ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

আওয়ামী লীগ আসলে কত বড় ‘হুমকি’

আওয়ামী লীগ আসলে কত বড় ‘হুমকি’
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৭:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগ দিয়ে রাজধানীসহ তিন মহানগরী ও তিন জেলায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তে অনেকে অবাক হয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের পর সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাবে– এটাই ছিল সিদ্ধান্ত। আওয়ামী লীগের তৎপরতায় পরিস্থিতির এমন কী অবনতি হলো যে, সেনাদের নতুন করে নামাতে হলো? তাদের বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েনও হয়েছে। পুলিশ, র‍্যাবকেও বিশেষভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। 

২৩ জুন দুপুরে এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত অবশ্য বিশেষ কোনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সৃষ্টির খবর মেলেনি। নিকট ভবিষ্যতেও বড় কিছু ঘটানোর সক্ষমতা কি আওয়ামী লীগের আছে? অন্তর্বর্তী শাসনামলেও মাঝে মাঝে রাজপথে লীগের উপস্থিতি জানান দেওয়ার ঘোষণা আসত। দিল্লিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা এখনও দলে তাঁর অবস্থান ধরে রেখেছেন। তিনিই পরিচালনা করছেন মাঠে ফিরে আসতে উৎসাহী কর্মীদের। তবে পোস্টার সাঁটানো আর ঝটিকা মিছিল বাদে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটতে দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সক্রিয় মূলত অনলাইনে।

তাহলে সরকার কেন সেনা ও বিজিবি মোতায়েনে গেল– সে প্রশ্ন উঠতে পারে। সারাদেশে নয় অবশ্য; প্রধান প্রধান নগরী এবং কয়েকটি জেলাতে। আওয়ামী লীগারদের কার্যক্রমে নিশ্চয় নজর রয়েছে সরকারের। দলটির বিষয়ে দৃশ্যত অন্তর্বর্তী শাসনামলের দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছে সরকার। এটি দলটির কাছে সম্ভবত অপ্রত্যাশিত ছিল। কেউ কেউ ভেবেছিল, নির্বাচিত সরকার কোনো না কোনোভাবে দলটির প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেবে। যে কারণেই হোক, সেটি ঘটেনি। বরং দলটির তৎপরতা ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি সেনা মোতায়েনে বোঝা গেল, সরকারের মনোভাব কঠোর। 

সরকার চাইলে সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় এগিয়ে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে দেশ রক্ষাই মূল দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের প্রশিক্ষিতও করা হয়নি। অন্তর্বর্তী শাসনামলে টানা দায়িত্ব পালন করে সেনাবাহিনী ক্লান্ত, এটিও বলা হচ্ছিল। এ অবস্থায় পুনরায় সেনাদের মাঠে আনার সিদ্ধান্ত উচ্চ প্রশংসিত হবে না। নির্দিষ্ট সময় ও এলাকার বাইরে বর্ধিত দায়িত্ব পালনের মতো কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না বলেও প্রত্যাশা থাকবে। 

কেতাবি শোনালেও এটাই বাস্তবতা, পুলিশকে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে দায়িত্ব বুঝে নিতে হবে। আর কতদিন অপ্রস্তুত থাকবে পুলিশ? গণঅভ্যুত্থানে বাহিনীটির ভেঙে পড়ার কথা বহুল আলোচিত। অন্তর্বর্তী শাসনামলে তাদের স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেও দেওয়া হয়নি। তখন ‘মব ভায়োলেন্স’ প্রাধান্য বিস্তার করায় বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও অবনতি হয়। রাজনৈতিক সংস্কারে অতিউৎসাহী সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দৃষ্টি না দেওয়াতেও সংকট ঘনীভূত হয়। পুলিশ সংস্কারেও মনোনিবেশ করেনি। এসব দায়িত্ব এখন পালন করতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। তাদের কাজ পরিস্থিতি জটিলতর না করে প্রধান প্রধান খাতে অন্তত স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা। 

নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয় কিনা, সেটি নিয়েও শঙ্কা ছিল। যে সমীকরণেই হোক, নির্বাচনে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় ছিল। আওয়ামী লীগের প্রভাব থাকা অঞ্চলগুলোয়ও নির্বাচন হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। ওইসব অঞ্চলে বেশি করে জয়ী হয়েছেন বিএনপি প্রার্থীরা। এ দৃশ্যপটে আওয়ামী লীগ থেকেও হয়তো ‘বার্তা’ ছিল। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি কঠোর বার্তাই দিয়ে চলেছে। অন্তর্বর্তী শাসনামলে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধেই ছিল বিএনপির সাধারণ অবস্থান। গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া দলকে ফিরে আসতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজও নয়। এতে থাকবে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বেরও সেটি বুঝতে পারার কথা। এটিও তাদের বোঝা উচিত, অনলাইনে ‘হাইপ’ তুলে আর ঝটিকা মিছিল করে দৃশ্যপট বদলানো যাবে না। 

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে উপলব্ধি করতে হবে, নিজ কৃতকর্মেই তাদের পতন ঘটেছে। দেশে আর কোনো দলের তো এমন পরিণতি হয়নি। নব্বইয়ের পট পরিবর্তনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চাপের মুখে থেকেও ৩৫ আসন পেয়েছিল জাপা। এক-এগারোর পর বিএনপিও চাপের মুখে থেকে নির্বাচন মোকাবিলা করে সংসদেই অবস্থান নেয়। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন সহজ ছিল না। তারপরও ক্ষমতায় ফিরতে ২১ বছর লেগেছে। এবার আগে ফিরতে হবে রাজনীতিতে। কৃতকর্মের বিষয়ে অনুতাপহীন আওয়ামী লীগ অপরিবর্তিত নেতৃত্ব নিয়ে কীভাবে ফিরবে, এর কোনো সদুত্তর নেই। প্রায় দুই বছরে তাদের ফেরার কোনো বাস্তবসম্মত প্রয়াস অন্তত চোখে পড়েনি। 

আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল ফাটানো কিংবা পুলিশ সদস্যকে হুমকি দিতে দেখা গেলেও গ্রেপ্তার ও মামলা বাড়ছে, এটাই বাস্তবতা। মানবতাবিরোধী অপরাধসহ কত অপরাধের মামলা তাদের বিরুদ্ধে আছে, সে খবর রয়েছে মঙ্গলবারের সমকালে। এ অবস্থায় শেখ হাসিনা কীভাবে দেশে ফিরবেন, তা স্পষ্ট নয়। দেশে অবস্থানরত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের সামনে রেখে ‘পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’ গঠনের একটি প্রক্রিয়ার কথা মাঝে শোনা গিয়েছিল। শেখ হাসিনা স্পষ্টতই তাতে সায় দেননি। এ অবস্থায় সরকারও সম্ভবত ‘অপেক্ষা’ করে থেকে জননিরাপত্তা সামলে চলার নীতি গ্রহণ করেছে। 

নির্বাচনে বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসা জামায়াত ও এনসিপি নানা বিষয়ে কড়া বক্তব্য দিলেও রাজপথে সক্রিয় নয়। রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে সরকারের অবস্থানে হতাশ হলেও সেটি নিয়ে এখনই আন্দোলন গড়ে তুলতে উদ্যোগী নয় তারা। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার প্রশ্নেও তারা সতর্ক। এ অবস্থায় সরকারের সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে হয় না। চ্যালেঞ্জ মূলত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা। অর্থনীতিকে স্বাভাবিক ধারায় আনতেও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসাবান্ধব বাজেট দেওয়ার পরও উদ্যোক্তারা কিন্তু এতে জোর দিচ্ছেন। জনমনে স্বস্তি জোগাতেও আইনশৃঙ্খলায় অবনতির ধারা রোধ করা চাই। দিনশেষে পুলিশকেই এ কাজে প্রস্তুত করে তুলতে হবে। 

পুলিশ সংস্কারের কথা বিএনপি তার ৩১ দফায়ও বলেছিল। অল্প সময়ের জন্য সেনাবাহিনীকে মাঠে রেখেও পুলিশকে পুরোপুরি প্রস্তুত করার কাজে এগোনো যায়। খোদ পুলিশ আর র‍্যাবের ওপর হামলাগুলোও বলে দিচ্ছে, পরিস্থিতি বদলায়নি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বড় হুমকি হিসেবে হাজির না হলেও মাঠে থাকা অপরাধীরা কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েই চলেছে। 

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×