ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

সময়ের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ

সময়ের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ
×

মো. আবদুর রহিম

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

পৌনে শতাব্দী আগে, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের শোচনীয় পতনের পর দলটির কর্মী-সমর্থকরা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১২ মে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সরকারও এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রেখেছে।

তৎকালীন পূর্ববাংলা প্রদেশের ‘আওয়াম’ বা সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা করা দলটি ২১ বছরের মাথায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল। যদিও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছিল।

বর্তমানে আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগের মধ্যে ‘জননিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন’ করার ষড়যন্ত্রও রয়েছে। নিয়তির নির্মম পরিহাস বটে; জনগণের দল হিসেবে যে সংগঠনটির জন্ম হয়েছিল এবং দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে দলের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রে জনস্বার্থবিরোধী এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দলটির কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ।

কার্যক্রম শুধু নিষিদ্ধই নয়; আওয়ামী লীগের অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় নেতা হয় দেশ ত্যাগ করেছেন, নয় তো কারাবন্দি। দলটির অধিকাংশ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে; ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নয় তো তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলেও এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি।

এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত নন; কিন্তু আদর্শিকভাবে সমর্থন করেন এ ধরনের অনেক সাধারণ মানুষকেও অবর্ণনীয় বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে। অনেকে জীবিকা, সম্পদ, মর্যাদা; এমনকি জীবন হারিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি অভূতপূর্ব ঘটনা। নিদেন পক্ষে বর্তমান প্রজন্ম এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেনি। 

প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দল এমন পরিণতির সম্মুখীন কেন হলো? আওয়ামী লীগের অনেকে ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইন্ড’ তত্ত্বের কথা বলে থকেন। রাজনীতিতে পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে কৌশলগত মারপ্যাঁচ থাকবেই। এতে যারা জয়ী হন তারা চালকের আসনে থাকেন। এটি রাজনীতির মাঠে সাধারণ ঘটনা। তবে সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে দল মুখ থুবড়ে পড়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বড়জোর চাপে পড়তে পারে। 

অন্য কারণ যা­-ই থাকুক, মূল কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় একদিকে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে সাধারণ কর্মী-সমর্থক এবং শুভাকাঙ্ক্ষী থেকেও দূরে সরে গিয়েছিল। নেতারা ভুলে গিয়েছিলেন– বিলাসবহুল পার্টি অফিসে নয়, সংগঠন বেঁচে থাকে কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। বস্তুত যত চাপই দেওয়া হোক, কোনো জনসম্পৃক্ত দলকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ধ্বংস করা যায় না। তাই আওয়ামী লীগের এ রাজনৈতিক বিপর্যয় যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কী করবে? এখনই আদর্শ সময় নিজেদের ভুলত্রুটি খুঁজে বের করার; ক্ষমতায় থাকলে যা সম্ভব হয় না। দলটির আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমত এ সহজ সত্যটি আওয়ামী লীগকে স্বীকার করতে হবে যে, লুটেরা ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে দলটি জিম্মি হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, দল আর সরকার যে আলাদা সত্তা– আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সেটি ভুলে গিয়েছিল। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গিয়েছিল সরকারের ভেতরে। তৃতীয়ত, সরকার ও দলে আওয়ামী লীগের আমলানির্ভরতা গণতন্ত্রকে সংকটে ফেলেছিল। সর্বোপরি উন্নয়নকে ছাপিয়ে ব্যাংক খাতসহ কয়েকটি মেগা-লুটপাটের কাহিনি সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছিল। 
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক মেগা-উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। সেসবের কৃতিত্বও তারা ঘরে তুলতে পারেনি আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে। আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল দলে ও দেশে গণতন্ত্রহীনতা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনগুলো বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে জয়লাভের ফলে জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে জবাবদিহির পরিবর্তে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে পছন্দের সংখ্যা সীমিত হয়ে গিয়েছিল। 

ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় নির্বাচনে মানুষ প্রতিনিধি বাছাই প্রক্রিয়ায় দলীয় আদর্শের চেয়েও প্রার্থীর নীতি-নৈতিকতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রাধান্য দেন। প্রতিনিধি নির্বাচনে বিকল্প প্রার্থীর অনুপস্থিতি গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করে। স্থানীয় নির্বাচন উন্মুক্ত থাকলে জাতীয় নির্বাচন বর্জনকারী দলের নেতাকর্মীরাও এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। এভাবে একটি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতি ও পদক্ষেপ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল। এক পর্যায়ে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের লোকেরাও ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী ছিল না। 

এ ছাড়া দলের ভেতরে বশংবদ তৈরির প্রতিযোগিতায় আমদানীকৃত ও অনাদর্শিক পেশিশক্তি দলকে অজনপ্রিয় করে তোলায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিল। এরা বর্তমানে ‘গুপ্ত’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অনেক নেতার অতিবিলাসী জীবন এবং সামন্ততান্ত্রিক আচরণ সৎ, নিবেদিতপ্রাণ ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কর্মীদের দল থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের অনেককে বলতে শোনা গেছে, তারা বিরোধী দলে থাকার সময়ও এমন নির্যাতন-হয়রানির শিকার হননি, যা তাদের দল ক্ষমতায় থাকতে হয়েছে। দলে ও দেশে রাজনীতিহীনতার দীর্ঘকালীন চর্চার ফলে ৭৭ বছরের প্রাচীন দলটি গণঅভ্যুত্থানের আগে থেকেই নাজুক হয়ে পড়েছিল। কাজেই আত্মসমালোচনা না করলে আওয়ামী লীগ আত্মশক্তি অর্জনের সুযোগ হারাবে।

এ সত্যটিও সকলের জন্য প্রযোজ্য– গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা যায় না। জনগণ না চাইলে তা এমনিতেই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এমন অনেক দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সমনেই রয়েছে। রাজনীতির মাধ্যমেই রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবিলা করা উচিত; বলপ্রয়োগ বা আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়।
তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক দলগুলো যদি এ সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তারা রাজনৈতিক দুষ্টচক্রের আবর্ত থেকে কখনোই বের হতে পারবে না।
 
মো. আবদুর রহিম: অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×