হোক, অর্থনীতি যদি অন্যদিকে ঠেলে দেয়, তখন রাষ্ট্রনীতিও বদলাতে বাধ্য হয়। আবার পুঁজির প্রবাহ কোনো সীমান্ত মানে না। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আসলে জাতীয় নীতিকেও প্রভাবিত করে।

অর্থ মানে না বন্ধুত্ব 
ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির মানবিক দৃষ্টিকোণের একটু বাইরে যাওয়া যাক। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থেকে ভারতের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দরকার। কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা আছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ দেখে আগে। অপরদিকে রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে চীন ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনা কাঁচামাল ছাড়া ভারতের শিল্পোৎপাদন টিকে রাখা কঠিন। ভারতের বিশাল বাজারও চীনের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।

তাহলে ভারতের জন্য বন্ধু হিসেবে কাকে বেছে নেওয়া বেশি কার্যকর? আবারও ফেরা যাক মার্ক্সের কথায়, তিনি বলেছেন— যেদিক বেশি মুনাফা এনে দেবে, পুঁজি সেদিকেই যাবে। আর রাষ্ট্র সে পথে হাঁটতে বাধ্য।

এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে শি জিনপিং, নরেন্দ্র মোদি ও ভ্লাদিমির পুতিনের কথোপকথনের একটি মুহুর্ত। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায়। মানে, কোনো ব্লকের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যেতে চায় না। কিন্তু মার্ক্সীয় ব্যাখ্যায় ফেললে, ভারতের এমন কথা বলা কেবলই 'রাজনৈতিক বয়ান'। বাস্তবে ভারত সেই নীতিই নিচ্ছে, যা তার অর্থনীতির জন্য বেশি লাভজনক। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরাগভাজন হওয়া থেকে চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বে জড়ানো- সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে পুঁজির যুক্তি।

গ্লোবাল সাউথ ও পুঁজির টানাপোড়েন
ভারত একা নয়, এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে যেসব দেশ অংশ নিয়েছে তাদের সবাই কমবেশি ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশও এই সমস্যার মুখোমুখি। 

তবে একটি প্রবণতা বেশ স্পষ্ট। সেটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের বিপরীতে গ্লোবাল সাউথকে চীন এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ‘প্রলোভন’ দিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় দেশগুলোর নীতি শেষ পর্যন্ত দ্রুত উন্নয়ন ও মুনাফাকেন্দ্রিক হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এটাই মার্ক্সের ডাস ক্যাপিটালের মূল বার্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

তাই যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চীনের দিকে ভারতের ঝুঁকে পড়াকে কূটনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে না দেখে বরং অর্থনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখাই শ্রেয়।

আরও পড়ুন

×