উচ্চারণের বিপরীতে
সংসদে অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য ও জবাবদিহির আওতা
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১৩ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে চলমান বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নানা প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসছে। জামায়াতের সদস্য মিজানুর রহমান সংসদ সদস্যের জন্য বরাদ্দ থাকা ফ্ল্যাটে মাইক্রোওভেন, ওয়াশিং মেশিন, পর্দা দেওয়ার দাবি জানালে বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ ব্যক্তিগতভাবে জামায়াত সদস্যকে ওভেন প্রদানের প্রস্তাব করেন। সমকাল জানাচ্ছে, ‘আন্দালিব রহমানের ওভেন দিতে চাওয়ায় এর প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। স্পিকার বলেন, ‘আর বাড়াবাড়ি করার দরকার নেই’ (সমকাল, ১৯ জুন ২০২৬)।
এর আগে উদ্বোধনী অধিবেশনে এনসিপির সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের অফিস এবং আরেক সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এলাকায় যাওয়ার জন্য গাড়ি বরাদ্দের দাবি জানান।
এবারের সংসদ অধিবেশনে ‘মুতা বিবাহ’ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী জামায়াতের নারী সদস্যদের মুখ ঢেকে বসা নিয়ে বক্রোক্তি করলে সংসদে বিতর্ক ওঠে। স্পিকার পোশাকের স্বাধীনতার প্রশ্নে এমপির বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেন।
অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন রিপোর্ট হিমাগারে চলে যাওয়া নিয়ে কোনো পক্ষই আলোচনা করছে না। সরকার কিংবা বিরোধী দলের কোনো সদস্য এ নিয়ে একটি শব্দও করছেন না। অথচ মুতা বিবাহবিষয়ক আলোচনার বদলে নারী সংস্কার প্রসঙ্গে সংসদে আলোচনা ছিল জরুরি।
কেবল নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নয়; সংবিধান সংস্কার ছাড়া আর কোনো সংস্কার প্রশ্নেই বিরোধী দল কিংবা সরকারি দল কথা বলেনি; বলে না। বরং নানা অপ্রয়োজনীয় আলোচনা থেকে বোঝা যায়, জাতীয় সংসদের প্রকৃত কাজ নিয়ে অনেক সদস্যের স্পষ্ট ধারণা নেই। অনভিজ্ঞ সদস্যদের ধারণা না থাকা অসংগতও নয়। তবে সংসদের কার্যাবলি বুঝে সেইমতো কতর্ব্য নির্ধারণের উদ্যোগও এখন পর্যন্ত আমরা দেখতে পাইনি। এতে নানা ধরনের শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
২.
বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বাজেট নিয়ে যে বিশ্লেষণ জাতির জন্য প্রয়োজন ছিল, তা এখনও অনুপস্থিত। অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের প্রথম অধ্যায়ের অষ্টম ধারায় বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে।’
বাস্তবতা অবশ্য অর্থমন্ত্রীর কথার সঙ্গে মেলে না। গত দেড় দশকে যেসব দেশ জিডিপির উৎকৃষ্ট প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, সেই তালিকায় ধারাবাহিকভাবে আসে চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের নাম। ২০০৬ সালে বিএনপি শাসনামলের শেষে প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি ২০২৪ সালে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে। এটা বাস্তবতা।
কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগের শাসনামলের নানা সমালোচনা সংসদে অবশ্যই সরকার ও বিরোধীদলীয় সদস্যরা করবেন, তবে প্রকৃত সত্য অস্বীকার করে আলোচনা যুক্তিসংগত হবে না। কিন্তু যে আর্থিক সূচকের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের গণ্ডি পেরুনোর ছাড়পত্র পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করল, এটি জাতীয় সংসদে অস্বীকারের উপায় নেই।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য, ২০১০ থেকে পরবর্তী ১৫ বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ ছিল। এই নির্দিষ্ট দেড় দশকে চীনের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল পৌনে ৭ শতাংশ, বাংলাদেশ ও ভারতের ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ, সেখানে এই সময়ে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ ও শ্রীলঙ্কার ৩ দশমিক ২। এই তথ্য আওয়ামী সরকারের বানানো নয়। সংসদে অর্থমন্ত্রী উপস্থাপিত– ‘অর্থনীতি একেবারে ধ্বংস হয়েছে’ বাক্যের উত্তরে বিরোধী দল থেকে বিশ্বব্যাংকের তথ্য উপস্থাপিত হলে যুক্তিসংগত আলোচনার সূত্রপাত হতে পারত।
অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান নির্বাচিত সরকারও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ে অংশীদারি কাজে উৎসাহী। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ ধারণার ভিত্তিতে পরিচালিত এবং এটি ইতিবাচক। তবে কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী যে পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা বিশেষত উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন, তার প্রকৃত কারণ বোঝা কঠিন। পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্ধেক এবং সে দেশের সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন রীতিমতো আলোচনার বিষয়। সেই পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আমাদের অনুসরণ করতে হবে কেন?
অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যালয় পর্যায়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ ঘোষণা করেছিল। সাম্প্রদায়িক শক্তির পৃষ্ঠপোষকতার ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকারও একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মর্মার্থও বোঝা গেল না। বিএনপি সরকারের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সংগীত শিক্ষক নিয়োগে বিরোধিতার সাযুজ্য মেলে না। কেন এই সিদ্ধান্ত? সংসদে এই প্রশ্ন তবে কোন পক্ষ থেকে উত্থাপিত হবে?

৩.
জাতীয় সংসদে জাতির বিকাশ ও প্রগতির পক্ষে সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন উত্থাপন এবং আলোচনার জন্য নৈতিকতা ও দক্ষতার অনুশীলন অত্যন্ত জরুরি। যে ইতিহাস মীমাংসিত, তাকেও অহেতুক বিতর্কিত করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত করে রাখা অবশ্য আমাদের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বিশেষত আওয়ামী লীগ শাসনামলের শেষ এক যুগের স্বৈরাচারী শাসনে বিরোধী মতকে ‘রাজাকার’ ট্যাগ দেওয়ার একটি সর্বগ্রাসী অপপ্রয়াস দেখা গেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মানুষের বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিরুদ্ধ মতের স্থান সমাজে অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে বেশির ভাগ মানুষের ধারণা ছিল। কার্যত তা হয়নি। সবই বিজয়ীদের পক্ষে যাবে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের শঙ্কা তাই বারবার জেগে ওঠে।
বগুড়ার এমপি শাহে আলম নিজের পরিবার ও দুই সন্তানের নামে এলাকার তিন ইউনিয়নের নামকরণ করেন। বরাদ্দের সিংহভাগ নিজের উপজেলায় ন্যস্ত করেন; অধিকাংশ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক তাঁরই এক পুত্র স্বয়ং– এসবই আমাদের পুরোনো শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি। যদিও প্রধানমন্ত্রীর ত্বরিত হস্তক্ষেপে ইউনিয়নের নাম বাতিল হয়ে পুনরায় নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে; তারপরও মন্ত্রীর কার্যক্রম সরকারের প্রথম পাঁচ মাসের মধ্যেই রীতিমতো ‘কার কাজ কী’ ও ‘কেন’– এই প্রশ্নগুলো আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রশ্ন থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; তবে যার যে কাজ তাকে তার সর্বোচ্চ যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়েই সম্পাদন করতে হবে। সংসদ সদস্যদের সংসদে প্রশ্ন করতে হবে কেবল এলাকার প্রতিনিধি হিসেবেই নয়, দেশের মানুষের প্রতিনিধি হয়ে। যে দুর্বল মানুষটি বিনাবিচারে দিনের পর দিন কারাগারে আটক; তাঁর হয়ে অবশ্যই জনপ্রতিনিধিদের কথা বলতে হবে। নিজেদের বিলাসব্যসন নয়; প্রান্তিক নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জীবন যাতে আরেকটু স্বাচ্ছ্যন্দের দিকে যায়, তার বিহিত করবার চিন্তা থাকতে হবে তাদের বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে। কেবল আগের সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে দায় সারলে হবে না। সরকারকে যেমন সত্য স্বীকার করে কাজ করতে হবে; বিরোধীদলীয় সদস্যদেরও বুঝতে হবে– উপযুক্ত জবাবদিহির আওতায় সরকারকে আনতে না পারার ব্যর্থতার হিসাব জাতির সামনে তাদেরকে সময়মতো দিতেই হবে।
গণতন্ত্রের এই এক পরম সৌন্দর্য। জবাবদিহি ও পরমতসহিষ্ণুতা। বিপুল ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে পাওয়া জাতীয় সংসদে সকল মত-পথ-ধর্ম-লিঙ্গ ও শ্রেণির মানুষ সম্পর্কে সমমর্যাদা ও সমান সম্মানে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। আইন প্রণয়নে যৌক্তিকতা হোক মূল মাপকাঠি। তবেই সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দিকে দেশ এগিয়ে যাবে।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
