দিবস
বিধবাদের অধিকার ও মর্যাদার সংগ্রাম
আফরোজা পারভীন
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ১৬:১০
এই প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে সবার প্রথমে আমার বিধবা মায়ের সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস মনে পড়ে। আমার মা ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হয়েছিলেন। শারীরিক-মানসিক ও সামাজিক এবং পেশাগত চাপের মধ্যে তাঁকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে লড়তে হয়েছিল। বাবা ১৯৯০ সালে ক্যান্সার রোগে মারা গিয়েছিলেন। অল্প বয়সে স্বামী মারা যাওয়ার কারণে চারদিকের সংকট এড়াতে তাঁকে অনেক সংগ্রাম ও লড়াই করতে হয়েছে। পদস্থ কর্মকর্তাদের অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাঁকে অযথা শাস্তিস্বরূপ কিছুদিন পরপরই কর্মস্থল থেকে বদলি করা হতো। আমার মা চুপচাপ মুখ বন্ধ করে গাট্টি বোঁচকা বেঁধে প্রচণ্ড কষ্ট করে সন্তান-সন্ততি ও মালামাল নিয়ে নতুন জায়গায় গিয়ে যোগদান করতেন। সন্তানদের নতুন স্কুলে ভর্তি করতে কষ্ট হতো; লেখাপড়ায় সমস্যা হতো। তবুও অন্যায়ের সঙ্গে তিনি আপস করেননি।
বিধবাদের নিয়ে খুব বেশি একটা গবেষণা আমাদের দেশে হয়নি। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৫২ লাখ বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্ত নারী রয়েছেন– এটি দেশের মোট বিবাহিত নারীর প্রায় ৯.৫%। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ বিধবা নারী নিয়মিত আয়ের উৎস থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ এলাকায় অনেক বিধবা নারীর জমির মালিকানা নেই এবং তারা অনিয়মিত, কম মজুরির কাজে নিয়োজিত থাকতে বাধ্য হন। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সালে বিধবা, স্বামী-পরিত্যক্ত ও অসহায় নারীদের জন্য ভাতা কর্মসূচি চালু করে।
যে কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দরিদ্র ও অসহায় নারীদের ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এ ভাতার পরিমাণ এতই নগণ্য যে, একজন বিধবার পক্ষে এই ভাতায় দুদিনও চলে না। ৬০.৬% নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল বা অসুস্থ বলে জানিয়েছেন। ৯৬.১% নারী চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য ভাতার অর্থ ব্যবহার করেন। একটি সরকারি গবেষণায় দেখা যায়, জরিপভুক্ত বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্ত নারীদের ৭১.৭% দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বামীহীন জীবনযাপন করছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তাদের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিবছর ২৩ জুন বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক বিধবা দিবস পালিত হয়। আমাদের দেশে এই দিবস নিয়ে খুব বেশি পালন করতে দেখা যায় না। জাতিসংঘ ২০১১ সাল থেকে এ দিবস পালন করে আসছে; যাতে বিধবা নারীদের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পায়।
দেশে বহু বিধবার পরিবারে অর্থনৈতিক সমস্যা চরমে। বাল্যবিয়ের কারণে অনেক মেয়ের আয়-রোজগার শেখার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। একমাত্র স্বামীর আয় যাদের অর্থের উৎস, সেই উৎস হারানোয় বিধবা নারী কি সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে পাথারে পড়েন। প্রচণ্ড বিপদগ্রস্ত হয়ে জীবন কাটাতে থাকেন তারা। বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারে পুরুষ সদস্য প্রধান উপার্জনকারী। স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক নারী হঠাৎ করেই আয়ের প্রধান উৎস হারিয়ে ফেলেন ও অসহায়ত্বে ভুগতে থাকেন। সম্পত্তির বঞ্চনা যেন অহরহ ঘটনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিধবাদের স্বামীর সম্পত্তি থেকে আইনগত অংশ থাকলেও বাস্তবে তারা জমি, বাড়ি বা সম্পদের ন্যায্য অংশ পান না। আত্মীয়স্বজন বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের অধিকার দখল করে নেয়।
কর্মসংস্থানের অভাব, কম শিক্ষিত ও দক্ষতাবিহীন বিধবাদের জন্য কর্মসংস্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা নিম্ন আয়ের কাজ, গৃহকর্ম অথবা অনিরাপদ কর্মসংস্থানের দিকে যেতে বাধ্য হন। এতে করে সন্তানদের শিক্ষা ব্যাহত হওয়া এবং শিশু শ্রমিকের সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক বিধবা নারী সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেন না। ফলে দারিদ্র্যের চক্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলতে থাকে। বিধবাদের জন্য সামাজিক বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। বাংলাদেশের অনেক এলাকায় এখনও বিধবা নারীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান। তাদের দুর্বল, অসহায় কিংবা পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখা হয়। অনেক বিধবা নারী সামাজিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য করা হয় এই কুসংস্কারগুলো মানুষ বুঝে এবং না বুঝেই ছড়াতে থাকে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বিধবাদের পুনর্বিবাহের বাধা। ছেলেরা যখন বিপত্নীক হয় তখন তারা বিয়ে করবে– পুনরায় এটাই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। যদিও আইনের চোখে বিধবা বিবাহে কোনো বাধা নেই। তবুও সমাজের কিছু অংশে বিধবাদের পুনর্বিবাহকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। নতুন বিয়ে করতে গেলে পাত্র পাওয়া একটু কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কোনো অঞ্চলে বিধবাদের স্বামীখেকো বলে অনেক কুসংস্কার ছড়ানো হয় এবং পুনর্বিবাহে বাধাগ্রস্ত করা হয়। হয়রানি ও নির্যাতন সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এ বিষয়গুলো একজন বিধবার জীবনে অনেক বেশি হতাশা নিয়ে আসে। অনেক বিধবা নারী যৌন হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখলের হুমকি এবং পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন। এমনিতেই তারা স্বামী শোকে মুহ্যমান থাকেন। এরপরও সামাজিক নানা নেতিবাচক পরিবেশ একজন বিধবার
জীবনে মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং এতে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি শোক ও বিষণ্নতায় ভুগতে থাকেন।
স্বামী হারানোর শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা ও বিষণ্নতা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বয়স্ক বিধবারা একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতার শিকার হন এবং আত্মসম্মানবোধের ক্ষতি হয়ে থাকে। অবহেলা, অপমান ও বৈষম্যের কারণে অনেক বিধবা নারী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। একে তো মানসিক চাপ, একা সন্তানদের লালন-পালন, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক চাপ তাদের মানসিক-শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে। স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগের রোগশোকে ভোগার পরও দারিদ্র্যের কারণে অনেক বিধবা নারী নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারেন না। পর্যাপ্ত আয়ের অভাবে অনেক বিধবা নারী পুষ্টিকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত হন এবং অপুষ্টিতে ভুগছেন।
বিধবা নারীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তাহীনতা। একাকী বসবাসকারী নারীরা শারীরিক নির্যাতন ও সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকেন। বিধবাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা ও বৈষম্য যেন একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিধবারা সম্পত্তি দখল, উচ্ছেদ, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং জোরপূর্বক বৈষম্যের শিকার হন। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুর পর তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় অথবা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। বাংলাদেশেও কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, জমি ও সম্পত্তি দখলের চেষ্টা, পারিবারিক নির্যাতন, সামাজিক অপমান, পুনর্বিবাহে বাধা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়।
বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কুসংস্কারের কারণে সামাজিকভাবে তাদের কোণঠাসা করা হয়। কিছু এলাকায় এখনও এমন ধারণা দেখা যায়, বিধবা নারী অশুভ, সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত, পুনর্বিবাহ করা উচিত নয়, সম্পত্তির অধিকার দাবি করা উচিত নয়। এসব ধারণা মানবাধিকার, সংবিধান এবং নারী অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। দেবর-ভাশুরদের অনেকেই বিধবার সম্পত্তি লুটে নেওয়ার ধান্দা করে।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিটি মানুষের উচিত বিধবা নারীকে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করা, পরিবারে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা, সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার দেওয়া। মানসিক সমর্থন ও সহযোগিতা করা। বিধবাদের সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা করা। সামাজিক পর্যায়ে আমাদের অনেক কিছু করণীয় রয়েছে। আমাদের উচিত কুসংস্কারবিরোধী প্রচারণা চালানো, সমাজে বিধবাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা, পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে সামাজিক বাধা দূর করা, কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ গঠন করা ও স্থানীয় পর্যায়ে আইনি সহায়তা দেওয়া।
এনজিও ও নাগরিক সমাজের অনেক কিছু করণীয় রয়েছে। যেমন বিধবাদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা, ক্ষুদ্রঋণ ও আয়বর্ধক কর্মসূচিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা, বঞ্চিত বিধবাদের আইনি সহায়তা সেবা প্রদান করা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং বিধবাদের অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি। এ বিষয়ে আমাদের বাংলাদেশের সরকারের করণীয় অনেক কিছুই আছে; যা নিতান্তই যৎসামান্য পরিমাণের। বিধবা ভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যা সামগ্রিক প্রয়োজনের খুবই নগণ্য। খুবই কমসংখ্যক বিধবারা বিধবা ভাতা পেয়ে থাকেন। সুতরাং বিধবা ভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
একটি কথা বিশেষভাবে বলতে চাই, প্রতিটি বিধবা নারী সমাজের করুণা নয়, অধিকার ও মর্যাদার দাবিদার। তারা পরিবার, সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আন্তর্জাতিক বিধবা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন নারীর পরিচয় কেবল তার স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক, যার সমান অধিকার, সম্মান ও সুযোগ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হলে বিধবা নারীদের প্রতি বৈষম্য ও কুসংস্কারের অবসান ঘটিয়ে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আফরোজা পারভীন: নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক
- বিষয় :
- বিধবা
