ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

গাজায় বিয়েতে নেই আনন্দের ছোঁয়া, সাধারণ অনুষ্ঠানও সাধ্যের বাইরে 

গাজায় বিয়েতে নেই আনন্দের ছোঁয়া, সাধারণ অনুষ্ঠানও সাধ্যের বাইরে 
×

তাবুতে নিজেদের ঘর সাজাতে ব্যস্ত সাজা-মোহাম্মদ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ১৬:২৫ | আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ | ১৬:২৫

গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে অন্য সব পরিবারের মতো সাজা আর মোহাম্মদের পরিবারও বাস্তুচ্যুত হয় এক বছর আগে। ঠিক সেই সময়ে ২২ বছর বয়সী সাজা আল-মাসরি এবং ২৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ আহলিওয়াতের বাগদান সম্পন্ন হয়। বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে তাদের পরিবারগুলো এখনও মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ-এর একটি শিবিরে বাস করছে। খবর আল জাজিরার

কয়েকদিন পরেই বিয়ে সাজা আর মোহাম্মদের। বিয়ের পর তাদের থাকায় জন্য একটা তাবু ঠিক করা হয়েছে। সেখানে আসবাব বলতে বিছানার বদলে দুটো পাতলা তোশক, রান্নার ছোট্ট একটা জায়গা আর কাঠের টুকরো ও প্লাস্টিকের শিট দিয়ে মোহাম্মদের তৈরি একটি অস্থায়ী বাথরুম।

গাজায় বিয়ের পর থাকার এতটুকু জায়গার ব্যবস্থাও এখন মোহাম্মদের মতো অনেক যুবকের জন্য অসহনীয়ভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, কারণ ফিলিস্তিনি সংস্কৃতিতে বিয়ের পর ছেলেদেরই খরচের সিংহভাগ বহন করতে হয়।

মোহাম্মদ জানান, তিনি তাঁবুটা কিনেছেন ১,৫০০ শেকেল বা প্রায় ৫০৯ ডলারে। কাঠের জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ২,৫০০ শেকেল যা প্রায় ৮৫০ ডলার , ত্রিপলের দাম ২,০০০ শেকেল বা প্রায় ৬৭৯ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, আর একটা সাধারণ বাথরুম বানাতে খরচ হয়েছে আরও ৩,০০০ শেকেল যা প্রায় ১,০১৯ ডলার। অথচ যুদ্ধের আগে অ্যাপার্টমেন্টগুলো মাসে ২৫০ থেকে ৩০০ ডলারে ভাড়া পাওয়া যেত।

বিয়ের পোশাক হাতে সাজা

মোহাম্মদ, রুটি ও টিনজাত খাবার বিক্রি বা সাইকেল মেরামতের মতো ছোটখাটো কাজ করেন।

মোহাম্মদ বলেন, আমার যা আয়, তা দিয়ে কোনোমতে খাওয়া-দাওয়া চলে। আমি বিয়ের জন্য কিছু টাকা জমানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু সবকিছু এত ব্যয়বহুল যে আমি বিয়ের জন্য কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারছি না। 

যুদ্ধের আগে, মোহাম্মদ মধ্য গাজার বুরেইজে একটি বড় সাততলা বাড়িতে থাকতেন। সম্পূর্ণ আসবাবপত্রসজ্জিত অ্যাপার্টমেন্টটা ছিল ১৭০-বর্গমিটারের। 

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া আমাদের অ্যাপার্টমেন্টটির কথা যখন মনে পড়ে, খুব খারাপ লাগে। বিয়ের আগে আমার এবং আমার ভাইদের প্রত্যেকেরই আসবাবপত্রে সজ্জিত অ্যাপার্টমেন্ট ছিল।

মোহাম্মদ বলেন, আমাদের পোল্ট্রি খামার ছিল । সেখান থেকে পণ্য গাজার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হতো। এখন এতটাই খারাপ অবস্থা যে আমাকে তাঁবুতে বিয়ে করতে হচ্ছে। 

বিয়ের জন্য হল ভাড়া করার সামর্থ্য না থাকায় মোহাম্মদ একটি ছোট জায়গা ভাড়া নিয়েছেন, এক সময় সেটি ক্যাফে হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

তিনি বলেন, এক বন্ধু আমাকে এই ছোট জায়গাটা ভাড়া করতে সাহায্য করেছে। খরচ পড়েছে ১,৫০০ শেকেল বা প্রায় ৫০৯ ডলার। বিয়ের জন্য হলগুলোর ভাড়া ৮,০০০ শেকেলে পড়বে। 

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মোহাম্মদের অবস্থা অন্যদের চেয়ে আলাদা নয়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সবকিছুর দামই এখন আকাশছোঁয়া দাম। মৌলিক জীবনযাত্রার মানের পতনের কারণে এখন অনেক বিয়েই তাঁবুতে অনুষ্ঠিত হয়। 

গাজার শ্রম মন্ত্রণালয়ের মতে, গাজায় বেকারত্বের হার ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৯৩ শতাংশ হয়েছে।

আল -জাজিরার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই বিয়ে করতে চলেছেন দম্পতি মোহাম্মদ আহলিওয়াত ও সাজা আল-মাসরি। সে জন্য তারা বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে তাঁবুর ভেতরে নিজেদের বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেখানেই প্রতিবেদকের সাথে বাগদত্তার কথা শুনতে শুনতে সাজা চোখের ভিজে উঠে। তার জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্তটি তার কাছে অসম্পূর্ণ মনে হচ্ছিল। এটা ভেবেও তার খারাপ লাগছে যে, মোহাম্মদের বোঝা হালকা করার মতো কিছুই তার কাছে নেই। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের পোশাকও তিনি কিনতে পারেননি। 

সাজা জানান, বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য একটা পোশাক ভাড়া করতে চেয়েছিলেন। এক রাতের জন্য ২,০০০ শেকেলেরও বেশি দাম চাওয়ায় সেটা আর হয়নি। 

শুধু বিয়েটা সম্পন্ন করার জন্য মোহাম্মদ এক পরিচিতের কাছ থেকে সাজার জন্য একটা পোশাক নিয়ে এসেছেন। সেটা পরে সাজার খুবই মন খারাপ হয়েছে। সারারাত কষ্টে কেঁদেছেন। কারণ পোশাকটি জীর্ণ , একপাশে ছেঁড়া এবং পুরনো ধাঁচের ছিল।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত এক বছর ধরে বারবার সানা-মোহাম্মদের বিয়ে স্থগিত করা হয়েছে। সাজা বলেন, পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। বরং তা কেবল আরও খারাপ হচ্ছে। যতবারই আমরা বলি ‘চলো অপেক্ষা করি’, কিছুই বদলায় না। তাই আমরা আগামী সপ্তাহেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

বিয়ে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন থাকলেও পার্লারেও সাজতে যেতে পারছেন না সাজা। কারণ কনে সাজাতে বিউটি সেলুনগুলো এখন প্রায় ৭০০ শেকেল বা ২৩৮ ডলার চার্জ করছে, যা দেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। 

সাজার মা, ৪৯ বছর বয়সী সামিরা আল-মাসরি বলেন, গাজায় সবার অবস্থাই একই রকম। ইসরায়েলের আঘাতে অধিকাংশ ফিলিস্তিনিই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ৭২,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

সামিরা আরও বলেন, যুদ্ধের সময় আমি চার মেয়ের বিয়ে দিয়েছি কোনো আনন্দ ছাড়াই। প্রতিটি বিয়েই আমার কাছে এক একটি ট্র্যাজেডি বলে মনে হয়েছে।

খুবই কষ্টের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওরা সবাই তাদের বিবাহিত জীবন একই ভাবে শুরু করেছিল, তাঁবুতে, প্রায় কিছুই না নিয়ে’।

সামিরা তার মেয়েদের জন্য ঠিকমতো উৎসব করতে না পারা বা তাদের স্বপ্নের বিয়েটা দিতে না পারার গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। 

মোহাম্মদ বলেন , শোবার ঘরের আসবাবপত্রের দাম এখন ১২,০০০ থেকে ২০,০০০ শেকেল। অথচ যুদ্ধের আগে এই সেটগুলোর দাম ছিল প্রায় ৫,০০০ শেকেল।

তিনি আরও বলেন, অবিশ্বাস্য দাম, আর বাজারে জিনিসপত্র প্রায় নেই বললেই চলে।  মাটিতে তোশক পেতেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে আমাদের। 

গাজায় বিয়ে এখন আর আনন্দের উপলক্ষ নয়। সাজার মা সামিয়া জানান,দুশ্চিন্তা শুধু তার মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের ২৬ বছর বয়সী ছেলেকেও ঘিরে। কারণ কয়েকদিন পর ছেলেও বিয়ে করবে। তিনি বলেন,যখনই আমি খরচের কথা ভাবি, তার বিয়ের আয়োজন করা থেকে পিছিয়ে আসি।

এই বাস্তবতার মাঝে, সামিরা আজকের দিনে বিয়ে করতে চাওয়া তরুণ-তরুণীদের জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন তাদের সাহায্য করেন। আমাদের দিনগুলো অনেক সহজ ছিল। সাধারণ খরচগুলোও এখন সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।

দাম্পত্য জীবন শুরুর আগে কঠিন বাস্তবতায় সাজা চিন্তিত। তারপরও নিজের পাশে মোহাম্মদের উপস্থিতি তাকে শক্তি জোগায়। হবু স্বামীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে সাজা বলেন, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমাদের জীবনের শুরুটা খুবই দুঃখজনক। কিন্তু যখন মোহাম্মদকে আমার পাশে দেখি, দুঃখ কেটে যায়। 

আরও পড়ুন

×