প্রয়াণ
প্রাণী-মানুষের সেতুবন্ধনের রূপকার জেন গুডঅল
জেন গুডঅলের পর্যবেক্ষণ মানুষ ও শিম্পাঞ্জির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উন্মোচনে সহায়তা করেছে- সংগৃহীত
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৩ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ১০:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিম্পাঞ্জিদের চোখে চোখ রেখে তিনি দেখেছিলেন প্রকৃতির বিস্ময়কর রূপ। কখনও ঘন জঙ্গলে লাঠি হাতে একটি শিম্পাঞ্জি পোকা বের করছে, আবার কখনও শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধনে বাধা তাদের সামাজিক জীবন। এসব পর্যবেক্ষণই পাল্টে দেয় বিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণা। মানুষ ছাড়াও প্রাণী যে যন্ত্র ব্যবহার করতে পারে, জটিল সমাজ গড়ে তুলতে পারে— এই বিপ্লবী আবিষ্কারের পেছনে ছিলেন ড. জেন গুডঅল।
বিশ্বখ্যাত এই প্রাণিবিদ, নৃতত্ত্ববিদ ও সংরক্ষণকর্মী সারাজীবন ব্যয় করেছেন শিম্পাঞ্জি এবং প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর অধ্যয়ন ও সুরক্ষায়। তিনি মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে নতুন এক সেতুবন্ধন গড়ে তোলেন।
১৯৩৪ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া ছোট্ট মেয়ে জেনের হাতে যখন ছিল টারজানের গল্প, তখনই বোনা হচ্ছিল প্রাণীর প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণের বীজ। পরে তানজানিয়ার জঙ্গলে দীর্ঘ গবেষণা তাঁকে এনে দেয় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এটি শুধু বিজ্ঞানকেই আলোড়িত করেনি, সাধারণ মানুষের মনেও প্রাণীদের প্রতি এক ভিন্ন উপলব্ধির জন্ম দিয়েছে। তাঁর লেখা বই, জনসচেতনতা তৈরির বক্তৃতা কিংবা শিম্পাঞ্জি ফ্লোর মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সংবাদপত্রে প্রকাশিত ব্যতিক্রমী শোকবার্তা– সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি মানবতার দায়বদ্ধতার প্রতীক।
বিশ্বখ্যাত এই প্রাণিবিদ গত বুধবার ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন। জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এ তথ্য জানায়। পোস্টে বলা হয়, গুডঅল বক্তৃতা দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া সফর করছিলেন। সেখানেই তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়।
পোস্টে আরও বলা হয়, একজন ইথোলজিস্ট (প্রাণীর আচরণবিজ্ঞানী) হিসেবে গুডঅলের গবেষণালব্ধ আবিষ্কারগুলো বিজ্ঞানের রূপান্তরে ভূমিকা রেখেছে।
বিবিসি জানিয়েছে, তিনি তানজানিয়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশে মুক্ত জীবন কাটানো শিম্পাঞ্জিগুলোর ওপর ১৯৬০ সালে গবেষণা শুরু করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ মানুষ ও শিম্পাঞ্জির মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উন্মোচনে সহায়তা করেছে। গুডঅলই প্রথম কোনো প্রাণীকে যন্ত্র ব্যবহার করতে দেখেন। একটি পুরুষ শিম্পাঞ্জি লাঠি দিয়ে মাটির ঢিবি থেকে পোকা বের করছিল। তার আগ পর্যন্ত ধারণা ছিল, যন্ত্র ব্যবহারের মতো যথেষ্ট বুদ্ধি কেবল মানুষেরই আছে।
তাঁর গবেষণা শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৬৫ সালে তিনি ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’-এর প্রচ্ছদে উঠে আসেন। সেখানে তিনি শিম্পাঞ্জিদের আবেগ ও সামাজিক জীবনের দিকগুলো তুলে ধরেন। গুডঅল দেখান, এই প্রাণীরা শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন গড়ে তোলে এবং অঞ্চল দখল ঘিরে যুদ্ধেও লিপ্ত হয়।
তাঁর কোনো স্নাতক ডিগ্রি না থাকলেও নিজের গবেষণার ওপর ভর করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ২০০৩ সালে ডেম উপাধি পান এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল ফ্রিডম মেডাল লাভ করেন।
তাঁর জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৭ সালে, যা শিম্পাঞ্জিদের সুরক্ষায় কাজ করে। পাশাপাশি প্রাণী ও পরিবেশের কল্যাণে কাজ করা প্রকল্পকে সহায়তা করে। ২০০২ সালে গুডঅল জাতিসংঘের শান্তিদূত হন। তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছে, বিজ্ঞানী, সংরক্ষণবাদী ও জাতিসংঘের শান্তিদূত হিসেবে তিনি এই গ্রহ, এর প্রতিটি জীবের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন। মানবতা ও প্রকৃতির জন্য অসাধারণ উত্তরাধিকার রেখে গেছেন তিনি।
তাঁর বন্ধু, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এক শোকবার্তায় বলেছেন, ‘প্রকৃতি হারাল তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠস্বর, রেখে গেল আমাদের হৃদয়ে গভীর শূন্যতা। তাঁর কাজ পৃথিবীতে তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতির ওপরও প্রভাব বিস্তার করে যাবে।’
- বিষয় :
- প্রাণী
