ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের অবস্থান দুর্বল হবে?
ফাইল ছবি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৩:৪২ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ০৫:৫১
বর্তমানে এক গভীর অর্থনৈতিক খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভবিষ্যদ্বাণীর মতো অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে না পড়লেও দেশটি ভয়াবহ সমস্যার সম্মুখীন। যুদ্ধের বিশাল ক্ষয়ক্ষতি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, স্থানীয় মুদ্রার রেকর্ড দর পতন এবং তেলের রাজস্ব কমে যাওয়ার মতো নানামুখী চ্যালেঞ্জে দেশটির নীতিনির্ধারকরা। এ অবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার টেবিলে তেহরান কতটা কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত একটি হিসাব অনুযায়ী, এই ক্ষতির পরিমাণ গত বছরের জাতীয় বাজেটের ৯ গুণ।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) আশঙ্কা করছে, এই পরিস্থিতির কারণে আরও ৪১ লাখ ইরানি নাগরিক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে ইরানের তেল সংরক্ষণের জায়গা ফুরিয়ে যাবে এবং দেশটি বিপর্যস্ত হবে। গত ২৬ এপ্রিল তিনি বলেছিলেন, তিন দিনের মধ্যে ইরানের তেলের কূপগুলো এক শক্তিশালী ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিস্ফোরিত হবে।
এই ধারণার পেছনে কারণ ছিল গত ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া মার্কিন নৌ অবরোধ। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করেছিল, এর ফলে তেহরানের তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবে না। এতে ইরানের দৈনিক অন্তত ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের তেলের রাজস্ব বন্ধ হয়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ মজুত সক্ষমতা শেষ হলে তারা কূপগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হবে। এটি স্থায়ীভাবে তেল উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তবে বর্তমানে কিছু ট্যাঙ্কার মার্কিন অবরোধ এড়িয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে এবং গ্যাস পুড়িয়ে ফেলার মতো কৌশলের কারণে এখনও তেল সংরক্ষণের জায়গা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক জ্বালানি নীতি কেন্দ্রের তথ্যমতে, ইরানের হাতে এখনও সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহের ব্যবহারযোগ্য সংরক্ষণ ক্ষমতা আছে।
মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের কষ্ট
বর্তমানে ইরানের স্থানীয় মুদ্রা তোমানের মান খোলাবাজারে প্রায় ২২ শতাংশ কমে গেছে। এখন এক ডলারের বিপরীতে এক লাখ ৯০ হাজার তোমান পাওয়া যাচ্ছে। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে, আর খাদ্য ও পানীয়ের দাম বেড়েছে ১১৫ শতাংশ।
বর্তমানে ইরানে মাসে সর্বনিম্ন মজুরি ১৭ কোটি রিয়ালের কম (প্রায় ৯২ ডলার), যা গত মার্চে ৬০ শতাংশ বাড়ানোর পরও সাধারণ মানুষের জন্য অপর্যাপ্ত। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত গাড়ি বা আইফোনের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
ইরানের উপ-শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী গোলাম হোসেইন মোহাম্মাদীর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ২৩ হাজারের বেশি কলকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। বিশেষ করে যারা ইন্টারনেটের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা করেন, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ডিজিটাল ব্যবসায়ীদের সংগঠনের প্রধান রেজা ওলফাতনাসাব জানান, বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর বিক্রি এখন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে গেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর যদি এই দশা হয়, তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ তা সহজেই বোঝা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমদ জেইদাবাদি সতর্ক করে বলেন, ইন্টারনেট ছাড়া বর্তমান যুগে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অসম্ভব। দ্রুত সমাধান না হলে গত জানুয়ারির মতো আবারও দেশব্যাপী বড় ধরনের গণবিক্ষোভ শুরু হতে পারে। আবার প্রকৃতির দিক থেকেও ইরান প্রতিকূলতার মুখে। টানা ছয় বছর ধরে তেহরানসহ ১০টি প্রদেশে ভয়াবহ খরা চলছে। বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বর্তমানের এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ইরানের নেতাদের বাধ্য করতে পারে আলোচনার টেবিলে কিছুটা নমনীয় হতে।
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- বৈঠক
- আলোচনা
