ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আবিষ্কার

২৬ কোটি বছর আগের তৃণভোজী প্রাণী

২৬ কোটি বছর আগের তৃণভোজী প্রাণী
×

খুঁজে পাওয়া ফসিলের কার্বন বিশ্লেষণে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আঁকা ‘ইনশানোসরাস অ্যাঙ্গাস্টাস’-এর ছবি- সংগৃহীত

 আসিফ মাহমুদ খান

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৯ | আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১০:১৪

চীনের উত্তরাঞ্চলে বেগুনি সিল্টস্টোনের স্তর খুঁড়ে পাওয়া গেছে ২৫ কোটি ৯০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করা রহস্যময় এক প্রাণীর জীবাশ্ম। প্রাগৈতিহাসিক বিশাল আকৃতির এই তৃণভোজী প্রাণীটির নাম রাখা হয়েছে ‘ইনশানোসরাস অ্যাঙ্গাস্টাস’। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাণহানি ঘটানো পার্মিয়ান যুগের ঠিক আগমুহূর্তে বসবাস করত এরা।

চীনের একাডেমি অব সায়েন্সেসের অন্তর্গত ইনস্টিটিউট অব ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি অ্যান্ড প্যালিও অ্যান্থ্রোপলজির গবেষক ড. জিয়ান ই ও ড. জুন লিউ দেশটির শানশি ও ইনার মঙ্গোলিয়া থেকে পাওয়া দুটি জীবাশ্ম পর্যালোচনা করেছেন। দুটি জীবাশ্মেই প্রায় সম্পূর্ণ খুলি থাকায় প্রাণীটির মাথার গঠন এবং মেরুদণ্ডের বড় একটি অংশ স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হয়েছে। এগুলোকে দুর্লভ সম্পদ বলছেন বিজ্ঞানীরা।
এই প্রাণীটি প্যারেয়াইসাউরিয়া গোষ্ঠীর অন্তর্গত, যাদের দেহ ছিল ভারী ও খাটো আকৃতির, ছোট লেজ ও হাড়ের গাঁটযুক্ত মাথা ছিল তাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অধিকাংশ প্যারিয়াসরের দৈর্ঘ্য হতো প্রায় ৮ ফুট, ওজন মোটামুটি বড় সাইজের একটি মহিষের সমান। পার্মিয়ান যুগে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে রাশিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উদ্ভিদভোজী খাদ্যচক্রের মূল স্তম্ভ ছিল এই প্রাণীরা।

চীনের নাওবাওগো ও সুনজিয়াগো অঞ্চল থেকে পাওয়া সিল্টস্টোন ও মাডস্টোনের স্তরে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগে বন্যায় চাপা পড়া মৃতদেহগুলো এত ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল যে, জীবাশ্মবিদরা এটির হাড়ের সূক্ষ্ম সংযোগস্থলগুলো পর্যন্ত বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন। এর মাধ্যমে গবেষকরা প্রথমবারের মতো কোনো চীনা প্যারিয়াসরের সম্পূর্ণ মাথা ও শরীরের জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করতে পারলেন।

ইনশানোসরাস অ্যাঙ্গাস্টাসের ফসিলের প্রতিটি হাড়ে হাড়ে রয়েছে নানা সংকেত। গবেষকরা প্রাণীটির নাসারন্ধ্রের হাড়ে একটি দ্বিখণ্ডিত অংশ ও খুলির পেছনের হাড়ে এক বিশেষ খাঁজ খুঁজে পেয়েছেন। এমন বৈশিষ্ট্য আগে কখনও একসঙ্গে দেখা যায়নি।

ফসিলের সিটিস্ক্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রজাতিটির চোয়ালের পুরোনো দাঁতের নিচে অপেক্ষমাণ নতুন দাঁতের কুঁড়ি রয়েছে, যা বর্তমানের টিকটিকির মতো সারাজীবন দাঁত পরিবর্তনের প্রমাণ। পাশাপাশি মাথার হাড়ে থাকা শিং আকৃতির গাঁটগুলোর ভেতরের রক্তনালিও শনাক্ত করা গেছে; যা সম্ভবত প্রজননের মৌসুমে বা প্রজাতি শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

এই আবিষ্কার শুধু অতীত জানার জন্যই নয়, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও দেয়। পার্মিয়ান যুগের শেষে সাইবেরিয়ায় ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড ছড়িয়ে দেয়; যার ফলে সমুদ্রের উষ্ণতা ১৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর ফলেই ঘটে সেই মহাপ্রাণহানি; যাতে সে সময়ের ৯০ শতাংশ সামুদ্রিক ও ৭০ শতাংশ স্থলচর প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এই ঘটনাগুলোর আদ্যোপান্ত ও জীববৈচিত্র্য পরিবর্তনের ধরন বুঝতে প্রতিটি নতুন আবিষ্কৃত প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ইনশানোসরাস অ্যাঙ্গাস্টাসের মতো তৃণভোজী প্রাণীরা উদ্ভিদ উৎপাদনের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত চাপ সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।

চলমান গবেষণার পরবর্তী ধাপে এই জীবাশ্ম স্তরের ওপরের অংশে খোঁজ চালাবেন বিজ্ঞানীরা; যেখানে হয়তো পার্মিয়ান যুগের শেষ দিকে বিলুপ্ত প্রাণীদের চিহ্ন বা ট্রায়াসিক যুগের সূচনাপর্বে বেঁচে যাওয়া প্রাণীদের জীবাশ্ম মিলতে পারে। পরবর্তীকালে ড্রোন প্রযুক্তি দিয়ে ভূখণ্ডটির মানচিত্র তৈরি ও খননকাজের পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদের। যদি এসব কোনো ফসিলের হাড়ে এখনও সামান্য কোলাজেন টিকে থাকে, তবে তা দিয়ে এসব প্রাণীর মৌসুমি খাদ্যাভ্যাস বা পানির সংকট-সংক্রান্ত তথ্যও পাওয়া যেতে পারে।

ইনশানোসরাস অ্যাঙ্গাস্টাসের সদ্য পাওয়া এই ফসিল আমাদের জানায় এক বিলুপ্তপ্রায় বিশ্বের গল্প; যেখানে প্রকৃতির প্রতিকূলতায় টিকে থাকার সংগ্রাম ছিল প্রবল। আজকের বিশ্বে জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, এই ইতিহাস যেন নতুন করে বলছে, ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছানোর আগে প্রকৃতি আমাদের বহুভাবে সংকেত পাঠায়। 
সূত্র-আর্থ ডটকম

আরও পড়ুন

×