এক্সপ্লেইনার
ইরানের শাসন কি পতনের দ্বারপ্রান্তে
ইরানের রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভকারীদের একাংশ। গত সোমবার। ছবি: সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮:৪৯ | আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৯:২৮
সম্প্রতি ১ মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় মূল্য ছুঁয়েছিল সাড়ে ১৪ লাখ। মুদ্রার এমন নাটকীয় অবমূল্যায়ন প্রভাব ফেলেছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। এর প্রতিবাদে মানুষ রাস্তায় নেমেছে, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত বিক্ষোভে সহিংসতায় মারা গেছেন অন্তত ছয়জন।
প্রাণঘাতী সহিংসতার পর ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট দ্রুত রাজনৈতিক ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। কিছু বিক্ষোভকারী স্লোগান দিয়েছেন ‘স্বৈরাচারের পতন হোক’। যা ভাবিয়ে তুলেছে সরকারকে। ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, শুক্রবারও বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামেন। ফার্স প্রদেশের মারভদাস্ত শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয় সহিংসতার সময় নিহত এক ব্যক্তির জানাজা শেষে।
ویدیوی رسیده به ایراناینترنشنال نشان میدهد که شهروندان معترض جمعه ۱۲ دیماه پس از پایان مراسم خاکسپاری خداداد شیروانی، معترض کشتهشده در مرودشت، تظاهرات کردند. pic.twitter.com/BJN6CQfvYz
— ايران اينترنشنال (@IranIntl) January 2, 2026
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অভিযোগ করেছেন, এই সংকট (আর্থিক) তৈরি হয়েছে তেহরানের ‘শত্রুদের’ চাপের কারণে। তাঁর এই অভিযোগের একদিন পরই হুমকি এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার বলেছেন, ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে কাউকে হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যেতে প্রস্তুত।’ এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে ইরানে বিক্ষোভের মূল কারণ কী।
কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়: বিশ্লেষক
জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগে ১ মার্কিন ডলার দিয়ে ৮ লাখ ২০ হাজার ইরানি রিয়াল পাওয়া যেত। বর্তমানে তা সাড়ে ১৪ লাখে পৌঁছেছে। ইরান উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানি নির্ভর দেশ। তাই এ ধরনের মুদ্রাস্ফীতি সমাজে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে। সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেও সমস্যায় পড়ছে। যা বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অসন্তোষকে আরও তীব্র করেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের ইরান বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী গিসসু নিয়া মনে করেন, অর্থনৈতিক ধস এই বিক্ষোভের উদ্দীপক। কিন্তু এর মূল কারণ নয়।
গিসসু নিয়া বলেন, অনেক সময় অর্থনৈতিক সংকট আন্দোলনের প্রাথমিক কারণ হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা যদি স্লোগান ও বিক্ষোভের বিস্তার দেখি, তাহলে ইরানি শাসনব্যবস্থার প্রতি গভীর অসন্তোষ এবং সেই ব্যবস্থাকে উৎখাত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন পাওয়া যায়।
গিসসু নিয়া উল্লেখ করেন, অনেক ইরানি ধসে যাওয়া অর্থনীতির পেছনে প্রবীণ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতার কথা বলছেন। তারা স্লোগান দিচ্ছেন, ‘জান, জেন্দেগি, আজাদি’। অর্থ্যাৎ, নারী, জীবন ও স্বাধীনতা। এই স্লোগান ২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুর প্রতিবাদে হওয়া বিক্ষোভের প্রতিধ্বনি। তারা আরও বলছেন, ‘ডেথ টু দ্য ডিক্টেটর’ বা স্বৈরশাসকের পতন হোক। তারা শাসন ব্যবস্থার ইতির প্রতি ইঙ্গিত করছেন।
নিয়া বলেন, আগের বিক্ষোভগুলো সাধারণত নেতৃত্বের কাছে সংস্কারের দাবি তুলতো। কিন্তু এখন সেই দাবিগুলো নেই বরং শাসন ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এই আন্দোলন বিভিন্ন প্রজন্ম ও রাজনৈতিক ভাবধারার মানুষকে একত্রিত করছে।
আন্দোলনে বাজারের ভূমিকা
ইরানের বাজারগুলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এবার সেই বাজার ও ব্যবসায়ীদের থেকে বিক্ষোভ শুরুর ঘটনা একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন নির্দেশ করছে। যেমন, ১৯৭৯ সালে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদারদের ধর্মঘট ইসলামী বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ওই আন্দোলনে রাজতন্ত্রের পতন হয়।

গিসসু নিয়া বলেন, বাজারে ধর্মঘট শুধু খাদ্য সরবরাহকে প্রভাবিত করে না, এটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রক্ষণশীল ভিত্তিতে আঘাত হানে। ফলে ইরানের বাজার এই আন্দোলনের মূল চালিকা হিসেবে কাজ করছে।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বাজারের ভূমিকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘সমস্যা সমাধান না হলে, আমরা শাসন করতে পারব না।’ তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পেয়েছে।
ইরানের সরকার ২০২৬ সালের খসড়া বাজেটে ট্যাক্স বৃদ্ধির হার ৬২ এবং মুদ্রাস্ফীতি ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। যা সাধারণ নাগরিকদের কাছে লুটপাটের মতো মনে হচ্ছে।
নাগরিক জীবনে সংকটের প্রভাব
মানুষ যা সঞ্চয় করে রেখেছিল সেগুলোর মান কমে গেছে। খাদ্যপণ্য ও ওষুধের দাম অনেকের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। পানি ও বিদ্যুতের সংযোগও অনেক সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে। এটি কেবল নিম্নআয়ের নয়, শহুরে মধ্যবিত্তের জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

গিসসু নিয়া বলেন, বাস্তবতা হলো মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় অনেক সামগ্রী আর কিনতে পারছে না। যখন একজন মানুষের কাছে আর হারানোর কিছু থাকে না, তখন তারা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকে।
লেবানন, ইয়েমেন ও গাজায় মিলিশিয়াদের আনুগত্য নিশ্চিত করতে ইরান বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এখন ইরানের বিক্ষোভকারীরা এই আঞ্চলিক হস্তক্ষেপমূলক নীতির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে। গিসসু নিয়া বলেন, অনেক ইরানি মনে করছেন হিজবুল্লাহ বা হামাসের কাছে পাঠানো প্রতিটি ডলার সাধারণ মানুষের কাছে থেকে চুরি করা হয়েছে।
সরকার কি বিক্ষোভ থামাতে পারবে
আগের বিক্ষোভের তুলনায় বর্তমান আন্দোলনকে শুরুর পর্যায়েই ভয় দেখিয়ে থামানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যা ইঙ্গিত দেয় বর্তমান শাসন ব্যবস্থা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। গিসসু নিয়া বলেন, অনলাইনে ছড়ানো ভিডিওতে দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হচ্ছে।

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন কৌশল এক ধরনের বার্তা দেয়। সেটি হলো- শাসকগোষ্ঠীর কাছে সমস্যার সমাধান নেই। তাই তারা এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে। অতীতের বিক্ষোভগুলোকে ইরানি শাসকরা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখতেন। অভিযোগ তোলা হতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দিকে।
চলমান বিক্ষোভের সময়ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ জনগণকে আন্দোলনে সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছে। যেটির উদাহরণ দিয়ে ইরানি গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকে তুলে ধরছে ‘পরিচালিত অস্থিতিশীলতা’ হিসেবে। কিন্তু এই আন্দোলনের গতি বা সামাজিক বিস্তৃতিকে বাস্তবে বাইরের কোনো শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অনেক ইরানি মনে করেন, বিদেশি ষড়যন্ত্রের দোহাই দেওয়াটা শাসকদের শক্তির প্রমাণ নয় বরং এটি দেখায় যে তারা বাস্তবতা স্বীকার করতে রাজি না।
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও জবাব
চলমান পরিস্থিতির মধ্যে শুক্রবার এক ধরনের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় এবং সহিংসভাবে হত্যা করে- তাহলে যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধারে এগিয়ে যাবে।’ একই পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমরা যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, লকড অ্যান্ড লোডেড।’

জবাব দিতে ছাড়েনি ইরানও। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা খামেনির উপদেষ্টা আলি শামখানি এক্সে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, যেকোনো অজুহাতে ইরানের নিরাপত্তার ওপর হস্তক্ষেপমূলক হাত বাড়ানো হলে সেটির জবাব দেওয়া হবে।
আর ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান আলি লারিজানি চলমান বিক্ষোভে হস্তক্ষেপ না করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
(ডয়চে ভেলে, এএফপি, আলজাজিরা ও ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অবলম্বনে)
