ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

নৃ-মুখ

শিক্ষাঙ্গনে দলীয় আধিপত্য এখনও গেল না

শিক্ষাঙ্গনে দলীয় আধিপত্য এখনও গেল না
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরপর আগের সরকারের লোকদের সরিয়ে সর্বত্র নতুন সরকারের লোকদের বসানো বাংলাদেশে একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। সচিবালয়, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ; সবখানেই নতুন করে গোছানো শুরু হয়। এই বিষয়টিতে আমরা মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তবে এই পরিবর্তনের ঢেউ যখন শিক্ষা, বিশেষত কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকেও লাগে তখন একটু বেশিই চিন্তায় পড়তে হয়। শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে এই পরিবর্তন কী প্রভাব ফেলছে তা আমাদের ‘পরিবর্তনপন্থি’ রাজনীতিবিদরা খুব একটা আমলে নেন না।

২০২৪-এর ৮ আগস্ট ক্ষমতা নিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। এ বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়েছে নির্বাচিত বিএনপি সরকার। মূলত রাষ্ট্র সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমতায় এলেও অন্তর্বর্তী সরকার সে ক্ষেত্রে তেমন কিছুই করতে পারেনি। বরং বলা যায়, তালগোল পাকানো এক পরিস্থিতি রেখে গেছে তারা। তবে অন্য সবার মতো সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শিক্ষাকে বেছে নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে চালু হওয়া নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন করে তারা। কিছু সংস্করণ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়া হয়। তার জায়গায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পাঠ (দৈনিক ইত্তেফাক, ৩ জানুয়ারি ২০২৬)। ২০২৫ সালে পঞ্চম থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়ে কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্য সংযোজন করা হয়। পরে চলতি বছরের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের অংশ হিসেবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হয় এবং এর পাশাপাশি নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানও রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দেওয়া হয় প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম। 

তবে নতুন সরকার এসে শুরু করেছে আবারও পরিবর্তন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে মিল রেখে স্কুলের বইগুলো আবারও পরিমার্জনা করা হচ্ছে। ২০২৭ সালে ছাপা বইয়ে এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাব। এখানেই শেষ নয়। গত ১০ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক সভায় পাঠ্যবইয়ে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির বীরত্বগাথা তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে (দেশ রূপান্তর, ১২ জুন, ২৬)। সে সিদ্ধান্তে আরও বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের পাঠ্যবইয়ে তাঁর জীবন, কর্ম, শাহাদাত-পরবর্তী ঘটনাগুলো তুলে ধরা হবে, যদিও এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। 

সরকার আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘কালচার’ ও ‘স্পোর্টস’ নামে দুটি নতুন বিষয় যুক্ত করতে যাচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। পাশাপাশি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ (আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা) ও ‘টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন’ (কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা) নামে আরও দুটি বিষয় বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। (২১ জুন, ২০২৬ প্রথম আলো)। তবে বিস্ময়কর হলো, এ জন্য সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও তা থেকে সরে এসেছে সরকার। এখন বলা হচ্ছে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সেই সমস্যার সমাধান করা হবে। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, আপাতত যেহেতু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, তাই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তাদের (সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়) সংগীত শিক্ষকদের গুচ্ছ (ক্লাস্টার) আকারে কাজে লাগানো হবে। পাশাপাশি কেরাত প্রতিযোগিতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধবিষয়ক কার্যক্রম নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। (২১ জুন, ২০২৬ প্রথম আলো)।
কোনো কিছুই রাজনীতি-নিরপেক্ষ নয়; শিক্ষার বিষয়বস্তুও নয়। তাই ইতিহাসের কোন কোন অংশ পাঠ্যপুস্তকে থাকবে তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। যেটি নির্জলা তথ্য, সেগুলো নিয়ে এত টানাহেঁচড়া কেন? সরকার বদল হলে কি ইতিহাসের তথ্যও ভুল হয়ে যায়? কথায় কথায় শিক্ষার বিষয়বস্তু বা ইতিহাসের তথ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এই শিক্ষাই দেওয়া হচ্ছে– শিক্ষার দর্শন বলে কিছু নেই। এখানে শিক্ষা মানে দলীয় পরিকল্পনার বিস্তার। শিক্ষা মানে ইতিহাসের ওপর দলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রদর্শনী। 

শুধু প্রাথমিক বা মাধ্যমিকে নয়; বিশ্ববিদ্যালয়েও চলছে দলীয় আধিপত্যের প্রদর্শনী। গত প্রায় দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন পাল্টাল তিন দফা। তৎকালীন উপাচার্যদের মবের মাধ্যমে বিদায় দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সর্বত্র প্রভাবশালী বিএনপি-জামায়াতের প্রতি অনুগত শিক্ষকদের সেসব পদে বসাল। বিএনপি ক্ষমতায় এসে প্রথম পাঁচ মাসেই পরিবর্তন করেছে ৩০ উপাচার্যকে। যারা রয়ে গেছেন তারাও আছেন পদ হারানোর আতঙ্কে। তাই পদে থাকতে তারাও নিজেদের দলের অনেক বেশি নিবেদিত কর্মী হিসেবে হাজির করার চেষ্টা করছেন। আবার দলের অন্যরাও ব্যস্ত আছেন ‘ওকে হটিয়ে নিজে ঢুকে যাওয়া’র ধান্ধায়। অন্যদিকে, প্রায় দুবছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘ফ্যাসিস্ট অনুসারী’ তকমা দিয়ে দেড়শর বেশি শিক্ষককে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে। তাদের অবস্থা না ঘরকা, না ঘটকা। তদন্তের কথা বলে এ অবস্থা তৈরি করা হলেও অদূর ভবিষ্যতে তা শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না। একসঙ্গে এত শিক্ষক বসে থাকলে শিক্ষা কার্যক্রম কতটা সচল থাকে, তা বোঝা দুরূহ নয়।

শিক্ষা, শিক্ষাঙ্গন, পাঠ্যপুস্তক, কারিকুলামসহ পুরো শিক্ষা খাত এখন অতীতের চেয়েও বেশি মাত্রায় দলীয় রাজনীতি চাপিয়ে দেওয়ার জায়গা। অথচ এসব এমন সময়ে ঘটছে যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে দলীয়করণের বাইরে রাখার ‘কঠোর’ নির্দেশনা দিয়েছেন। 

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 [email protected]

আরও পড়ুন

×