গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা
আটক অধিকারকর্মীরা অনশনে
শেষ জাহাজটিও জব্দ, নেওয়া হলো ইসরায়েলে
ত্রাণসামগ্রী নিয়ে গাজার পথে যাত্রা করা গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার শেষ জাহাজটিও আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। শুক্রবার ভোরে গাজা উপকূলের কাছে জাহাজটি দখলে নেওয়ার আগমুহূর্তে- ভিডিও থেকে
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৪ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৯:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সমুদ্রে জাহাজ ভাসিয়ে গাজায় গিয়ে যুদ্ধপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন পূরণ হলো না গ্রেটা থুনবার্গসহ বিশ্বের ৪০ দেশের কয়কশ বিশিষ্টজনের। বিশ্বের কোটি মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকা গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার বহরের শেষ জাহাজটিও জব্দ করেছে ইসরায়েল। সব মিলিয়ে জাহাজগুলো থেকে ৪৪৩ আরোহীকে আটক করা হয়েছে। তাদের কেউ মানবাধিকার কর্মী, কেউ আইনজীবী, কেউবা সংসদ সদস্য। আটকের পর তাদের ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের কারা হেফাজতে রাখা হয়েছে। সূত্র জানায়, ফ্লোটিলার আটক আরোহীরা ইসরায়েলের দেওয়া কোনো খাবার ও পানি গ্রহণ করছেন না; তারা অনশন শুরু করেছেন।
গতকাল শুক্রবার শেষ জাহাজটিও ইসরায়েল তাদের অবৈধ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। সেই সঙ্গে আটক করা হয় অধিকারকর্মীদের। আলজাজিরা জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ২৯ মিনিটে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার শেষ জাহাজ পোল্যান্ডের পতাকাবাহী মেরিনেট ইসরায়েলের নৌবাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ওই জাহাজ থেকে অধিকারকর্মীদের কেউ কেউ পুরো ঘটনাটির সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন। ইসরায়েলের নৌ সদস্যদের জাহাজে আরোহণের দৃশ্য এতে ধরা পড়ে। গাজা উপকূল থেকে ৪২ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে এটি জব্দ করা হয়। ফ্লোটিলার আয়োজকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে জাহাজটি জব্দ করেছে ইসরায়েল, যা এ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বহরের শেষ জাহাজ মেরিনেটে ছিলেন অন্তত ছয় আরোহী। এটি অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের। বাকি সব জব্দ করা হলেও অব্যাহতভাবে এটি গাজার অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছিল। এতে অনেকের মধ্যে আশা জাগে– হয়তো জাহাজটি গাজার মাটি ছুঁতে পারবে। কিন্তু তা আর হলো না। ফ্লোটিলার এ বহরের পেছনে আরেকটি জাহাজ বহর গাজার দিকে এগিয়ে আসছে। ভূমধ্যসাগরের ঢেউ মাড়িয়ে এগিয়ে আসা বহরের একটি জাহাজে আছেন এক খ্যাতিমান বাংলাদেশি। তিনি দৃকের প্রতিষ্ঠাতা আলোচিত্রী শহিদুল আলম।
জাহাজ বহর জব্দ হওয়া নিয়ে সামাজিক মাধ্যম এক্স পোস্টে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা লিখেছে, ইসরায়েল ৩৮ ঘণ্টা ধরে অভিযান চালিয়ে তাদের ৪২টি জাহাজ জব্দ করে। প্রতিটিতে গাজার দুর্গত মানুষের মানবিক সহায়তা ও সেচ্ছাসেবী ছিলেন। তারা গাজায় ইসরায়েলের অবৈধ অবরোধ ভাঙতে চেয়েছিলেন। বাকি ৪১টি জাহাজের পরিণতি জেনেও ছুটে চলেছিল মেরিনেট। তবে পোস্টে ফ্লোটিলা লিখেছে, ‘এটা আমাদের মিশনের শেষ নয়। ইসরায়েলের নির্মমতাকে মোকাবিলা করা এবং ফিলিস্তিনের মানুষের পাশে অনড় থাকা আমাদের অঙ্গীকার।’
এমন এক সময় ফ্লোটিলার এ জাহাজ বহর গাজার অভিমুখে ত্রাণ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, যখন সেখানে অব্যাহতভাবে গণহত্যা চলছে। দুর্ভিক্ষে ধুঁকছেন হাজার হাজার মানুষ। তাদের না আছে খাবার, না বিশুদ্ধ পানি। প্রতিদিনই অনাহারে মৃত্যু বাড়ছে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের বিমান হামলা ও ত্রাণ দেওয়ার নামে গুলি করে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা হচ্ছে। ২০০৯ সালে গাজার সমুদ্রপথে অবরোধ দেয় ইসরায়েল।
আটকরা কোথায়
বিবিসি লিখেছে, ফ্লোটিলার জাহাজগুলোতে অন্তত ৪৯৭ জন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, সংসদ সদস্য ছিলেন। আনুমানিক ৪৪৩ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ভাঙার অভিযোগ আনা হয়। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, আটক সবাই সুস্থ ও নিরাপদ আছেন। তাদের ইসরায়েলে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে ইউরোপে ফেরত পাঠানো হবে। একটি ভিডিওতে অধিকারকর্মী গ্রেটাকে আটক অবস্থায় দেখা গেছে। তাঁকে ঘিরে আছেন ইসরায়েলের সেনারা।
আটক হওয়ার আগে গ্রেটা একটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমার নাম গ্রেটা থুনবার্গ। আমি জাহাজ আলমায় রয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা ইসরায়েলের মুখোমুখি হচ্ছি।’ দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, গ্রেটা ও অন্য সমাজকর্মীদের ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
প্রতিবাদে অনশন
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার জাহাজ বহরের আটকরা অনশন শুরু করেছেন। ইন্টারনেশনাল কমিটি টু ব্রেক সিজ অব গাজা এক বিবৃতিতে জানায়, আটক হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলের দেওয়া কোনো খাবার গ্রহণ না করে তারা অনশন-ধর্মঘট শুরু করেছেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা অনশন চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
লাথি মারা ও হেনস্তার অভিযোগ
ফ্লোটিলার জাহাজ বহর থেকে আটক অধিকারকর্মী কয়েকজনকে ইসরায়েল হেনস্তা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের হাত বেঁধে পাঁচ ঘণ্টা হাঁটু মুড়ে বসিয়ে রাখা হয়। দ্য আইরিশ টাইমস জানায়, আয়ারল্যান্ডের আটক কয়েকজন নাগরিক জানিয়েছেন, তাদের সঙ্গে আগ্রাসী আচরণ ও সহিংসতা চালিয়েছে ইসরায়েল। তাদের লাথি মারা হয়েছে এবং মরুভূমির জঘন্য কারাগারে রাখা হয়েছে। ফ্লোটিলা থেকে আয়ারল্যান্ডের ১৬ নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে আইনজীবী এসব তথ্য জানতে পেরেছেন। তাদেরকে জিওট জেলে রাখা হয়েছে।
ফেরত পাঠানো শুরু
ইসরায়েলের পররষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানায়, এরই মধ্যে আটকদের ফেরত পাঠানো শুরু হয়েছে। চারজন ইতালীয়কে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অন্যদের পাঠানো প্রক্রিয়াধীন।
দেশে দেশে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ
ফ্লোটিলার জাহাজ জব্দ ও আরোহীদের আটকের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। গ্রিস, ইতালি, জার্মানি, তিউনেসিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। সমালোচনা করেছে পাকিস্তান, বলিভিয়া ও মালয়েশিয়া। রয়টার্স জানায়, গতকাল শুক্রবার ইউরোপ থেকে পাকিস্তানের করাচি, বুয়েন্স আয়ার্স থেকে মেক্সিকো সিটি– সব জায়গা বিক্ষোভ হয়েছে। ইতালিতে দেশব্যাপী হরতাল পালন করা হয়; লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে ফ্লোটিলার সমর্থনে বিক্ষোভ করেন।
বিবিসি জানায়, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো তাঁর দেশ থেকে ইসরায়েলের কূটনীতিকদের বহিষ্কার করেছেন। তিনি জাহাজ বহর জব্দের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এটাকে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যও স্থগিত ঘোষণা করেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারনেশনালের মহাসচিব এঙ্গিস কলামার্ড গাজায় অবরোধকে ‘অবৈধ’ বলে বর্ণনা করেছেন। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করছে বলেও বর্ণনা করেন তিনি। তবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি গাজায় পৌঁছানোর এ ধরনের চেষ্টার সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমি এখনও বিশ্বাস করি– এ ধরনের পদক্ষেপ ফিলিস্তিনের মানুষের জন্য কোনো সুবিধা বয়ে আনবে না।’
ফ্লোটিলার যাত্রীরা ‘সন্ত্রাসী’
রয়টার্স জানায়, সুমুদ ফ্লোটিলা বহরের মানবাধিকার কর্মীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের মন্ত্রী ইতমার বেন-গাভির। গত বৃহস্পতিবার রাতে আশদোদ বন্দরে মেঝেতে বসে থাকা কয়েকশ আটককে দেখিয়ে হিব্রু ভাষায় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এরা হলো ফ্লোটিলার সন্ত্রাসী।’ এ সময় কয়েকজন অধিকারকর্মী ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো’ স্লোগান দেন। সাইপ্রাস বলেছে, তাদের দেশে ফ্লোটিলার একটি জাহাজ নেওয়া হয়েছে। এতে ২১ আরোহী রয়েছেন।
আবারও যাত্রার অঙ্গীকার
গাজায় যে ক্ষুধার মহামারি চলছে, এসব জাহাজের ত্রাণ তাতে হয়তো মহামরুতে এক ফোঁটা পানির মতো হতো। তবু প্রতীকী যাত্রায় ইসরায়েলের তৈরি অবরোধ ভাঙতে চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪৪ দেশের প্রতিনিধিরা। তারা সেটা পারেননি। তবু তাদের চেষ্টায় পুরো বিশ্বের সংহতি ছিল। কয়েক ডজন জাহাজে থাকা মানুষের ইচ্ছার সঙ্গে সবার ইচ্ছা সম্মিলিত হয়েছে। পরিস্থিতি না বদলালে আবারও এ ধরনের যাত্রার অঙ্গীকার করেছে ফ্লোটিলা।
- বিষয় :
- গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা
