ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তাইওয়ান বিতর্ক

জাপানি প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে টোকিও-বেইজিং টানাপোড়েন, ভূ-রাজনীতিতে উত্তাপ 

জাপানি প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ঘিরে টোকিও-বেইজিং টানাপোড়েন, ভূ-রাজনীতিতে উত্তাপ 
×

ছবি: বিবিসি

আবদুস সামাদ আজাদ

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ২৩:০৫

জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির একটি মন্তব্য ঘিরে চীন-জাপানের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি। দুদেশের বিরোধ তীব্র হওয়ার প্রেক্ষিতে চীন তার নাগরিকদের জাপান ভ্রমণে সতর্কতাও দিয়েছে। আঞ্চলিক বিমান সংস্থাগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা। চীনের এই পদক্ষেপে মনে হচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক কোনো বিষয়েই তারা জাপানকে ছাড় দিতে চায় না। প্রয়োজনে এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি ব্যবহার করতেও পিছপা হবে না চীন। 

তাকাইচির মন্তব্যটি ছিল তাইওয়ান নিয়ে। সম্প্রতি পার্লামেন্টে তাকাইচি বলেছিলেন, ‘তাইওয়ানের ওপর চীনা খবরদারি জাপানের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। পরিস্থিতি সামলাতে টোকিও সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।’

তাকাইচির ওই মন্তব্যে চীনের পক্ষ থেকে এতো মারাত্মক প্রতিক্রিয়া আসবে ভাবা যায়নি। জাপানের ওসাকায় নিযুক্ত একজন চীনা কনসাল জেনারেল জাপানি প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের জবাবে গত সপ্তাহে একটি কঠিন কথা বলেছিলেন। ওই কর্মকর্তার নাম জু জিয়ান। তিনি তার এক্স পোস্টে বলেন, ‘আমাদের ওপর যে নোংরা ঘাড় ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তা বিনা দ্বিধায় কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

তবে ঠিক কাকে নিয়ে এই মন্তব্য তা স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও জাপানি প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে মন্তব্যটি করা হয়েছে বলে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। পরে জু তার পোস্ট সরিয়ে নেন। খোদ জাপান সরকারও ওই কর্মকর্তার মন্তব্যের নিন্দা করে বিবৃতি দেয়। তবে বিষয়টি থেমে থাকেনি। 

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘তাইওয়ান নিয়ে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য স্পস্টতই উসকানিমূলক। তার মন্তব্য কূটনৈতিক পরিবেশকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জাপানে চীন নাগারিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করেছে। আপাতত চীনা নাগরিকদের জাপান ভ্রমণ বন্ধ।’

বেইজিং তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ড হিসেবে মনে করে। তারা বিষয়টি অনেক আগে থেকেই জানান দিয়ে আসছে। এজন্য জাপানি প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে বেইজিং খুবই ক্ষুব্ধ। তাইওয়ানের ব্যাপারে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থানকে বেইজিং ‘সীমা অতিক্রম’ বলেই মনে করে। 

দুদেশের মধ্যে টানাপোড়েনের ফলে নাগরিকদের ভ্রমণ বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ চীন-জাপানের নাগরিকরা পরস্পর তাদের দেশে ব্যাপক সংখ্যায় ভ্রমণ করে থাকে। জাপানের পাবলিক ব্রডকাস্টার এনএইচকে জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে চীন থেকে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন বা ৭৫ লাখ মানুষ জাপান ভ্রমণ করেছেন। যা যেকোনো দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যা।

দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েনের ফলে পাল্টাপাল্টি রাষ্ট্রদূত তলব করার ঘটনাও ঘটেছে। চীনে তাকাইচির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। এখন দেশটিতে জাপানবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এমনকি শনিবার পিপলস লিবারেশন আর্মি এক মন্তব্যে বলেছে, ‘জাপান তাইওয়ান প্রণালিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করলে তারাও পাল্টা আঘাত হানবে। জাপানকে ভারী মূল্য দিতে হবে।’ যদিও তাকাইচি তিনি আর এমন মন্তব্য করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন।   

চীনে সামাজিকমাধ্যমে তাকাইচি বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনাও উঠেছে। অথচ তাকাইচি ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অ্যাপেক শীর্ষ সম্মেলনে দেখা হয়েছিল। তারা পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছা বিনিময় করেছিলেন। 

ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে চীনে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বেইজিং। সেখানে চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সান ওয়েইডং বলেন, ‘তাকাইচির মন্তব্য চীন-জাপান সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তিকে গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’

জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তোশিমিতসু মোতেগি শুক্রবার বলেন, ‘তাকাইচির মন্তব্য প্রত্যাহার করার কোনো প্রয়োজন নেই। সংকটময় পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি ওই মন্তব্য করছিলেন।’ 

জাপানের মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা বলেন, ‘তাইওয়ান প্রণালীতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা কেবল জাপানের নিরাপত্তার জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।’

জাপান তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন বাহিনীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। মার্কিন ও জাপানি বিশ্লেষকরা বিশ্বাস করেন, তাইওয়ানের বিরুদ্ধে যেকোনো বড় আক্রমণে এই ঘাঁটিগুলোকে প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু বানাবে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। সে অনুসারে জাপান মার্কিন সেনাদের রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।  

তাইওয়ান প্রশ্নে জাপানের অবস্থান কী 
চীন ও তাইওয়ানের মধ্যে সংঘাতের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে জাপান দীর্ঘদিন ধরে চুপ ছিল। তাইওয়ান পূর্ব চীন সাগরে জাপানের পশ্চিমতম দ্বীপ ‘ইয়োনাগুনি’ থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জাপানের যুদ্ধোত্তর সংবিধান আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় হিসাবে শক্তি প্রয়োগ করতে নিষেধ করে থাকে। 

২০১৫ সালে জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির গুরু শিনজো আবে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন আইনটি পাস হয়েছিল। তবে এই অঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে জাপানের সমর্থন অতীতে দেখা গেছে। 

টানাপেড়েনের মধ্যে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, তাইওয়ানের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকে কোনো ভুল সংকেত পাঠাতে পারে এমন মন্তব্য থেকে জাপানতে দূরে থাকা উচিত। তবে জাপানি কনসাল জেনারেল জু জিয়ানের মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তাইওয়ান। দ্বীপ রাষ্ট্রটির প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র কারেন কুও এক বিবৃতিতে বলেছেন, জাপানের প্রতি হুমকিমূলক বক্তব্য কূটনৈতিক শিষ্টাচারের গুরুতর লঙ্ঘন। 

চীন-জাপান পাল্টাপাল্টিতে সরব যুক্তরাষ্ট্রও
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন, তাইওয়ানের ওপর যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতে জাপানের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। চলমান ঘটনায় জাপানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জর্জ গ্লাস চীনা কনসাল জেনারেলের জু জিয়ানের মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন।  

গ্লাস তার এক্স পোস্টে বলেন, ‘জাপানি প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি ও তার জনগণকে হুমকি দিয়েছেন জু। তার মুখোশটা আবারও খুলে গেল। কয়েক মাস আগে তিনি ইসরায়েলকে নাৎসি জার্মানির সঙ্গে তুলনা করে করে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। বেইজিং নিজেকে ভালো প্রতিবেশী বললেও তা প্রমাণ করতে বারবার তারা ব্যর্থ হয়।‘

মার্কিন গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার সেনাবাহিনীকে ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান দখলের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে অনেক বিশ্লেষক এই তথ্যকে সঠিক মনে করেন না।  

সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স ও জাপান টুডে

আরও পড়ুন

×