ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া

শ্রমবাজার উন্মোচনেই প্রকৃত সাফল্য

শ্রমবাজার উন্মোচনেই প্রকৃত সাফল্য
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য তারেক রহমান যখন মালয়েশিয়াকে বাছিয়া লইয়াছিলেন তখনই বোঝা গিয়াছিল, ঢাকা-কুয়ালালামপুর সম্পর্ককে বর্তমান সরকার কতটা গুরুত্ব দিতেছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও তাঁহার বাংলাদেশি সমকক্ষকে বেশ উষ্ণ সংবর্ধনা জানাইয়াছেন। সোমবার দুই শীর্ষ নেতার মধ্যকার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করিয়াছেন, এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব ও জনগণের সহিত জনগণের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও সুসংহত হইয়াছে। তিনি জানাইয়াছেন, সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হইবার পাশাপাশি নিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমনে দুইটি কূটনৈতিক নোট বিনিময় হইয়াছে। 

আমরা দেখিয়াছি, এই সফরে সর্বমোট ৯টি বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের সম্মতিতে ৩৩ দফার একটি যৌথ বিবৃতি প্রচার করা হইয়াছে; সেথায়ও উক্ত বিষয়গুলি স্থান পাইয়াছে। যাহা গুরুত্বপূর্ণ, যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান জানাইয়াছেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগের বিষয়টি ‘স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী’ করিবার ব্যাপারে দুই দেশ একমত। উপরন্তু মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা হ্রাস এবং শ্রমিকদের ব্যয় হ্রাসের মতো বিষয়গুলিও তথায় গুরুত্ব পাইয়াছে। তৎসহিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁহার মালয়েশীয় সমকক্ষকে অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধ করা এবং আটক বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন বিষয়ও সদয় বিবেচনার জন্য অনুরোধ করিয়াছেন।

প্রসঙ্গত, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির তুলনায় অধিক মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বরাবরই বাংলাদেশি কর্মীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে। এই কারণে যেই কোনো মূল্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভে ভিড় করিয়া থাকে বাংলাদেশিরা। উহারই সুযোগ লইয়া দেশীয় রিক্রুটিং এজেন্সিসমূহের একটা অংশ মালয়েশীয় সহযোগীদের যোগসাজশে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নানা প্রতারণার ফাঁদ পাতে। একদিকে নানা বাহানা দেখাইয়া মালয়েশিয়ামুখী বৈধ শ্রমিকদের নিকট হইতে অস্বাভাবিক অর্থ আদায় করা হয়; অন্যদিকে ভুয়া চাহিদাপত্র প্রদর্শন করিয়া যেই কোনো মূল্যে মালয়েশিয়ায় গমনেচ্ছুদের দেশটিতে লইয়া অকহতব্য দুর্ভোগে ফেলে। 

স্মরণ করা যাইতে পারে, ২০০৫ সালে এহেন ফাঁদের কারণেই মালয়েশিয়ায় পৌঁছাইবার পর কয়েক লক্ষ বাংলাদেশি কর্মী কর্মহীন অবস্থায় ভীষণ দুর্গতিতে পড়েন। এমনকি অবৈধভাবে অবস্থানের অভিযোগে অনেককে সেইখানে কারা নির্যাতনও ভোগ করিতে হয়। শুধু উহাই নহে, ঐ ঘটনার জের হিসাবে ২০০৯ সালে মালয়েশীয় সরকার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যাহা অনেক চেষ্টা-তদবিরের পর ২০১২ সালে প্রত্যাহৃতও হয়। কিন্তু দুই দেশের কতিপয় রিক্রুটিং এজেন্সি চক্রের অপতৎপরতায় ক্ষুব্ধ হইয়া মালয়েশিয়া সরকার ২০১৮ সালে পুনরায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ করিয়া দেয়। তৎকালীন মালয়েশীয় সরকার উক্ত সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচ সহস্র কোটি টাকা দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগও আনিয়াছিল। ঐ হতাশাজনক ঘটনার পর মালয়েশিয়ার বাজার পুনরায় এক পর্যায়ে খুলিলেও ২০২৪ সালের জুন মাসে তাহা পুনরায় বন্ধ হইয়া যায়। সেই সময় প্রায় ১৭ সহস্র বাংলাদেশি বৈধ কর্মী মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করিতে পারেন নাই। তন্মধ্যে বর্তমান মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী প্রায় আট সহস্র কর্মীকে গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিলেও সোমবার প্রকাশিত বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদন অনুসারে, এখনও প্রায় পাঁচ সহস্র কর্মী মালয়েশিয়া গমনের অপেক্ষায়।

অতএব বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার খোলাই হইবে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের প্রধান সাফল্য। তৎসহিত বাজারটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার বারংবার বন্ধ হইবার কারণগুলিও দূর করিতে হইবে।

আরও পড়ুন

×