ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত

খামেনির মৃত্যুতে দুর্বল হয়ে পড়েছে ইরানের প্রক্সিশক্তি

হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুথি অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত

খামেনির মৃত্যুতে দুর্বল হয়ে পড়েছে ইরানের প্রক্সিশক্তি
×

ছবি: বিবিসি

আবদুস সামাদ আজাদ

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ | ০১:০০ | আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ | ১০:০১

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রক্সি গ্রুপগুলো অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। খামেনিই ছিলেন ইরানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্কের মূল সমন্বয়কারী। তার মৃত্যুতে এই জোট নেতৃত্বহীন ও বিভ্রান্ত হয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। কারণ পশ্চিমা শক্তির দীর্ঘ পরিকল্পনায় ইরানি অক্ষশক্তিকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে।

আলজাজিরা বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, লেবাননের হিজবুল্লাহ সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরানের একটি শক্তিশালী হাত হিসেবে কাজ করতো। তাছাড়া গাজাকেন্দ্রি হামাসও ছিল ইরানের প্রত্যক্ষ মিত্র। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সারাবছরই ইরানের পক্ষে নৌপথগুলোতে ব্যাপক সক্রিয় ছিল। কিন্তু সবগুলো প্রক্সি শক্তি এখন দুর্বল। মাসের পর মাস তাদের ওপর হামলা করে ক্রমাগত তাদের ক্ষয় করে দিয়েছে ইসরায়েল। এই অবস্থায় ইরানের নেতৃত্বে সমন্বিতভাবে কাজ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। গোষ্ঠীগুলো আগে থেকেই ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ছিল।এখন তারা সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা হারাচ্ছে।

এদিকে প্রক্সি শক্তিগুলোর কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যাচ্ছে। আগে তেহরান থেকে সরাসরি নির্দেশনা আসত। এখন বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজ নিজ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, ফলে জোটে ভাঙন দেখা যাচ্ছে। ফলে ইরান প্রক্সিদের কাছ থেকে আগে যে সামরিক সহযোগিতা পেত, এখন তার আর পাচ্ছে না। এটাই ইরানের জন্য বড় ধাক্কা। 

তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ভিন্ন কথা বলছেন। মিত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমরা কারও কাছ থেকে কিছু আশা করি না। আমরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে পারি। আমরা চাই না কোনো পক্ষ আমাদের আত্মরক্ষায় সাহায্য করুক।

অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত হিজবুল্লাহ 
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, প্রক্সি শক্তিগুলোর নড়বড়ে অবস্থা হওয়ায় ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমে যেতে পারে অথবা নতুনভাবে গড়ে উঠতে পারে। খামেনির হত্যাকাণ্ড গ্রুপগুলোকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। আগের মতো মরিয়া হয়ে লড়াই করতে দেখা যাচ্ছে না হিজবুল্লাহ, হুথি কিংবা হামাসকে। তারা নিজেরাই এখন বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে। এই অবস্থায় ইরান বলে দিয়েছে প্রক্সিদের তাদের প্রয়োজন নেই। ইরানের এ ঘোষণায় প্রতীয়মান হয়, হিজবুল্লাহ নতুন করে যুদ্ধে নামার যে ঘোষণা দিয়েছে, তা ইরানের জন্য নয়; বরং তা নিজেদের রক্ষার জন্যই। 

সোমবার হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালিয়েছে। স্পষ্টতই খামেনির হত্যার পরে তাদের যুদ্ধে যোগদান একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে। হিজবুল্লাহর হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে ও বেকা উপত্যকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। 

বৈরুত-ভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলী রিজক আল জাজিরাকে বলেন, হিজবুল্লাহর এই পরিবর্তন সম্ভবত কেবল ইরানের প্রতি সংহতি জানানোর চেয়ে বরং নিজ অস্তিত্ব রক্ষার প্রচেষ্টা বলে মনে হয়েছে। 
 
চাপের মুখে ইয়েমেনের হুথিরা  
শনিবার ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর তার প্রথম টেলিভিশন ভাষণে হুথি গোষ্ঠীর নেতা আবদেল-মালিক আল-হুথি জানান দেন, তার বাহিনী পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি বক্তব্যে ইরানকে শক্তিশালী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিরা নিজেদের যুদ্ধের চাপ থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা করছে। তারা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে। এর আগে তারা সফলভাবে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি কিংবা তেলআবিবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলেও এখন তারা ভালো পরিস্থিতিতে নেই। 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার সম্প্রতি দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার লড়াইয়ে জয়লাভ করেছে। সরকারটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাহের আল-আকিলি সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, তাদের অভিযান এখন রাজধানী সানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয়, হুথিদের কাছ থেকে সানা পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।  
তবে হুথি-অনুমোদিত সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিল এক বিবৃতিতে ইরানের বিরোধীপক্ষকে সতর্ক করে বলেছে , লক্ষ্যবস্তুর বৃত্ত সম্প্রসারণের ফলে কেবল সংঘর্ষের বৃত্তই প্রসারিত হবে। 

দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে ইরাকের গ্রুপ 
ইরাকেও ইরানের প্রক্সিগ্রুপ সক্রিয়। তবে তারা আগের মতো শক্তিশালী নেই। প্রতিরোধের সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে তারা। এই গ্রুপটির নাম পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স। গ্রুপটি যদিও এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইব্রাহিম আল-সুমাইদাই স্বীকার করেন, ওয়াশিংটন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ফোর্সটিকে ভেঙে ফেলতে চায়। পরে মিলিশিয়া নেতাদের চাপেই তিনি পদত্যাগ করেন। 

গার্ডিয়ানের এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এই গোষ্ঠীটি প্রযুক্তিগতভাবে ইরাকি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। সুতরাং ইরাকের মাটি থেকে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণাঙ্গ ঝুঁকি তারা নেবে না। তাছাড়া ইরানি সামরিক বাহিনী আইআরজিসির যেসব নেতা তাদের পরিচালনা করতেন, তারা এখন যৌথ হামলায় মারা গেছেন। সুতরাং ইরাক সরকার যুদ্ধ এড়াতে মরিয়া চেষ্টা করছে। 
সূত্র: আলজাজিরা ও গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন

×