ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিউইয়র্কের আদালতে মাদুরো

আমি এখনও প্রেসিডেন্ট, আমি নির্দোষ, আমাকে ধরে এনেছে

ট্রাম্পের আরও হামলার হুমকি ভেনেজুয়েলায় অনিশ্চয়তা

আমি এখনও প্রেসিডেন্ট, আমি নির্দোষ, আমাকে ধরে এনেছে
×

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আদালতে হাজির করার জন্য গতকাল সোমবার সকালে নিউইয়র্কের আটক কেন্দ্র থেকে হেলিকপ্টারে ম্যানহাটানে আদালতের কাছের একটি হেলিপোর্টে নেওয়া হয়- দ্য গার্ডিয়ান

 সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভেনেজুয়েলা থেকে উঠিয়ে নেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের ফেডারেল আদালতে তোলা হয়েছে। স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার বিকেলে ব্রুকলিনের আটক কেন্দ্র থেকে তাদের হেলিকপ্টারে করে আদালতে নেওয়া হয়। এ সময় মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী হাতকড়া পরা অবস্থায় ছিলেন। তাদের গায়ে ধূসর রঙের পোশাক দেখা যায়।

আদালতে মাদুরো ও সিলিয়া দুজনই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। আদালতে তোলা হলে বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টেইনকে মাদুরো বলেন, ‘আমি নির্দোষ। আমি একজন ভদ্র মানুষ।’ এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি এখনও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। আমাকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে।’

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। অভিযোগগুলো হলো– মাদক-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানি ষড়যন্ত্র, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক যন্ত্রপাতি রাখা। চারটি অভিযোগই অস্বীকার করেন মাদুরো। 

বিচারক অভিযোগগুলো পড়ে শোনানোর পর মাদুরোর বক্তব্য জানতে চান। তখন তিনি বলেন, ‘এখানে যে অভিযোগগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি আমি করিনি।’ শুনানি নেওয়ার পর বিচারক আগামী ১৭ মার্চ মাদুরোর পরবর্তী হাজিরার দিন ধার্য করেন।

আদালতের কার্যক্রম চলাকালে সিলিয়ার মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা দেখা যায়। এ বিষয়ে মার্কিন আইনজীবী আদালতকে জানান, ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মার্কিন বাহিনী নিকোলাস মাদুরোর ও স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে আসে। ওই সময় সিলিয়া গুরুতর আঘাত পান। 

ম্যানহাটানের আদালতে যখন মাদুরো ও সিলিয়াকে তোলা হয়, তখন বাইরে পক্ষে-বিপক্ষে মিছিল হয়েছে। এক পক্ষ ‘ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে অবৈধ যুদ্ধ বন্ধ করুন’ লিখে বিক্ষোভ করে। আরেক পক্ষ ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানায়। 

এদিকে নিকোলাস মাদুরোর ছেলে নিকোলা মাদুরো (জুনিয়র) গুয়েরা বাবা-মায়ের মুক্তির জন্য চেষ্টা করতে দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলায় অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। দেশটির জনগণের একটি বড় অংশের যুক্তরাষ্ট্রের এ হস্তক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, নিকোলাস মাদুরোকে আকস্মিক আটকের ঘটনায় ভেনেজুয়েলা একটি নতুন ও গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে। রাজধানী কারাকাস ও অন্য শহরগুলোতে নীরবতা বিরাজ করছে। ফুটেজে দেখা যায়, অধিকাংশ সড়কই প্রায় শূন্য। তবে সুপারমার্কেট ও ফার্মেসিকে লোকজনের উপস্থিতি রয়েছে।

মারাকা শহরের মনস্তত্ত্ববিদ ৩৫ বছরের আলেজান্দ্রা প্যালেনসিয়া গতকাল রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি আমার কুকুরটিকে নিয়ে মাত্র বের হলাম। লোকজন যেন এ শহর ছেড়ে চলে গেছেন। আসলে সবাই ঘরের ভেতরে দরজার খিল এঁটে আছেন।’ ৭৪ বছরের ন্যান্সি প্যারেজ বলেন, ‘জানতে চাই পরবর্তী সময়ে কী ঘটতে যাচ্ছে?’

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ চলছে। ক্ষোভ আছে তাঁর প্রশাসনের অভ্যন্তরেও। বর্তমানে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব থাকা ডেলসি রদ্রিগেজ এ ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তবে ট্রাম্পের পাল্টা হুমকির জেরে তিনি সুর নরম করেন। ট্রাম্প ‘মাদুরোর চেয়ে ভয়ংকর পরিণতি হবে’ বলে ডেলসিকে সতর্ক করেন। এর প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে যিনি ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন চালাতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, শান্তিতে নোবেলজয়ী সেই মারিয়া কোরিনা মাচাদো আপাতত অপ্রাসঙ্গিকই থাকছেন। ট্রাম্প তাঁকে ভেনেজুয়েলায় নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য মনে করছেন না। 

গতকাল সোমবার বিবিসি জানায়, অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নিতে পারেন। প্রাথমিকভাবে ডেলসি মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বললেও পরে সুর নরম করে বলেন, তিনি ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক। গত রোববার সামাজিক মাধ্যম টেলিগ্রামে তিনি লিখেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানজনক সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাওয়াকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করি। আমরা মার্কিন সরকারকে যৌথ উন্নয়নের লক্ষ্যে সহযোগিতার একটি এজেন্ডা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
গত শনিবার এক টেলিভিশন ভাষণে ডেলসি মার্কিন পদক্ষেপকে ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী নৃশংসতা’ বলে নিন্দা জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার একমাত্র প্রেসিডেন্ট হলেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো।’ ডেলসির এ ভাষণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত ঘটায়। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা ডেলসির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। মাদুরোকে তুলে আনার পরপরই এ যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। আর ডেলসিও যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করার বার্তা দিয়েছেন।

আলজাজিরা লিখেছে, টেলিভিশন ভাষণে ডেলসি মার্কিন প্রশাসনকে ‘চরমপন্থি’ গোষ্ঠী বলে বর্ণনা করার পর ক্ষেপে যান ট্রাম্প। তিনি ডেলসিকে সরাসরি হুমকি দেন এবং ভেনেজুয়েলায় আবারও হামলার কথা বলেন। এ প্রেক্ষাপটে সুর নরম করেন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি।

গত রোববার ভোরে দি আটলান্টিক ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘যদি তিনি (ডেলসি) সঠিক কাজ না করেন, তাহলে তাঁকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে; সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড়।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ভেনেজুয়েলায় আরও হামলা হতে পারে। তিনি ভেনেজুয়েলায় ‘মাটিতে বুট’ রাখার বিষয়টি উড়িয়ে দেবেন না। যুক্তরাষ্ট্র এখন দায়িত্বে।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন, যুদ্ধবাজ নীতি ও কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের ‘যুক্তরাষ্ট্র প্রথম’ অবস্থানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং দেশকে অন্তহীন যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি, ইরাক যুদ্ধে শাসন পরিবর্তনের কারণে পূর্ববর্তী সমালোচনা– সবই যে নিছক কথার কথা ছিল, তা তুলে ধরে অনেকেই সমালোচনা করছেন। 

মাদুরোকে মুক্ত করতে কমিশন গঠন
গত রোববার ডেলসি রদ্রিগেজ জানান, যুক্তরাষ্ট্রে আটক মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মুক্ত করতে একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার নেতার বিরুদ্ধে ‘মাদক সন্ত্রাসবাদ ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানি ষড়যন্ত্র, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখার ষড়যন্ত্রে’র অভিযোগ আনা হয়েছে। কমিশনে সভাপতিত্ব করবেন ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল ও তাঁর ভাই জর্জ, যিনি ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের সভাপতি।

বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ
আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাদুরোকে তুলে আনার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। গত রোববার বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের টেনিসি অঙ্গরাজ্যের নক্সভিলে বিক্ষোভকারীরা মার্কেট স্কয়ারে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা ‘মানুষের প্রয়োজনে অর্থ, যুদ্ধ চালানোর জন্য নয়’, ‘তেলের জন্য কোনো রক্ত নয়’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকেন। দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো, ডালাস, ফিলাডেলফিয়া, পিটসবার্গ, সানফ্রান্সিসকো, সিয়াটল, লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক, লাস ভেগাসেও বিক্ষোভ হয়েছে। 

এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস, আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেস, বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে মার্কিন দূতাবাসের বাইরে ও পাকিস্তানের করাচিতে বিক্ষোভ হয়েছে।

এক ডজন তেলবোঝাই ট্যাঙ্কার ভেনেজুয়েলা ছেড়েছে
ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্স ডটকম জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানিবোঝাই প্রায় এক ডজন ট্যাঙ্কার দেশটির জলসীমা থেকে ছেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে প্রভাব পড়েছে। তেলের দাম কমেছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের থমাস ম্যাথিউস রয়টার্সকে বলেন, ‘মার্কিন বাহিনীর হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর গ্রেপ্তারের ঘটনা শিরোনামে প্রাধান্য পেলেও আর্থিক বাজার অস্থির বলে মনে হচ্ছে।’ আন্তর্জাতিক মান ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল ৩৪ সেন্ট কমে ব্যারেলপ্রতি ৬০ দশমিক ৪১ ডলারে লেনদেন করছে।

মাদুরোর সম্ভাব্য পরিণতি কী
মাদুরো পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগার মতো একই ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে পারেন। নরিয়েগাকে ধরতে ১৯৯০ সালে পানামায় আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে নিজ দেশের ভ্যাটিকান দূতাবাসে লুকিয়ে থাকলে সেখান থেকে মার্কিন বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে যায়।
তবে মজার বিষয়, এ নরিয়েগা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ‘ধান্দাবাজি, মাদক চোরাচালান ও অর্থ পাচারে’র অভিযোগ আনা হয়েছিল। নরিয়েগা ৪০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ভালো আচরণের জন্য তাঁর সাজা কমিয়ে ১৭ বছর করা হয়। পরে তাঁকে পৃথক অভিযোগে ফ্রান্সে প্রত্যর্পণ করা হয়। সেখান থেকে তিনি পানামায় ফেরেন। সেখানেও তাঁকে কারাগারে রাখা হয়। ২০১৭ সালে মারা যান নরিয়েগা। 

কিউবার ৩২ যোদ্ধা নিহত
কিউবা জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে কারাকাসে অপহরণ ও আটকের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে, তাতে কিউবার ৩২ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। গত রোববার হাভানা জানায়, নিহতদের সম্মানে সোম ও মঙ্গলবার (আজ)– দুদিনের শোক পালন করা হবে। রাষ্ট্র পরিচালিত প্রেস্সা ল্যাটিনা জানায়, ভেনেজুয়েলা সরকারের অনুরোধে ওই ৩২ সেনাকে ভেনেজুয়েলায় মোতায়েন করা হয়েছিল। নিহত কিউবানরা ‘তীব্র প্রতিরোধ’ সৃষ্টি করলে যুক্তরাষ্ট্র বোমা ফেলে তাদের হত্যা করে।

 

আরও পড়ুন

×