ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

বাজেট

করনীতিতে স্বাস্থ্য খাত আরও গুরুত্ব পেতে পারত?

করনীতিতে স্বাস্থ্য খাত আরও গুরুত্ব পেতে পারত?
×

এস এম আব্দুল্লাহ ও রুমানা হক

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৭:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে বর্তমানে মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশের বেশি ঘটে অসংক্রামক রোগে। হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস এখন দেশের প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি। এসব রোগের সঙ্গে তামাক ব্যবহার, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় করনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে।

বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহৎ তামাক ব্যবহারকারী দেশগুলোর একটি। এখানে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হন। চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের কারণে এর অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। এবারের বাজেটে সিগারেট ও অন্যান্য তামাকপণ্যের ওপর কর ও মূল্য কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। তবে তামাক করনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। সিগারেটের চার স্তরের মূল্য ব্যবস্থা (নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম) কর বৃদ্ধির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। একটি স্তরের দাম বাড়লে অনেক ব্যবহারকারী তুলনামূলক সস্তা স্তরে চলে যান। ফলে ধূমপান হ্রাসের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে শুধু ব্র্যান্ডের বদল হয়।

দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সিগারেটের মূল্য কাঠামো সরল করার সুপারিশ করে আসছে। সহজ ও বেশি কার্যকর নির্দিষ্ট করব্যবস্থা চালু করা গেলে একদিকে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব, অন্যদিকে তামাক ব্যবহারও কমানো সম্ভব। এবারের বাজেটে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন থাকলেও এ ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ এখনও রয়ে গেছে।

তামাক নিয়ন্ত্রণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নতুন নিকোটিনজাত পণ্যের বিস্তার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিকোটিন পাউচ, ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এসব পণ্যকে অনেক সময় তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রধান উদ্বেগ অন্য জায়গায়। বিশেষ করে আকর্ষণীয় স্বাদ ও নানা ধরনের বিপণনের মাধ্যমে এসব পণ্য তরুণদের মধ্যে নিকোটিন ব্যবহারের নতুন পথ খুলতে এবং আসক্তির পরিধি আরও বাড়াতে পারে। অভিজ্ঞতা বলছে, কোনো নতুন নিকোটিনজাত পণ্য একবার বাজারে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শুধু করের আওতায় এনে এসব পণ্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে সেগুলোর বাজার বিস্তার এবং গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকিও মাথায় রাখতে হবে।
তামাকের বাইরে আরেক বড় চ্যালেঞ্জ চিনিযুক্ত পানীয় এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার। বাংলাদেশে ডায়াবেটিস উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে চিনিযুক্ত পানীয়র ওপর বিশেষ কর চালু করেছে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এ ধরনের নীতি শুধু মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না; উৎপাদকদেরও পণ্যের উপাদান পরিবর্তনে উৎসাহিত করে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো পানীয়তে চিনির পরিমাণ কমাতে বাধ্য হয়েছে। মেক্সিকোতে এ ধরনের কর চালুর পর চিনিযুক্ত পানীয়র ব্যবহার ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, সঠিকভাবে নকশা করা করনীতি শুধু ভোক্তার আচরণে পরিবর্তন আনে না, উৎপাদকদেরও তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর পণ্য তৈরিতে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। 

অর্থনীতির ভাষায়, তামাক, চিনিযুক্ত পানীয় বা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর পণ্যের প্রকৃত সামাজিক ব্যয় বাজারমূল্যে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না। স্বাস্থ্য-করের উদ্দেশ্য সেই সামাজিক ব্যয়ের একটি অংশ স্বাস্থ্য-ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের মূল্যের মধ্যে প্রতিফলিত করা। তাই এ ধরনের করকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নয়; বরং একটি অর্থনৈতিক সংশোধন হিসেবে দেখা উচিত।

স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড বরাদ্দ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে শুধু হাসপাতাল নির্মাণ বা চিকিৎসায় ব্যয় বাড়ানো যথেষ্ট নয়। মানুষের অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে আগামী দিনে তিনটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, সিগারেটের বহুস্তর মূল্য কাঠামো ধীরে ধীরে সরল করা। দ্বিতীয়ত, নিকোটিন পাউচসহ সব নতুন নিকোটিনজাত পণ্যকে কার্যকর কর ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় আনা। তৃতীয়ত, চিনিযুক্ত পানীয় ও অন্যান্য স্বাস্থ্য-ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যের জন্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণভিত্তিক স্বাস্থ্য করনীতি চালু করা।
স্বাস্থ্য খাতে বেশি ব্যয় করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন স্বাস্থ্য এবং করনীতি গ্রহণ করা, যাতে হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা কমে। দীর্ঘ মেয়াদে সেটিই হবে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির জন্য লাভজনক বিনিয়োগ।

ড. এস এম আব্দুল্লাহ: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা পরিচালক (অনারারি), আর্ক ফাউন্ডেশন, ঢাকা;
ড. রুমানা হক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক,
আর্ক ফাউন্ডেশন, ঢাকা

আরও পড়ুন

×