স্বপ্নযাত্রার নায়ক হালান্ড
সাখাওয়াত হোসেন জয়
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ১০:০৯
নরওয়ে প্রথমবার যখন বিশ্বমঞ্চে খেলেছিল, তখন জন্মই হয়নি আর্লিং হালান্ডের। ১৯৯৮ সালে নিজ দেশের বিশ্বকাপে খেলার গল্প বাবা-মায়ের মুখ থেকেই শুনেছিলেন ম্যানচেস্টার সিটির এ তারকা। বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড ছিলেন পেশাদার ফুটবলার। ইংলিশ ক্লাব ম্যানসিটির জার্সিও গায়ে জড়িয়েছিলেন তিনি। মা গ্রি মারিতা ব্রাউট ছিলেন নরওয়ের একজন বিখ্যাত হেপ্টাথলেট। ক্রীড়া পরিবারে বেড়ে ওঠা হালান্ড ছোট বেলা থেকেই পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং সুইডেনের সাবেক ফুটবলার জ্লাতন ইব্রাহিমোভিচের খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। বিশ্বমঞ্চে সি আর সেভেনের অনিন্দ্যসুন্দর গোলগুলো দেখে হালান্ড স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন বিশ্বকাপে খেলার। ফুটবলের সবুজগালিচায় শিল্পী হয়ে ওঠা এ তারকা ২৮ বছর পর নরওয়েকে তুলে নেন বিশ্বকাপে।
উত্তর আমেরিকার ফুটবল মহাযজ্ঞে রূপকথার গল্প লিখেছে নরওয়ে। এই গল্পের নায়ক একজনই–আর্লিং হালান্ড। নিউইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকালে অনুষ্ঠিত ম্যাচে সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারিয়ে নকআউট পর্বে উঠেছে নরওয়ে। দেশটির এই স্মরণীয় পথচলার কারিগর ‘গোল মেশিনখ্যাত’ হালান্ড করেছেন জোড়া গোল। স্মরণীয় মুহূর্তটিকে উদযাপন করতে গিয়ে নিজেদের ইতিহাস আর ঐত্যিহকে নিউইয়র্কের চোখ ধাঁধানো স্টেডিয়ামে ফুটিয়ে তুলেছেন হালান্ডরা। ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনে মাতেন নরওয়ের ফুটবলাররা।
হালান্ডকে বলা হয় ছোট দলের বড় তারকা। এবারের বিশ্বকাপে গোল করেই চলেছেন ২৫ বছর বয়সী এ ফরোয়ার্ড। ইরাকের পর সেনেগালের বিপক্ষেও জোড়া গোল। বিশ্বকাপে চার গোল করা হালান্ড এখন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে আছেন সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় দুই নাম্বারে। পাঁচ গোল করে সবার ওপরে আছেন আর্জেন্টিনার জাদুকর লিওনেল মেসি। পরপর দুই ম্যাচে জোড়া গোল করা হালান্ড ঢুকে গেছেন ইতিহাসের পাতায়। নিজের প্রথম বিশ্বকাপে টানা দুটি ম্যাচে একাধিক গোল করা ষষ্ঠ ফুটবলার এখন তিনি। গত ৫০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় ফুটবলার। সর্বশেষ এমন কীর্তি গড়েছিলেন ২০১৮ সালে ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন। শুধু তাই নয়, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে দেশের জার্সিতে টানা ১২ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড তাঁর। সর্বশেষ ২১ ম্যাচে ১৮টি গোল করেছেন হালান্ড। মাত্র দুই ম্যাচে চার গোল করা হালান্ড বিশ্বকাপ ইতিহাসে নরওয়ের সর্বোচ্চ স্কোরার। গোল করাটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে আসা হালান্ড রসিকতা করে বলেছেন, ‘সত্যি বলতে আমি ঠিক জানি না কী করি। তবে গোল করাই আমার কাজ, আমার বিশেষত্ব।’
বিশ্বকাপে সর্বেোচ্চ গোলদাতা হওয়ার লড়াইয়ে মেসি-এমবাপ্পের সঙ্গে ভালোভাবেই টিকে আছেন হালান্ড। বাস্তবতায় নরওয়ের এ তারকার জন্য গোল্ডেন বুট জেতা কঠিনই বটে। কারণ, এক তারকার ওপর নির্ভরশীল নরওয়ে হয়তো বেশিদূর যেতে পারবে না। বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন নরওয়ে কোচ স্তুল সুলবাকেন। তাঁর চোখে হালান্ড ‘বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার’। দলের সেরা তারকাকে গোল্ডেন বুট জেতার সুযোগ করে দিতে চান তিনি, ‘সত্যি বলতে, সে বিশ্বের সেরা স্ট্রাইকার, সে ফ্রান্স কিংবা আর্জেন্টিনার হয়ে খেলছে না, সে নরওয়ের জার্সিতে গোল করছে। সে চারটি গোল করে ফেলেছে। সবচেয়ে বড় মঞ্চে দুটি জোড়া গোল। ফ্রান্স বা আর্জেন্টিনার হয়ে খেললে গোল্ডেন বুট জেতাটা তুলনামূলক সহজ। তবে আমরা আর্লিংকে আরও বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করব এবং পরের ম্যাচগুলোতে তাকে আরও বেশি সাহায্য করব। সে এখন দুর্দান্ত ফর্মে আছে। বিশ্বমঞ্চে সে গোল করতে পারছে দেখে আমি খুবই খুশি।’
এই হালান্ডকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত পুরো নরওয়ে। দলের উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতেও তারকা। সেনেগালকে হারানোর পর মাঠে সারি দিয়ে বসে পড়লেন ফুটবলার ও সাপোর্ট স্টাফেরা। ঠিক যেভাবে নৌকাবাইচে একজন আর একজনের পেছনে বসেন, সে ভাবেই বসেছিলেন ফুটবলারেরা। তাদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। তিনি একটি ড্রাম নির্দিষ্ট ছন্দে বাজাচ্ছিলেন। তার তালে তালে নৌকার দাঁড় বাওয়ার মতো অঙ্গভঙ্গি করছিলেন হালান্ডরা। শুধু ফুটবলারেরা নন, দর্শকদেরও একই কায়দায় উল্লাস করতে দেখা যায়। বিশ্বমঞ্চে রূপকথার গল্প লিখে চলা নরওয়েজিয়ানদের এই উদযাপনই মানায়।
- বিষয় :
- আর্লিং হালান্ড
- ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬
- নরওয়ে
